শুধু লিভার নয়, মস্তিষ্কেও নীরবে বিরাট ক্ষতি করে অ্য়ালকোহল! অল্প খেলেও নিস্তার নেই
মদ্যপানের ফলে শুধু লিভার নয়, মস্তিষ্কেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়। কী বলছেন নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ডাঃ নেহা পণ্ডিতা?
মদ্যপানের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উঠলেই সাধারণত লিভার বা হৃদরোগের ঝুঁকির প্রসঙ্গ সামনে আসে। তবে চিকিৎসকদের মতে, অ্যালকোহলে (Alcohol) অন্যতম বেশি ক্ষতি নেমে আসে মস্তিষ্কের উপরে। নিয়মিত বা অতিরিক্ত মদ্যপান তো বটেই, তুলনামূলক কম পরিমাণ অ্যালকোহলও স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ নেহা পণ্ডিতার মতে, শুরুতে এই পরিবর্তনগুলি খুব একটা চোখে না পড়লেও সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্মে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অ্যালকোহলের প্রথম আঘাত পড়ে হিপোক্যাম্পাসে (Hippocampus), যা স্মৃতি গঠন এবং শেখার প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তরের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অনেক সময় অতিরিক্ত মদ্যপানের পরে মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলা বা চলাফেরা করলেও পরবর্তীকালে সেই সময়ের কোনও স্মৃতি মনে থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ব্ল্যাকআউট (Blackout) বলা হয়।
স্মৃতিশক্তির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব (Frontal Lobe), যা মনোযোগ, পরিকল্পনা, বিচারবোধ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। এর প্রভাবে সাধারণ কথোপকথন অনুসরণ করা, পরিচিত মানুষের নাম মনে রাখা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা সহজ সমস্যার সমাধান করতেও বেশি সময় লাগতে পারে। কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অনেকের ধারণা, অ্যালকোহল ঘুম ভাল হতে সাহায্য করে। বাস্তবে তা নয়। প্রাথমিকভাবে ঘুম এলেও গভীর ঘুম এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM Sleep)-এর স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়। অথচ এই দুই পর্যায়ই স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপরিহার্য। ফলে পরদিন মনোযোগ কমে যায়, চিন্তাভাবনা ধীর হয়ে পড়ে এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতাও হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে শরীরে ভিটামিন বি১ বা থায়ামিনের (Thiamine) ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর জেরে ওয়েরনিকে এনসেফ্যালোপ্যাথি (Wernicke's Encephalopathy) এবং করসাকফ সিনড্রোম (Korsakoff's Syndrome)-এর মতো গুরুতর স্নায়ুরোগের ঝুঁকি বাড়ে, যা স্থায়ী স্মৃতিভ্রংশের কারণও হতে পারে।
তবে অ্যালকোহলের প্রভাব সকলের ক্ষেত্রে একরকম হয় না। বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টি, পূর্ববর্তী অসুস্থতা এবং কতদিন ও কতটা মদ্যপান করা হচ্ছে— এই সবকিছুই ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, ভুলে যাওয়া, মনোযোগের অভাব বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়াকে শুধু বয়স বা ব্যস্ত জীবনের ফল বলে এড়িয়ে না গিয়ে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, অ্যালকোহল কমানো এবং প্রয়োজন হলে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণই দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)