প্রিমিয়ার লিগেও 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল'! বাঘা বাঘা টিমকে ফাঁদে ফেলছে এই ৩ ক্লাব
প্রচুর টাকা নেই, তবু তথাকথিত 'বিগ সিক্স'-এর রাতের ঘুম কাড়ছে ব্রাইটন, ব্রেন্টফোর্ড এবং বোর্নমাউথ। প্রিমিয়ার লিগের এই নতুন 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল'-এর নেপথ্য রহস্য কী?
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মানেই তথাকথিত 'বিগ সিক্স'-এর একচ্ছত্র দাপট—ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি এবং টটেনহ্যাম। কিন্তু সেই চেনা ছকে এবার বড়সড় চিড় ধরিয়েছে তিনটি মাঝারি সারির দল—ব্রাইটন, ব্রেন্টফোর্ড এবং বোর্নমুথ। বিশ্বফুটবলের তাবড় পণ্ডিতরা এই তিন ক্লাবকে মিলিয়ে ডাকছেন প্রিমিয়ার লিগের নতুন 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল'। যেখানে পা রাখলেই নাকি খেই হারিয়ে ফেলছে লিগের ধনকুবের ক্লাবগুলো! কাঁড়ি কাঁড়ি বাজেট বা বিশ্বমানের তারকা ছাড়াই এই তিন দল যেভাবে বড় বড় টিমের থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে নিচ্ছে, তা আক্ষরিক অর্থে চমকপ্রদ।
দৈত্যদের চোখে চোখ রেখে লড়াই
তারকারা ক্লাব ছাড়েন, ডাগআউটে কোচ বদল হয়, কিন্তু মাঠের ফুটবলে এই ত্রয়ীর ধারাবাহিকতায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। ২০১৭ সালে প্রিমিয়ার লিগে ফেরার পর ব্রাইটন আর কখনও অবনমনের মুখে পড়েনি, উলটে দু'বার ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০২১ সালে উঠে আসা ব্রেন্টফোর্ডও লিগে নিজেদের জমি শক্ত করেছে দ্রুত। আর গত মরসুমে ষষ্ঠ স্থানে শেষ করে ইউরোপা লিগের টিকিট কেটে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে বোর্নমুথ।
দেখা গিয়েছে, বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে নামলেই এদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। ২০২২-২৩ সিজন থেকে হিসেব কষলে দেখা যাবে, বিগ সিক্সের বিরুদ্ধে ৫০টি ম্যাচ খেলে ব্রাইটন একাই তুলে নিয়েছে ৬৯ পয়েন্ট! ব্রেন্টফোর্ডের ঝুলিতে ৪৯ পয়েন্ট এবং বোর্নমুথ ৪৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ, তথাকথিত বড় ম্যাচগুলোতে এরা স্রেফ প্রতিরোধ গড়ে ক্ষান্ত থাকে না, রীতিমতো চোখে চোখ রেখে লড়াই করে।
কম দামে কেনা, চড়া দামে বিক্রি: সাফল্যের নিখুঁত চক্র
এই তিন ক্লাবের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তাদের দলবদলের কৌশলে। বড় দলের মতো 'তৈরি সুপারস্টার' কেনার আর্থিক ক্ষমতা এদের নেই। তাই এরা খুঁজে বের করে এমন সব আনকোরা প্রতিভা, যাদের বাজারমূল্য কম হলেও সম্ভাবনা আকাশছোঁয়া।
২০২৫-২৬ মরসুমের আগেই তিন ক্লাব ফুটবলার বিক্রি করে ঘরে তুলেছে মোট ৪৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড। খেলোয়াড় বিক্রিকে এরা ক্ষতি হিসেবে দেখে না, বরং তাদের বিজনেস মডেলের স্বাভাবিক অংশ মনে করে। সস্তায় তুলে আনা, পরিচর্যা করে তারকা বানানো, চড়া দামে বিগ সিক্সের কাছে বিক্রি করা এবং সেই লভ্যাংশ অ্যাকাডেমি ও ক্লাবের পরিকাঠামোয় নতুন করে ঢালা—এই হল মোদ্দা ছক।
যেমন, আন্তোইন সেমেনিও ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার অনেক আগেই তাঁর বিকল্প হিসেবে একজনকে চিহ্নিত করে রেখেছিল বোর্নমুথ। ক্রিশ্চিয়ান নরগার্ড দল ছাড়তেই ব্রেন্টফোর্ড অভিজ্ঞ জর্ডান হেন্ডারসনকে ড্রেসিংরুমে নিয়ে এসেছে শুধু পজিশন ভরাট করতে নয়, নেতৃত্বের অভাব ঢাকতে। ফলে দলের মূল ফুটবলার চলে গেলেও তারা কখনও দিকভ্রান্ত হয় না।
ডেটা ও মানুষের চোখের যুগলবন্দি
আধুনিক ফুটবলে অ্যালগরিদম আর ডেটা অ্যানালিসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তিন দল স্রেফ কম্পিউটারে অন্ধ ভরসা রাখে না। ব্রেন্টফোর্ডের মালিক ম্যাথু বেনহ্যামের কথায়, অনেক সময়ই ডেটার প্রাথমিক ফলাফলের চেয়ে অভিজ্ঞ স্কাউটদের চোখকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্রায়ান এমবুয়েমোর উত্থানই তার বড় প্রমাণ।
আবার ব্রাইটন গড়ে তুলেছে নিজস্ব গ্লোবাল অ্যানালিসিস নেটওয়ার্ক। আর বোর্নমুথের মালিক বিল ফোলি একাধিক ক্লাবের মালিকানা মডেল কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন প্রতিভার সন্ধানে জাল বিছিয়েছেন।
ব্যক্তি নয়, আসল নায়ক সিস্টেম
ডাগআউটের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতাও শক্তির বড় জায়গা। ব্রেন্টফোর্ডে ডিন স্মিথের জায়গা টমাস ফ্রাঙ্ক নেওয়ার পর, কিংবা ফ্রাঙ্কের পর কিথ অ্যান্ড্রুজ আসলেও ক্লাবের খেলার ধরনে কোনও বদল আসেনি। গ্রাহাম পটার এবং রবার্তো ডি জার্বিকে হারানোর পর এতটুকু ভেঙে পড়েনি ব্রাইটনও!
এটাই অন্য মধ্যমসারির দলগুলোর সঙ্গে এই ত্রয়ীর মৌলিক ফারাক। তারা কোনও একজন তারকা কোচ বা একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের উপর ভিত্তি করে সাফল্য খোঁজেনি। বরং, এমন এক স্বয়ংক্রিয় পরিকাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ বদলালেও সিস্টেম একাই কাজ করে যায়!
আজকাল সওয়াল এটা নয় যে ব্রাইটন, ব্রেন্টফোর্ড বা বোর্নমুথ প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকতে পারবে কি না। বরং, বড় প্রশ্ন হল, এই নিখুঁত মডেল তাদের কত দূর নিয়ে যাবে? আর ইংলিশ ফুটবলের মহারথীরা কবে এই মায়াবী 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল'-এর রহস্য ভেদ করতে পারবে?
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)