আর্সেনালে বাতিল ছেলেটাই জিতে নিল ব্যালন ডি'অর! খাঁটি 'নাইন' হ্যারি কেন কীভাবে নিখুঁত 'টেন' হয়ে উঠলেন?
আর্সেনাল অ্যাকাডেমি থেকে বাতিল হওয়া এক কিশোর কীভাবে বিশ্বফুটবলের রাজা হয়ে উঠলেন? খাঁটি 'নাইন' থেকে নিখুঁত 'টেন' হয়ে ওঠা হ্যারি কেনের রূপকথার গল্প।
মঞ্চে কিংবদন্তি রোনাল্ডো নাজারিও। গোটা লন্ডন প্যালেডিয়ামে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। দর্শকাসনে বসে থাকা ৩৩ বছরের এক তারকার চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা। তারপর নামটা ঘোষণা হতেই উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ! কিলিয়ান এমবাপে ও লামিন ইয়ামালকে টপকে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি'অর (Ballon d'Or 2026) জিতলেন হ্যারি কেন।
মাইকেল ওয়েনের পর, দীর্ঘ ২৫ বছরের খরা কাটিয়ে ফের কোনও ইংরেজের হাতে এল ফুটবলের এই শ্রেষ্ঠ সম্মান। জিমি গ্রিভস, ববি মুর, ডেভিড বেকহ্যাম বা ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডরা ব্যালনের মঞ্চে উঠলেও ট্রফি ছুঁতে পারেননি। কেন-ই প্রথম লন্ডনবাসী হিসেবে এই খেতাব জিতলেন। একসময় যাঁকে 'ট্রফিহীন' বলে কটাক্ষ করত ফুটবল দুনিয়া, আজ সেই তারকা বিশ্বফুটবলের অবিসংবাদিত নবাব! বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে তিনটি ট্রফি আর দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ—সব মিলিয়ে স্মরণীয় মরশুম। তবে এই সাফল্যের চাইতেও চমকপ্রদ হ্যারি কেনের হ্যারি কেন হয়ে ওঠার গল্প।
আর্সেনালের প্রত্যাখ্যান ও জেদের জন্ম
লন্ডনের অলিগলি থেকে ব্যালন মঞ্চ—কেনের (Harry Kane) যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। আট বছর বয়সে আর্সেনাল অ্যাকাডেমি থেকে বিতাড়িত হন। সেদিন পাশে ছিলেন বাবা। পিঠ চাপড়ে শুধু এটুকুই বলেছিলেন, 'চিন্তা কোরো না হ্যারি। আমরা আরও খাটব। অন্য ক্লাব খুঁজব।'
প্রত্যাখ্যানের আগুনই হয়তো জ্বালিয়ে দিয়েছিল কেনের জেদ। ফিরে যান নিজের প্রথম ক্লাব রিজওয়ে রোভার্সে (Ridgeway Rovers)। যে স্কুল থেকে উঠে এসেছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, সেখানেই চলে পড়াশোনা। ছোটবেলায় রিজওয়ে পার্কে গাছের গুঁড়িকে গোলপোস্ট বানিয়ে খেলতেন। তখন থেকেই মধ্যে জন্ম নেয় হার না মানা এক মানসিকতা।
স্কুলের শিক্ষক ডেনিস ম্যাকএলিগটের স্মৃতিতে আজও ভাসে সেই শান্ত অথচ জেদি কিশোরের মুখ। যিনি স্কুলের বন্ধুদের আড্ডার চেয়ে মাঠে দৌড়নোটাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে ডেভিড বেকহ্যামের অ্যাকাডেমির উদ্বোধনে হাজির ছিলেন কিশোর কেন। বেকহ্যামের মতোই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন হয়তো সেদিনই বুনে ফেলেছিলেন।
অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্পার্সের ঘরের ছেলে
