ছবির জন্য জুতো ধার করতে হয়েছিল, সেই শিশুই চার বার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট: লুলার অন্য গল্প
সেই লুলা আবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (Brazilian Presidential Election) জয়ী হয়েছেন। ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোকে (Bolsonaro) হারিয়ে চতুর্থ বার দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচিত পদে যাওয়ার জনাদেশ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনী সাফল্যের এই দীর্ঘ ইতিহাসের আড়ালে রয়েছে এক শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই এবং তার মায়ের অসাধারণ জেদ।
তিন বছরের একটি শিশু। দিদির সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছে। কিন্তু তার নিজের জুতো নেই। ছবির জন্য পোশাক আর পায়ের চেয়ে বড় একজোড়া স্যান্ডেল ধার দিলেন ফোটোগ্রাফার।
ব্রাজিলের (Brazil) প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার (Lula Da Silva) জীবনের প্রথম ছবিটির পিছনে এমনই একটি গল্প রয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত জীবনপঞ্জিতে ঘটনাটির উল্লেখ আছে। বিশ্বরাজনীতির পরিচিত মুখটির জীবন শুরু হয়েছিল এমন এক পরিবারে, যেখানে ছবি তোলার জুতোও ছিল বিলাসিতা।
সেই লুলা আবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (Brazilian Presidential Election) জয়ী হয়েছেন। ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোকে (Bolsonaro) হারিয়ে চতুর্থ বার দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচিত পদে যাওয়ার জনাদেশ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনী সাফল্যের এই দীর্ঘ ইতিহাসের আড়ালে রয়েছে এক শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই এবং তার মায়ের অসাধারণ জেদ।
১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বের পারনামবুকো অঞ্চলে জন্ম লুলার। কৃষিকাজে কোনও রকমে সংসার চালাত তাঁর পরিবার। মা ইউরিদিসি ফেরেইরা দি মেলো, সকলের কাছে দোনা লিন্ডু। বাবার নাম আরিস্তিদিস। অভাবের সংসারে জমিতে কাজ করাই ছিল মায়ের কাছে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার প্রধান অবলম্বন। বাবা কাজের খোঁজে দক্ষিণে চলে গিয়েছিলেন।
শৈশবের সেই বাড়িটির বিবরণও সংরক্ষিত রয়েছে। মাটির মেঝে, দু’টি ঘর। কলের জল নেই, শৌচাগার নেই। টেবিল-চেয়ারও নেই। শিশুরা ঘুমোত হ্যামকে—দোলনার মতো ঝোলানো বিছানায়। সেই হ্যামকের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের ভবিষ্যৎ সেখানে কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
সাত বছর বয়সে লুলার জীবনের প্রথম বড় যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে মা সন্তানদের নিয়ে উঠে বসেন একটি ট্রাকে। পিছনে পড়ে থাকে পরিচিত গ্রাম। সামনে সাও পাওলো অঞ্চলে স্বামীর কাছে পৌঁছনোর আশা। পথ পেরোতে সময় লেগেছিল তেরো দিন।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে নিশ্চিন্ত সংসার মেলেনি। লুলার বাবা সেখানে আরেকটি পরিবার গড়েছেন। নতুন শহরে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার লড়াই ফের মায়ের কাঁধে। লুলা এবং তাঁর ভাইদেরও কাজে নামতে হয়।
অনেক অভিবাসী পরিবারের কাছে বড় শহর ছিল নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি। লুলাদের কাছে সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম অর্থ হয়ে দাঁড়াল—ছোটদেরও রোজগার করতে হবে।
তিনি রাস্তায় জিনিস বিক্রি করেছেন, জুতো পালিশ করেছেন। বারো বছর বয়সে কাজ পেয়েছেন কাপড় রং করার দোকানে। অফিসের ছোটখাটো কাজও করেছেন। ১৯৫৬ সালে পরিবার সাও পাওলো শহরে এসে ওঠে একটি বারের পিছনের একটিমাত্র ঘরে। যে বয়সে শিশুর স্কুল আর খেলার মাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে লুলার দিন কাটছিল সংসারে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টায়।
