স্মিতাই কি নতুন শিবপ্রসাদ? কলকাতা পুরভোটের ভবিষ্যৎ কী, আবারও সেই ১৯৭২ থেকে ’৮৫-র ছায়া!
ভোটের বিজ্ঞপ্তিতে আদালতের বাধা। এর মধ্যেই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর। পরিষেবা চালানোর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, না কি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক জমি তৈরির সুযোগ? কলকাতা পুরসভার বর্তমানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে অতীতের কিছু ছবি।
ভোটের দিন ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল কলকাতা। সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে যখন শত জল্পনা, তখন হঠাই সামনে এল এক নয়া ব্যবস্থা—ওয়ার্ড পিছু কো-অর্ডিনেটর (co-ordinator) তথা সমন্বয়ক নিয়োগের ঘোষণা। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ছোট লালবাড়ির ফাইলের ধুলো সরিয়ে উঠে এল অর্ধশতাব্দী আগের এক বিস্মৃত নাম—শিবপ্রসাদ সমাদ্দার।
প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে (Smita Pandey) কি শিবপ্রসাদের মতই এক চরিত্র হয়ে উঠতে চলেছেন? নির্বাচিত বোর্ডের অপেক্ষা কি আরও দীর্ঘ হবে? এখনই তার উত্তর দেওয়ার উপায় নেই। তবে আদালতের নির্দেশ এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সাম্প্রতিক ঘোষণা মিলিয়ে পুরভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে নতুন আলোচনার দরজা খুলে গিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোট (Kolkata Municipal Election 2026) ঘোষণা হতে পারে বলে যে জল্পনা চলছিল, শুক্রবার তাতে ধাক্কা দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়ে মামলার নিষ্পত্তির আগে কলকাতা পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যাবে না বলে অন্তর্বর্তীনির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। মামলার প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে প্রশাসকের ক্ষমতা এবং ওয়ার্ডসংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়ার বৈধতাও।
এর মধ্যেই শুক্রবার সন্ধ্যায় বর্তমান পুরপ্রশাসক স্মিতাকে পাশে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩০ নভেম্বরের পরে প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ করা হবে। তাঁদের ভূমিকা হবে কাউন্সিলরের মতো।
এই ঘোষণাতেই আলোচনার মোড় ঘুরেছে। কারণ, ভোট পিছিয়ে থাকলেও ওয়ার্ডে রাজনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করার একটি রাস্তা খুলে যাচ্ছে। তবে তাঁদের নিয়োগের পদ্ধতি, ক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামো কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, যা হবে আইন মেনেই হবে। এবং যাঁরা ডিলিমিটেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালতে গেছেন, তাঁরা ‘দেখবেন ও জ্বলবেন, লুচির মতো ফুলবেন।’
ভোটের আগে ওয়ার্ড সামলানোর পরীক্ষা?
তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্যেও যেন প্রচ্ছন্ন উচ্ছ্বাস ছিল। আদালতের নির্দেশে স্থগিতাদেশ নিয়ে হতাশার লেশমাত্রও দেখা যায়নি। যা দেখে পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, রাজনৈতিক দিক থেকে এই বন্দোবস্ত আসলে শাসক দলের জন্য একাধিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
পুরভোটে প্রার্থী হতে আগ্রহীদের ভিড় সামাল দিতে এখন নাজেহাল বিজেপি। প্রার্থী হতে চেয়ে ড্রপ বক্সেই পড়েছে ৪ হাজার আবেদন। দলের পুরনো কর্মীদের পাশাপাশি পালাবদলের পরে সামনে আসা নতুন মুখরাও দাবিদার। আবার তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশের বিজেপিতে যোগ দিয়ে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও জল্পনা রয়েছে। কাকে নেওয়া হবে, কাকে প্রার্থী করা হবে—এই দুই প্রশ্নেই দলের ভিতরে টানাপড়েনেরও অন্ত নেই।
কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ সেই চাপ কিছুটা সামলানোর সুযোগ দিতে পারে। ভোটের আগে ওয়ার্ডের কাজে নামিয়ে দেখা যাবে, কে কে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছেন, কে পরিষেবার সমস্যা বুঝছেন, কার সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা। যাঁরা পাশ করবেন, ভোট হলে তাঁদের প্রার্থী করা হবে, ফেল করলে অন্য প্রার্থী বাছবে দল।
