World Cup 2026: ‘অপমানিত হতাম, তবু ভাগ্যবান মনে হত!’ মেসির বিরুদ্ধে খেলা ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর?
সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে খেলা ঠিক কেমন? বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি এক বিভীষিকা। ফরাসি থেকে সার্বিয়ান— ফুটবলারদের বয়ানে উঠে এল সেই অজানা গল্প।
‘একদিকে খেলোয়াড় হিসেবে আপনি হতাশ এবং অপমানিত বোধ করবেন। অন্যদিকে খুব কাছ থেকে একজন ফুটবল প্রতিভাকে দেখার সুযোগ পাবেন, যিনি সম্ভবত সর্বকালের সেরা!’
মেসিকে সামলানোর বিড়ম্বনা ও সৌভাগ্য নিয়ে বলতে গিয়ে এমনটাই জানিয়েছিলেন সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর প্রাক্তন ফুটবলার ইভান এরজিকে! যুগপৎ অপমানিত ও উৎফুল্ল মনে করার যে বিরোধাভাস—এটা শুধু এরজিকের নয়, ঠারেঠোরে সমস্ত ডিফেন্ডার, যাঁরা মেসির বিরুদ্ধে ওয়ান-অন-ওয়ান ডুয়েল লড়েছেন, সবার মনের কথা!
অথবা শুধু মেসি নন। সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের বিরুদ্ধে মাঠে নামার অভিজ্ঞতা বোধ হয় এমনই। আর্জেন্তিনীয় তারকার বল পায়ে আঁকাবাঁকা দৌড় বিশ্বের তাবড় ডিফেন্ডারদের নিমেষে হাসির খোরাক বানিয়ে তোলে। তবু অনেকেই এই অভিজ্ঞতার মধ্যে অদ্ভুত এক প্রাপ্তি খুঁজে পান।
২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার হয়ে অভিষেকের দিন ১৮ বছরের মেসিকে দেখে এরজিক কার্যত মুগ্ধ। বর্তমানে তিনি এক স্বনামধন্য নাট্যকার। তাঁর মতে, আধুনিক ফুটবল থেকে ড্রিবলিং প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু মেসি তাঁর জেদ দিয়ে সেই শৈল্পিক ড্রিবলিংয়ের ধারাকে একাই বাঁচিয়ে রেখেছেন (Lionel Messi Dribbling)।
সুরে সুর মিলিয়েছেন ফরাসি কিংবদন্তি উইলিয়াম গালাসও। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসির বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় মেসিকে কীভাবে আটকাবেন, অকপটে জবাব ছিল, ‘আমি জানি না।’ আরও জানান, ম্যাচের আগে মেসির ভিডিও দেখা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। মাঠে নেমে ইউটিউবের হাইলাইট রিলের শিকার হতে কে-ই বা চায়!
শট নেওয়ার অভিনব শৈলী ও গোলরক্ষকদের অসহায়তা
মেসির ড্রিবলিংয়ের মতোই তাঁর শট নেওয়ার ভঙ্গিও এক অদ্ভুত রহস্যে মোড়া। বল পায়ে ঠিক কোন দিকে শট নেবেন, তা আগে থেকে আঁচ করা একপ্রকার অসম্ভব।
অ্যাথলেটিক ক্লাবের প্রাক্তন গোলরক্ষক গোর্কা ইরাইজোজ এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। তিনি মেসির বিরুদ্ধে মোট ২৭টি ম্যাচ খেলেছেন। হজম করেছেন ১৮টি গোল। ইরাইজোজের মতে, ‘আপনার মনে হবে সবদিক আটকে ফেলেছেন। আপনি জানেন এরপর কী হতে চলেছে। ঠিক তখনই ও এমন কিছু করে বসবে, যা কল্পনারও বাইরে!’
গোলরক্ষকদের মতে, মেসির শারীরিক গড়ন তাঁকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। খুব বেশি পা না চালিয়েই এমন শট নেন, যার গতিপথ বোঝা প্রতিপক্ষের পক্ষে অসম্ভব। ইরাইজোজের মতে, মেসি শরীরটাকে এমনভাবে ব্যবহার করেন যা গোলরক্ষকরা অনুমানের বাইরে। বল রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গেই গতি বাড়িয়ে দিতে পারেন। আবার মুহূর্তে ধীর হয়ে গিয়ে নিখুঁত ফিনিশে ক্ষুরধার।
১৩ বছর আগে সান মামেসে মেসির করা একটি সোলো গোলের কথা আজও ইরাইজোজের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। বল নিয়ে ৩০ গজ দূর থেকে দৌড় শুরু করে, একের পর এক ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে যে নিখুঁত শটটি নিয়েছিলেন, তা গোলরক্ষকদের অসহায়তাকেই বারবার প্রমাণ করে। প্রাক্তন ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরির মতে, ‘সাধারণ একটা গোড়ালির ছোঁয়ায় মেসি যে গতিতে দিক পরিবর্তন করেন, তা অবিশ্বাস্য!’
