World Cup 2026: জাত উইঙ্গারের অভাব, অতিরিক্ত মেসি-নির্ভরতা! আর্জেন্তিনার মাঝমাঠের ফাটল এখন আরও প্রকট
৩৯ বছরের মেসির জাদুতে ভর করে বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য আর্জেন্তিনা। তবে মিশরের বিরুদ্ধে খাদের কিনারা থেকে ফেরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মাঝমাঠের দুর্বলতা ও অত্যধিক মেসি-নির্ভরতা কি আগামী দিনে ডোবাবে? রইল চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বছর বয়সেও জীবনের সেরা ছন্দে লিওনেল মেসি। তাঁর ক্যারিশমায় ভর করেই বিশ্বকাপের নকআউটে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটছে আর্জেন্তিনা (FIFA World Cup 2026)। মিশরের বিরুদ্ধে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ০-২-তে পিছিয়ে থাকার পরেও, মাত্র পনেরো মিনিটের ঝড়ে ৩-২ ব্যবধানে রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে নেয় স্কালোনির দল। প্রথম গোলে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোকে দিয়ে হেড করানো, চার মিনিট পর বক্সের জটলা থেকে অবিশ্বাস্য ভলিতে সমতা ফেরানো এবং ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে সেই এলএমটেন।
এর আগে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে (৩-২ গোলের) জয়েও ত্রাতা ছিলেন তিনি (Argentina Football Team)। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ২৫ বছর ট্রফিহীন আর্জেন্তিনা। এখন তারা টানা ১২ ম্যাচে বিজয়ী। গত চার বছরে হেরেছে মাত্র চারটি।। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় মাত্র একটি গোল হজম করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের থেকে মাত্র তিন কদম দূরে। ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও কিলিয়ান এমবাপে এবং আর্লিং হ্যালান্ডকে পিছনে ফেলেছেন মেসি।
মাঝমাঠের কঙ্কালসার দশা ও প্রতি-আক্রমণের জুজু
বাইরে থেকে সব নিখুঁত মনে হলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খোলসের ভেতরে ফাটল স্পষ্ট। আটলান্টায় মিশরের প্রতি-আক্রমণের সময় আর্জেন্তিনার মাঝমাঠের অ্যাথলেটিসিজমের অভাব প্রকট। হুলিয়ান আলভারেজ প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার চেষ্টা করলেও চূড়ান্ত ব্যর্থ। মিশরের রাইট মিডফিল্ডার হাইসেম হাসান অনায়াসে এনজো ফার্নান্দেজকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন। বারবার। তাঁর পাস থেকেই বল পেয়ে মহম্মদ সালাহ আর্জেন্তিনার দুই ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে মোস্তফা জিকোকে দিয়ে গোল করান। প্রথমে ভিএআর-এর বিতর্কিত সিদ্ধান্তে তা বাতিল হয় (VAR Controversy)।
কিন্তু ঠিক নয় মিনিট পর, মেসির কর্নার ক্লিয়ার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফের প্রতি-আক্রমণ শানায় মিশর। সালাহ ও হাসানের যুগলবন্দিতে বক্সে বল পেয়ে গোল করে সেই জিকোই দলকে এগিয়ে দেন। লিয়ান্দ্রো পারেদেস কিংবা রক্ষণের কেউ সেই গতির তরঙ্গ রুখতে পারেননি। রক্ষণভাগও হরেদরে প্রতিক্রিয়াশীল ফুটবল খেলছে, যা বিপদের সবচেয়ে বড় সংকেত!
উইংহীন ছক এবং অত্যধিক মেসি-নির্ভরতা
স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকৃত উইঙ্গারের অভাব। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অবসরের পর থিয়াগো আলমাদা ছাড়া দলে আর কোনও জাত উইঙ্গার নেই। এই প্রসঙ্গে কোচ স্কালোনির বক্তব্য, ‘আলমাদা আমাদের ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে কিছুটা সুবিধা দেয়। আগে চারজন মিডফিল্ডার ছিল, যাদের কাজ মূলত বলের দখল ও পায়ের কাজের উপর নির্ভরশীল!’
দলের আক্রমণভাগের প্রশস্ততা নির্ভর করছে দুই ফুল-ব্যাক, বিশেষত নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওভারল্যাপের উপর (Argentina Match Analysis)। মিশরের বিরুদ্ধে আর্জেন্তিনা মোট ২৬টি ক্রস করেছে, যার মধ্যে ১৮টি এসেছে ওপেন প্লে থেকে। স্কালোনির জমানায় সর্বোচ্চ। উইঙ্গার না থাকায় ৪-৪-২ ছকে মাঝমাঠকে বক্সের মতো ব্যবহার করে মেসিকে জায়গা করে দেওয়ার কৌশল পরিষ্কার। কিন্তু মিশর সেই মাঝমাঠ ব্লক করে দেওয়ায় বারবার বিপাকে পড়তে হয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। সমস্ত আক্রমণ তৈরির দায়িত্ব একা অধিনায়কের কাঁধে এসে পড়ায় খেলা অনেকটাই অনুমানযোগ্য হয়ে পড়ছে।
পেনাল্টি-ফস্কানো এবং আগামী দিনের অশনিসংকেত
অতিরিক্ত মেসি-নির্ভরতা আগামী দিনে বড়সড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। মিশরের বিরুদ্ধে ফাউল আদায় করে পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্তিনা। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের অষ্টম স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ মেসি, যা তাঁর কেরিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ পেনাল্টি মিস। গোলরক্ষক মোস্তফা শোবির বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এরপর থেকে স্কালোনির উচিত ম্যাক অ্যালিস্টার বা ফার্নান্দেজকে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া (Lionel Messi)।
গত বিশ্বকাপের রানার্স আপ ফ্রান্সের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, আর্জেন্তিনার ওপেন-প্লে থেকে গোল করার বিকল্প অনেক কম। জর্ডনের বিরুদ্ধে গ্রুপের শেষ ম্যাচেও তাদের নির্ভর করতে হয়েছিল মেসি এবং লো সেলসোর ফ্রি-কিক ও লাউতারো মার্তিনেসের পেনাল্টির উপর।
মিশরের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর মাঠেই কেঁদে ফেলেন স্কালোনি, যা প্রমাণ করে এই লড়াই কতটা স্নায়ুর চাপ বাড়িয়েছিল। মেসি-কেন্দ্রিক রণনীতি এখনও পর্যন্ত জেতাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ফাটলগুলো বুজে যাওয়ার বদলে ক্রমশ চওড়া হচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)