ভারতের নতুন জিডিপি হিসাব পদ্ধতিতে সায় IMF-এর, বিতর্ক জিইয়ে রাখছে বৃদ্ধির হার
ভারতের নতুন জিডিপি গণনা পদ্ধতিতে সায় দিল আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (IMF)।
ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন বিরোধীরা। তার মাঝেই কেন্দ্রের নতুন জিডিপি (GDP) গণনা পদ্ধতিতে সায় দিল আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (IMF)। সংস্থার বক্তব্য, জিডিপি মাপার পদ্ধতিতে সংশোধন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেরা পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে এই সমর্থনের মধ্যেও ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান কতটা বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। প্রত্যাশার তুলনায় বেশি এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পরই আগের বছরের হিসাব সংশোধন এবং বৃদ্ধির হার নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সেই আবহে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের অধিকর্তা কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানিয়েছেন, ভারতের পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে সংশোধন তাদের পরিসংখ্যান বিভাগের দেওয়া পরামর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জিডিপির ভিত্তিবছর (Base Year) বদলকেও স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মানোন্নয়নে পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের উদ্যোগের প্রশংসা করলেও, এই ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রীনিবাসন।
কেন বদলানো হল জিডিপি মাপার পদ্ধতি?
২০২৬ সালে ভারতের জিডিপির বার্ষিক ও ত্রৈমাসিক হিসাবের নতুন সিরিজ প্রকাশ করা হয়। সেখানে ভিত্তিবছর ২০১১-১২ থেকে বদলে ২০২২-২৩ করা হয়েছে। অর্থনীতির কাঠামো, মানুষের খরচের ধরন এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে পরিবর্তনের সঙ্গে হিসাবকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভিত্তিবছর বদলানো হয়।
নতুন সিরিজে উৎপাদন ক্ষেত্রের হিসাব এবং মূল্যসূচক ব্যবহারের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। উৎপাদনের প্রকৃত বৃদ্ধি মাপতে পণ্য ও পরিষেবার দামের ওঠানামা কী ভাবে হিসাব করা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ক্ষেত্রে ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ (Double Deflation) পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের দামের পরিবর্তন আলাদা করে হিসাব করা যায়। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ দিয়ে উৎপাদনের প্রকৃত পরিবর্তন নির্ণয়ে সুবিধা হয়।
৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন কেন?
প্রথম ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আগের ৭ শতাংশের পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে যায়। এর পরেই প্রাক্তন অর্থসচিব এসসি গর্গ প্রশ্ন তোলেন, আগের বছরের সংশ্লিষ্ট সময়ের জিডিপির হিসাব কমিয়ে দেওয়ায় কি চলতি বছরের বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি দেখাচ্ছে?
এক বছরের নির্দিষ্ট সময়ের উৎপাদনের সঙ্গে আগের বছরের একই সময়ের উৎপাদনের তুলনা করেই বৃদ্ধির হার নির্ণয় করা হয়। ফলে আগের বছরের হিসাব সংশোধন হলে বৃদ্ধির হারেও পরিবর্তন আসতে পারে। গর্গের বক্তব্য ঘিরে সেই সংশোধনের প্রভাব নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়। অন্যদিকে, কেন্দ্রের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন তাঁর পদ্ধতিকে ‘তথ্য বেছে নেওয়া’ বা ‘চেরি-পিকিং’ বলে সমালোচনা করেন। সরকারের বক্তব্য, নতুন পদ্ধতি ও সংশোধিত তথ্যের ভিত্তিতেই হিসাব বদলেছে।
বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও অর্থনীতির স্থিতি
আইএমএফ জানিয়েছে, জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের বৃদ্ধির হার তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। পরিষেবা ক্ষেত্র ও রফতানির ভাল ফল এই বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রেও ভারতের অর্থনীতির ভিত তুলনামূলক মজবুত ছিল বলে মত শ্রীনিবাসনের।
তবে ভারত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি খরচ, মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার বিনিময়মূল্যের উপরে চাপ তৈরি হতে পারে। আইএমএফের বক্তব্যে নতুন হিসাব পদ্ধতির প্রতি সমর্থন মিললেও, নির্দিষ্ট বৃদ্ধির হার ব্যাখ্যা করা এবং সেই পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা—দুটি আলাদা বিষয় হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0