হেঁটে হেঁটে বিপক্ষকে ধ্বংস করার ব্লু-প্রিন্ট
স্রেফ দৌড় নয়। মাঠে মেসির হাঁটাচলা নিয়েও বিস্তর গবেষণা চলেছে। বল ছাড়া যখন তিনি হাঁটেন, তখন গোটা মাঠের ছবি নিজের মস্তিষ্কে গেঁথে নেন। বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় যার নাম 'মাইক্রো-স্ক্যানিং'। ফরাসি ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারান, মেসির বিরুদ্ধে ২১ বার মাঠে নেমেছেন, তাঁর মতে মেসির এই হাঁটাচলাই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। ফরাসি ডিফেন্ডারের মন্তব্য, 'মেসির বিশেষত্ব হল, এমন সব জায়গায় হেঁটে বেড়ানো, যেখানে কে তাঁকে মার্ক করবে তা নিয়ে ডিফেন্ডারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়!’
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তিনি দৌড়াচ্ছেন না। ফলে মার্কাররাও কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েন। কিন্তু আসলে তিনি চলতে-ফিরতে নিজেকে এমন এক সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যান, যেখান থেকে অনায়াসেই আক্রমণ শানানো সম্ভব।
ফলিত গণিতের অধ্যাপক ডেভিড সাম্পটার বার্সেলোনার হয়ে কাজ করার সময় মেসির এই অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা চালান। তাঁর মতে, মাঠে মেসি এমন কিছু ফাঁকা স্পেস খুঁজে বের করেন, যা অন্য খেলোয়াড়দের চোখে পড়ে না। মনে হয় যেন তিনি ১০ মিনিট পরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন! সেল্টিকের প্রাক্তন কোচ ব্রেন্ডান রজার্সও একবার জানিয়েছিলেন যে, তাঁর দলের ডিফেন্ডার জোজো সিমুনোভিচ মেসির দৃষ্টির সামনে রীতিমতো অস্বস্তিতে ভুগেছিলেন। বল ছাড়াই মেসি যেভাবে বিপক্ষের পজিশন খুঁটিয়ে দেখেন, তা যে কোনও ডিফেন্ডারের মনে ভয় ধরানোর জন্য যথেষ্ট।
বয়সকে হার মানানো এক চিরন্তন ফুটবল-মস্তিষ্ক
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেসির খেলার ধরনে বদল এসেছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর তীক্ষ্ণতা এতটুকুও কমেনি। ২০২২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে এই পরিবর্তিত রূপটি সবচেয়ে বেশি নজরে আসে। তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ার সহকারী কোচ রেনে মেউলেনস্টিনের কথায়, তাঁরা জানতেন মেসি আর আগের মতো বল তাড়া করবেন না। তাই পিছন থেকে খেলা তৈরির ছক কষেছিলেন। কিন্তু বল পায়ে পেলে এখনও কতটা ভয়ংকর, তা মাঠে নেমে বুঝিয়ে দেন মেসি। তাঁর শরীরের গঠনই এমন যে, নিমেষে দিক পরিবর্তন করতে পারেন।
স্প্রিন্ট কোচ জোনাস ডোডোর মতে, খাটো শরীর এবং ছোট পা মেসিকে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র করে তুলেছে (World Cup Quarter Final)। আটলান্টা ইউনাইটেডের হয়ে খেলা ট্রিস্টান মুয়ুম্বার চোখে, আর্জেন্তিনীয় তারকা তাঁর শরীরকে অসাধারণভাবে ব্যবহার করতে জানেন। খুব একটা কথা বলেন না। কিন্তু তাঁর মুখে একটা শান্ত হাসি লেগে থাকে। মুয়ুম্বার মতে, মেসির অবয়বে এক অদ্ভুত ধরনের দয়াপরবশ প্রলেপ মাখানো। আর সেই বিভ্রমটুকুই বিপক্ষকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আজ সুইসদের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন চলতি টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে ৮ গোল করে ফেলা মেসি। এখনও মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই বিপক্ষের কাছে এক অজানা আতঙ্কের শুরু। হয়তো এটাই সর্বকালের সেরার সবচেয়ে বড় লক্ষণ!
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)