লুলার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অবশ্যই মা দোনা লিন্ডু। অভাবের মধ্যেও তিনি ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফজিভি-র তথ্য অনুযায়ী, মায়ের জোরেই লুলা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। পরে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেনাইয়ে যন্ত্রের কাজ শেখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। কারখানার দক্ষ শ্রমিক হওয়ার একটি পথ অবশ্য খুলেছিল।
কারখানা তাঁকে জীবিকা দিয়েছিল। শরীরে একটি স্থায়ী ক্ষতও রেখে দিয়েছিল।
১৯৬৪ সালে এক রাতে কাজ করার সময়ে যন্ত্রে তাঁর বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুল কাটা যায়। তখন দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করতে হত। এফজিভি-র বিবরণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার তেরো দিন পরেই তিনি কাজে ফিরে যান। পরে কর্মহীনতার অভিজ্ঞতাও হয়। প্রায় ছ’মাস কারখানা থেকে কারখানায় ঘুরে কাজ খুঁজেছেন। লুলার পরিচিত ছবিগুলিতে বাঁ হাতের অনুপস্থিত আঙুলটি তাই তাঁর শ্রমিকজীবনের একটি দৃশ্যমান ইতিহাস।
সেই শ্রমিক কী ভাবে নেতা হলেন?
ভাইয়ের সূত্রে শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ। ১৯৬৯ সালে ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিকল্প সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে ইউনিয়নের সভাপতি। তাঁর প্রতিনিধিত্বে তখন এক লক্ষ শ্রমিক। সত্তরের দশকের শেষে ব্রাজিলের সামরিক শাসনের মধ্যে শ্রমিক ধর্মঘটের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন লুলা। ১৯৮০ সালে অন্য শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ওয়ার্কার্স পার্টি। সে বছর ধর্মঘটের জেরে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথেও টানা সাফল্য ছিল না। ১৯৮৯, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮—তিনটি নির্বাচনে পরাস্ত হন। প্রথম জয় আসে ২০০২ সালে। এক সময়ের কারখানাশ্রমিক ২০০৩ সালে দেশের শাসনভার নেন। তাঁর উত্থান ব্রাজিলের বহু নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে পরিচিত জীবন থেকে উঠে আসা একজনের রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছনোর ঘটনা হয়ে ওঠে।
ক্ষমতায় এসে তাঁর সরকারের প্রধান উদ্যোগগুলির মধ্যে জায়গা পায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলা। ‘ফোমি জিরো’ বা ‘জিরো হাঙ্গার’ এবং ‘বলসা ফামিলিয়া’র মতো কর্মসূচিতে খাদ্যনিরাপত্তা, দরিদ্র পরিবারের আয়, শিশুদের স্কুলে থাকা ও স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিজের শৈশবের সঙ্গে এই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের যোগ খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক, যদিও একটি সরকারের সাফল্য ব্যাখ্যা করতে ব্যক্তিগত জীবনকাহিনির বাইরেও অর্থনীতি ও নীতির বিচার প্রয়োজন।
লুলার জীবনের কম আলোচিত গল্পটি তাই শুধু একজন দরিদ্র শিশুর প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা নয়। সেই গল্পে রয়েছেন এক মা, যিনি সন্তানদের নিয়ে তেরো দিনের ট্রাকযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। রয়েছেন জুতোহীন এক শিশু, যার প্রথম ছবির জন্য ফোটোগ্রাফারকে স্যান্ডেল ধার দিতে হয়েছিল। রয়েছে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ, কারিগরি শিক্ষা এবং কারখানার শ্রম।
চতুর্থ নির্বাচনী জয়ের পরে লুলাকে ঘিরে যখন ক্ষমতার হিসাব চলছে, তখন প্রথম ছবিটির দিকে ফিরে তাকানো যায়। সেখানে ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টকে চেনার কোনও উপায় নেই। দেখা যায় শুধু একটি শিশুকে—যার নিজের পায়ে পরার জুতোও ছিল না।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0