মমতার সঙ্গে এক জিপে সওয়ার বেবি! ‘ইন্ডিয়া’ বনাম বাংলা, ‘ভোট চুরি’র শাঁখের করাতে সিপিএম

পাল্টা জবাব দিতে নেমেছেন বামেরাও। তবে সমাজমাধ্যমের এই চাপানউতোরের বাইরে সিপিএমের প্রথম সারির একাধিক নেতা একান্ত আলোচনায় মানছেন, সর্বভারতীয় রাজনীতির এমন ছবি বাংলায় দলের পুরনো আখ্যানকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

Nov 04, 2026 - 18:39
মমতার সঙ্গে এক জিপে সওয়ার বেবি! ‘ইন্ডিয়া’ বনাম বাংলা, ‘ভোট চুরি’র শাঁখের করাতে সিপিএম

শ্যাম রাখি না কূল! দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী ঐক্য, বাংলায় তৃণমূল-বিরোধিতার দায়। রামলীলা ময়দানের একটি ছবিই সিপিএমের সেই দ্বন্দ্ব ফের সামনে এনে দিল।

‘ভোটচুরি’র অভিযোগে সর্বভারতীয় আন্দোলন তীব্র করতে চাইছে বিরোধীরা। অথচ সেই আন্দোলনের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবির এক ফ্রেমে থাকা বাংলার সিপিএমকে বিড়ম্বনায় ফেলে দিল। ছবিটি নিয়ে বিজেপি প্রচারে নামতেই পাল্টা মমতার পুরনো বিজেপি-সখ্য মনে করাতে হচ্ছে সুজন চক্রবর্তীদের। জাতীয় রাজনীতির প্রয়োজন আর রাজ্য রাজনীতির বাধ্যবাধকতার মাঝে ফের আটকে আলিমুদ্দিন।

রবিবার বিরোধী নেতাদের যাতায়াতের জন্য রামলীলায় আনা হয়েছিল একাধিক হুডখোলা জিপ। একটিতে ছিলেন মমতা ও বেবি। মাঝে অখিলেশ যাদব। একই গাড়িতে ছিলেন রাহুল গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডি রাজা, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সঞ্জয় রাউতরাও। কিন্তু বিজেপি বেছে নিয়েছে মমতা-বেবির ফ্রেমটুকুই। অগ্নিমিত্রা পাল-সহ দলের নেতারা সেই ছবি দেখিয়ে তৃণমূল-সিপিএম সখ্যের অভিযোগ তুলছেন।

পাল্টা জবাব দিতে নেমেছেন বামেরাও। তবে সমাজমাধ্যমের এই চাপানউতোরের বাইরে সিপিএমের প্রথম সারির একাধিক নেতা একান্ত আলোচনায় মানছেন, সর্বভারতীয় রাজনীতির এমন ছবি বাংলায় দলের পুরনো আখ্যানকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

গত দেড় দশকে রাজ্য সিপিএমের রাজনীতির বড় অংশ জুড়ে তৃণমূল-বিরোধিতা। তার সঙ্গে গত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে তৃণমূল-বিজেপি বোঝাপড়ার তত্ত্ব। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে দুই দলকে এক বন্ধনীতে ফেলতে ‘বিজেমূল’ শব্দবন্ধও ব্যবহার করেছিল সিপিএম। ভোটের পরে তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র প্রকাশ্যেই বলেন, বিজেপির সঙ্গে অন্য কোনও দলকে এক করে দেখা ঠিক হয়নি। শব্দটি ক্রমে সরলেও ‘দুই ফুলের বোঝাপড়া’র অভিযোগ থেকে রাজ্য নেতৃত্ব সরে আসেননি।

সেই কারণেই মমতার সঙ্গে বেবির এক গাড়িতে থাকা নিছক একটি ছবি হয়ে থাকছে না। বিজেপি প্রশ্ন তুলছে, বোঝাপড়া তা হলে কার সঙ্গে কার? আর সিপিএমকে বোঝাতে হচ্ছে, জাতীয় স্তরে এক মঞ্চে থাকা মানেই রাজ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা নয়। 

