World Cup 2026: এবারের বিশ্বকাপে ৬৩ শতাংশ সময় শুধুই হেঁটেছেন মেসি! অলস পদচারণা, নাকি শিকারির ছদ্মবেশ?
বিশ্বকাপে ৬৩ শতাংশ সময় মাঠে কেবল হেঁটেছেন লিওনেল মেসি। অথচ আটটি গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে শীর্ষে। ফুটবল জাদুকরের এই 'হাঁটা'র আড়ালে লুকিয়ে কোন ঘাতক কৌশল?
সেরা খেলোয়াড়দের কাছে ফুটবল কখনও কখনও পার্কে সান্ধ্যভ্রমণ!
লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে অন্তত এটাই সত্যি। চলতি বিশ্বকাপে মাঠে তাঁর কাটানো সময়ের ৬৩ শতাংশই স্রেফ হেঁটেচলে বেরিয়ে! আর বাকি ২৫ শতাংশ? তিনি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। মাঠে তাঁর জগিংয়ের পরিমাণ মাত্র ৮.৬ শতাংশ, যা টুর্নামেন্টের গড়ের (২৩ শতাংশ) চেয়ে ঢের কম। স্প্রিন্ট? প্রায় নেই বললেই চলে।
কিন্তু এই পরিসংখ্যান, বিশেষজ্ঞদের মতে, নেহাতই মরীচিকা। মাঠে অলস ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়ানোর আড়ালেই লুকিয়ে তাঁর আসল মগজাস্ত্র (Lionel Messi)। তথ্যের পুঞ্জে এই বিপুল পরিমাণ হাঁটাহাঁটি থাকলেও, গোলের সুযোগ তৈরিতে তিনি তিন নম্বরে (১৫টি)। কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যুগ্মভাবে ৮ গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে সবার আগে। মিশরের বিরুদ্ধে ৩-২ ব্যবধানের রুদ্ধশ্বাস জয় ও আজ সুইৎজারল্যান্ড ম্যাচেও সেই একই ছবি।
প্রাক্তন কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা একবার বলেছিলেন, 'দেখে মনে হবে ও শুধু হেঁটে বেড়াচ্ছে। লিগে সবচেয়ে কম দৌড়য়। কিন্তু বল পায়ে এলেই ওর কাছে স্পেস ও টাইমের সম্পূর্ণ এক্স-রে রিপোর্ট তৈরি থাকে। তারপর... বুম!' (FIFA World Cup 2026)। ভুল বলেননি পেপ৷ তথ্য বলছে, যখন স্প্রিন্ট করেন মেসি, তখন সেই দৌড়ের ৭১ শতাংশ শেষ হয় বিপক্ষের থার্ডে। আর ২১ শতাংশ সিধে পেনাল্টি বক্সে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন সহকারী কোচ রেনে মেউলেনস্টিনের পর্যবেক্ষণ, 'মাঠে ৮০ শতাংশ সময় ও স্রেফ ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ফাইনাল থার্ডে এলেই আসল মেজাজে জ্বলে ওঠে।' অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ২-০ ব্যবধানের জয়েও ঠিক একইভাবে গোল করেছিলেন আর্জেন্তিনীয় মহাতারকা (World Cup 2026)।
বল ছাড়া নিশ্চল, তবু সতীর্থদের পূর্ণ আস্থা
আধুনিক ফুটবলে হাই-প্রেসিং কৌশলই শেষ কথা। সেখানে মেসির এই হাঁটাচলা দলের রক্ষণে একটা বাড়তি চাপ ফেলে। ট্র্যাক-ব্যাক তিনি একেবারেই করেন না। কিন্তু সতীর্থরা এটুকু বাড়তি বোঝা হাসিমুখে বইতে রাজি।
ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য পাবলো জাবালেতার কথায়, 'স্ট্রাইকারদের যদি দ্বিগুণ দৌড়তেও হয়, ওরা দৌড়বে। কারণ ও জাদুকরী মুহূর্তগুলো তৈরি করে।' বল ছাড়া তিনি নিশ্চল (Argentina National Team)। দেখে মনে হতে পারে, খেলায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ কিংবা মনযোগ নেই। কিন্তু এটাই মেসির সবচেয়ে বড় ফাঁদ। মিশরের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়ার পর স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থেকেই তিনি নতুন ছক কষেছিলেন। একেবারে শুরুর দিকের মতো উইংয়ে সরে গিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেন বিপক্ষের রক্ষণ (Football Match Analysis)।
আসলে আপা-অচল সেই দীর্ঘ মুহূর্তগুলোর আড়ালেই সজাগ থাকে এক ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। ঠিক যেন শিকারের জন্য ওত পেতে বসে থাকা তুখোড় শিকারি।
বিশ্লষকদের নজরে, ৩৯ বছর বয়সে এভাবে শক্তি সঞ্চয় করছেন মেসি। শৈশবে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলার সময় দৌড়তে বললে গাছের আড়ালে পালাতেন! সেই ফাঁকিবাজিই আজ তাঁর ঘাতক ছদ্মবেশ (Argentina Football Team)।
বিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার নিখুঁত মগজাস্ত্র
ঠিক কোথায় হাঁটেন মেসি? ফিফার হিটম্যাপ বলছে, সেন্টার সার্কেল এবং পেনাল্টি বক্সের মাঝের ডানদিকের পকেটে তাঁর ঘুরপাকের হার সবচেয়ে বেশি। বিপক্ষের মিডফিল্ড ও রক্ষণভাগের মাঝে ৯৭ বার বল পেয়েছেন। নিজে না ছুটে সতীর্থদের দিয়ে বিপক্ষ রক্ষণকে সরান। স্পেস তৈরি করেন।
প্রাক্তন ফরাসি ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারানের কথায়, 'মেসি এমন সব জায়গায় হাঁটে, যেখানে কে তাঁকে মার্ক করবে তা নিয়ে ডিফেন্ডারদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয় (Football Tactics Analysis)। ডিফেন্ডার, ফুল-ব্যাক নাকি মিডফিল্ডার, কার দায়িত্ব সেটা বোঝা দায়!' উইলিয়াম গালাসের মতে, মেসিকে মার্ক করতে যাওয়া আরও বিপজ্জনক। বলেন, 'আপনি ওর কাছাকাছি গেলেই বিপদ। পিছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে, আর ও ঠিক সেটাই চায়।' ডিফেন্ডারদের এই দোটানায় ফেলেই বাজিমাত করেন আর্জেন্তিনীয় অধিনায়ক। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ঠিক এই ছকেই ফুল ফুটিয়েছিলেন মেসি।
জ্যামিতিক ছকে হঠাৎ গতির বিস্ফোরণ
তাঁর হাঁটার ছন্দে বিপক্ষ মার্কার এক চরম নিশ্চিন্ততার ভুয়ো বোধে আচ্ছন্ন হন৷ ডিফেন্স লাইন যখন উপরে ওঠে, তিনি অফসাইড ফাঁদ এড়াতে ধীর পায়ে হাঁটেন। ডিফেন্ডাররা তাঁর অস্তিত্ব পর্যন্ত ভুলে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক নিখুঁত জ্যামিতিক ছকে অনসাইডে ঢুকে বল ধরে দৌড়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)