একই সঙ্গে টিকিটের প্রতিযোগিতার তাৎক্ষণিক চাপও কিছুটা কমবে। অন্য দল থেকে অভিজ্ঞ কাউন্সিলর আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যে বিতর্ক, সেটিকেও আপাতত সরিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
ছোট লালবাড়ির পুরনো অধ্যায়
এই পরিস্থিতিতেই পুর প্রশাসক স্মিতাকে ঘিরে আলোচনা আরও ইন্ধন পেয়েছে। তিনিও এখন জল্পনার ভরকেন্দ্রে। কেন, তা বুঝতে গেলে ফিরে যেতে হবে ৫৪ বছর আগে। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কলকাতার পুরবোর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে কলকাতা পুরসভার মেয়র ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের শ্যামসুন্দর গুপ্ত। পুরসভায় বামেদেরই প্রভাব ছিল বেশি। কিন্তু মহাকরণ থেকে ছোট লাল বাড়ি উপর প্রভাব বিস্তার করতে বোর্ড ভেঙে আইএএস অফিসার শিবপ্রসাদ সমাদ্দারকে পুর প্রশাসক করে দেন সিদ্ধার্থবাবু।
তার পরে টানা ১৩ বছর প্রশাসকদের মাধ্যমে চলে কলকাতার পুরশাসন। নির্বাচিত বোর্ড ফিরে আসে ১৯৮৫ সালে। অর্থাৎ এই দীর্ঘ বিরতি শুধু কংগ্রেস জমানাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরেও আরও কয়েক বছর প্রশাসক-পর্ব চলেছিল।
কলকাতার তৎকালীন পুর প্রশাসক শিবপ্রসাদ ছিলেন কঠোর সংস্কারপন্থী। কলকাতা নিয়ে তাঁর অনেক বইও রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম, ‘ক্যালকাটা ইজ’ (Calcutta Is)। শহরের ফুটপাত, হকার এবং পুর প্রশাসনের কাজকর্ম নিয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে গবেষণাতেও। নিউ মার্কেটের সামনে একটি দোকান সরানো নিয়ে বিরোধ এবং পরে ঘটনাস্থলে তাঁর সত্যাগ্রহে বসার ঘটনাও সেই ইতিহাসের অংশ। ফলে শিবপ্রসাদের নাম শুধু একজন আমলার পরিচয়ে আটকে নেই, পুর প্রশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপের একটি ধরনও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডেও কড়া প্রকৃতিরই প্রশাসক।
এই দীর্ঘ প্রশাসক-পর্বে পুরশাসনের আইনি কাঠামোও বদলেছে। ১৯৮০ সালে নতুন আইন কার্যকর হয় ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে। বামেদের পরিকল্পনা ছিল, ৮১-৮২ সালে ভোট করে দেওয়ার। কিন্তু ১৮ বছর বয়সীদের ভোটাধিকারের বিষয়ে একটা মামলা চলছিল। তাই ভোট পিছিয়ে যায়। তার পর ভোট হয় ’৮৫ সালে। সে বছর ৩০ জুলাই নতুন পুরবোর্ড গঠিত হয়।
ইতিহাসের মিল কোথায়, অমিলই বা কতটা
১৯৭২ থেকে ’৮৫— টানা এই ১৩ বছর ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে একজন করে কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ করা হয়েছিল। যার পোশাকি নাম ছিল ‘নমিনেটেড কাউন্সিলর’। অতীতের প্রশাসক-পর্বে ওয়ার্ডস্তরে নমিনেটেড কাউন্সিলর তথা মনোনীত প্রতিনিধির বন্দোবস্তের স্মৃতিই বর্তমান কো-অর্ডিনেটর ঘোষণাকে ঘিরে আলোচনাকে উস্কে দিচ্ছে। ভোটের মাধ্যমে উঠে আসা প্রতিনিধি নেই, অথচ নাগরিকের দৈনন্দিন সমস্যার জন্য ওয়ার্ডে যোগাযোগের একটি মুখ প্রয়োজন—মেলালেন এখানেই শুভেন্দু মেলালেন।
এবং সেই যোগাযোগের মুখ যদি শাসক দলের বেছে দেওয়া ব্যক্তি হন, তা হলে পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হয়। নির্বাচিত কাউন্সিলরকে ভোটারের কাছে ফিরে যেতে হয়। মনোনীত প্রতিনিধির জবাবদিহি কার কাছে থাকবে—সেই প্রশ্ন তাই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে স্মিতার সামনে আপাতত দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। নির্বাচিত বোর্ডের অনুপস্থিতিতে শহরের পরিষেবা সচল রাখা এবং আদালতে বিচারাধীন পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রশাসন চালানো। তাঁর পাশে নতুন কো-অর্ডিনেটররা এলে কাজের গতি বাড়বে, না কি ক্ষমতার আরও একটি স্তর তৈরি হবে, সেটাও দেখার।
কলকাতা তাই এখন শুধু ভোটের তারিখের অপেক্ষায় নেই। অপেক্ষা করছে একটি ব্যবস্থার মেয়াদ জানারও। কো-অর্ডিনেটররা কি নির্বাচিত বোর্ড ফেরার আগের সাময়িক সেতু হবেন? না কি সেই অন্তর্বর্তী পথই দীর্ঘ হতে থাকবে?
স্মিতা নতুন শিবপ্রসাদ হয়ে উঠবেন কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সেটাই—ছোট লালবাড়িতে ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ফিরবেন কবে?
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0