মঙ্গলবার সকালে বেবি এবং মমতার কানে কানে কথা বলার ছবি ট্যুইট করে স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে কটাক্ষ করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে, যিনি একসময় সিপিএমেরও নেতা ছিলেন। পোস্টে জঁ পল সঁত্রের একটি উদ্ধৃতিও উল্লেখ করেছেন ঋতব্রত। যার অর্থ, যে মন বিপথে থাকতেই আমোদিত হয়, তাকে পথে আনা যায় না। 

ভোটচুরি ব্যুমেরাং
‘ভোটচুরি’র আন্দোলনেও একই অস্বস্তি। এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের সঙ্গে সিপিএম-ও সরব। কিন্তু বাংলার নির্বাচনী ফলকে প্রশ্নের মুখে ফেললে তার রাজনৈতিক সুবিধা তৃণমূলও পাবে। কারণ, তখন একইসঙ্গে এ-ও বলে দেওয়া হবে, তৃণমূলের হারও অবৈধ। অর্থাৎ, সত্যি সত্যি তৃণমূল হারেনি। হারানো হয়েছে। তৃণমূল সেটাই বলছে। 

অবশ্য নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তোলা আর কোনও দলের জয় বা পরাজয় অবৈধ বলে দেওয়া এক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রচারে সেই সূক্ষ্ম ফারাক কতটা টিকবে, সংশয় সেখানেই। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তৃণমূলের বক্তব্যকে শক্তি জোগানো রাজ্য সিপিএমের পক্ষে অস্বস্তিকর। আবার বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে দূরে থাকাও দলের ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।

বুকস্টল-বন্ধু
সম্প্রতি বাংলার কয়েকটি ঘটনাও এই আলোচনায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। যাদবপুরে বামেদের বুকস্টল ঘিরে পুলিশি তৎপরতার পরদিনই এইট-বি বাসস্ট্যান্ডে সিপিএমের স্টলে যান তৃণমূলের কুণাল ঘোষ। চোরবাগানের ঘটনার প্রতিবাদে একই সময়ে গিরিশ পার্ক থানার সামনে জমায়েত করে বাম, কংগ্রেস ও তৃণমূল। আবার বেহালায় তৃণমূলের সভায় বিজেপির বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠলে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন সিপিএম নেতা কৌস্তভ চট্টোপাধ্যায়।

ঘটনাগুলি কোনও আনুষ্ঠানিক সমঝোতার প্রমাণ নয়। তবে তার পরেই মমতা-বেবির ছবি সামনে আসায় দলের নিচুতলায় প্রশ্ন বেড়েছে। সুজনদের পাল্টা প্রচারে সেই প্রশ্ন সামলানোর তাগিদও রয়েছে।

পুরনো কাসুন্দি
সিপিএমের ইতিহাসে অবশ্য পুরনো শত্রুর সঙ্গে বোঝাপড়া নতুন নয়। একসময়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘আধাফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস’-এর অভিযোগই ছিল বাম প্রচারের পরিচিত ভাষা। কংগ্রেস পাল্টা বলত ‘লাল সন্ত্রাস’-এর কথা। সেই অতীত সরিয়েই ২০১৬ সালে দুই দলের নির্বাচনী বোঝাপড়া হয়েছিল।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ২০১১ সালে বাম সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তৃণমূল-কংগ্রেস জোট। পাঁচ বছর পর সেই কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেই পার্ক সার্কাসের মঞ্চে উঠেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রাজনৈতিক প্রয়োজন যে পুরনো বিরোধের সীমা পেরোতে পারে, সিপিএম নিজেই তা দেখিয়েছে।

কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার সেই যুক্তি তৃণমূলের ক্ষেত্রে নিচুতলাকে এখনই বোঝানো সহজ নয়। স্থানীয় সংঘাত, ক্ষমতা হারানোর স্মৃতি এবং দীর্ঘদিনের প্রচার এখনও টাটকা। দিল্লিতে যে ছবি বিরোধী ঐক্যের প্রতীক, বাংলায় সেটিই সিপিএমের কাছে ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়। আপাতত সেই শাঁখের করাতেই আলিমুদ্দিন।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0