২০১১ সালে ১৮ বছর বয়সে হ্যারি রেডন্যাপের কোচিংয়ে পাওক সালোনিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপা লিগে কেনের অভিষেক। তখন কেউ বুঝতেই পারেনি, ছেলেটা ঠিক কোন পজিশনের খেলোয়াড়। ফিজিক্যাল প্রেজেন্স কি যথেষ্ট? এরপর মিলওয়াল এবং লেটন ওরিয়েন্টে লোন স্পেল। লেটনের হোমগ্রাউন্ড ব্রিসবেন রোডে সেই প্রথম লিগ স্টার্ট। অবশেষে মরিসিও পচেত্তিনোর হাত ধরে টটেনহ্যাম হটস্পারের (Tottenham Hotspur) মূল দলে সুযোগ।
হোয়াইট হার্ট লেনের দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠেন 'ঘরের ছেলে'। স্পার্সের জার্সিতে করেন রেকর্ড ২৮০ গোল। কিন্তু ট্রফির ভাঁড়ার ছিল শূন্য। অবশেষে ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে (Bayern Munich) গিয়েই ঘোরে ভাগ্যের চাকা। ৬৫ ম্যাচে ৭৩টি গোল করে জেতান বুন্দেসলিগা ও ডিএফবি পোকাল। আর ইংল্যান্ডকে (England National Team) এনে দেন বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদক।
খাঁটি 'নাইন' থেকে নিখুঁত 'টেন'
কেনের এই ব্যালন জয় শুধু গোলের পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা অসম্ভব। এ এক ফুটবলারের নিজেকে ভেঙে আবার গড়ে নেওয়ার কাহিনি। শুরুতে কেন ছিলেন একজন পুরোদস্তুর নম্বর নাইন। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে দশ নম্বর পজিশনেও মানিয়ে নেন। শুধু গোল করা নয়, নিচ থেকে বল ধরে নিখুঁত পাসে খেলা তৈরি করাতেও তিনি আজ অনবদ্য। জোসে মোরিনহোর কোচিংয়ে টটেনহ্যামে যার শুরু, বায়ার্নে এসে তা পূর্ণতা পেয়েছে। মাঝমাঠ থেকে তাঁর বাড়ানো একটা নিখুঁত থ্রু-পাস দেখতে অনেকটা গলফ কোর্সের পারফেক্ট পুটের মতো লাগে। গ্যালারি শুধু মুগ্ধ হয়ে দ্যাখে জ্যামিতিক হিসেবনিকেশ!
বড় ম্যাচের নায়ক ও অবিশ্বাস্য সব গোল
সাধারণ ট্যাপ-ইন বা পেনাল্টি নয়, কেন এমন কিছু গোল করেছেন, যা চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। শটে কোনও ব্যাক-লিফট থাকে না। ভারসাম্য হারালেও নিখুঁত নিশানায় বল জালে জড়াতে পারেন তিনি। ২০১৫-১৬ মরশুমে নাকে মাস্ক পরে আর্সেনালের (Arsenal) বিরুদ্ধে সেই অবিশ্বাস্য গোল কিংবা ২০১৮ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে স্নায়ুর চাপ ধরে রাখা। আবার ২০১৯ সালে লেস্টারের বিরুদ্ধে শুয়ে পড়ে গোল করা, কিংবা এবারের বিশ্বকাপেও (FIFA World Cup) ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে রকেটগতির গোলটি ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে সতত সজীব থাকবে।
একসময় যাকে বাতিল করেছিল আর্সেনাল, আজ সেই ছেলেই প্রমাণ করে দিল, পরিশ্রম আর জেদের কাছে হার মানে সব সমালোচনা। লন্ডন প্যালেডিয়ামের মঞ্চে ব্যালন ডি'অর হাতে কেনের নীরব মুহূর্ত যেন আজ গোটা বিশ্বকে নিঃশব্দে বলে দিচ্ছ—আর্সেনালের সেই বাতিল ছেলেটাই আজ দুনিয়ার সেরা!
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0