পূর্ণিমার দেবী লক্ষ্মীর পুজো অমাবস্যায় কেন? কালীপুজোর রাতের আদি লক্ষ্মী পুজোর অন্য কাহিনি

কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপুজো বাঙালির চেনা উৎসব। কিন্তু কালীপুজোর রাতেও বহু বাড়িতে হয় ধনদেবীর আরাধনা। কোথাও তার আগে কুলো বাজিয়ে বিদায় জানানো হয় অলক্ষ্মীকে (Alskshmi Biday)। এই রীতির পিছনে রয়েছে পুরাণ, লোকবিশ্বাস ও গৃহস্থের মঙ্গলকামনা।

Nov 07, 2026 - 16:19
পূর্ণিমার দেবী লক্ষ্মীর পুজো অমাবস্যায় কেন? কালীপুজোর রাতের আদি লক্ষ্মী পুজোর অন্য কাহিনি

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধূপের গন্ধ, প্রদীপের আলো আর লক্ষ্মীর পাঁচালি—বাংলার বহু সংসারের পরিচিত ছবি। পাঁচালির শুরুতেই আসে নির্মল পূর্ণিমার রাত, মৃদুমন্দ বাতাস এবং লক্ষ্মী-নারায়ণের সুখের আলাপ। দুর্গাপুজোর পরেও কোজাগরী পূর্ণিমায় ঘরে ঘরে লক্ষ্মীর আসন পাতা হয়। তা হলে কার্তিকের অমাবস্যায় আবার লক্ষ্মীপুজো কেন? যে রাতে বাংলায় মা কালীর আরাধনা, সেই রাতেই ধনদেবীকে বরণ করার রীতি এল কোথা থেকে?

এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে লক্ষ্মীপুজোর বিভিন্ন ধারায়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো এবং দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজা (Dipanwita Lakshmi puja 2026) আলাদা উপলক্ষের আরাধনা। পূর্ণিমাতেই কেবল লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়, এমন কোনও একক রীতি সব অঞ্চলে অনুসরণ করা হয় না। বাংলায় যেমন কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, তেমনই দেশের বহু জায়গায় দীপাবলির প্রধান আয়োজন লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। বাংলার অনেক পরিবারেও কালীপুজোর রাতে দীপান্বিতা লক্ষ্মীর আরাধনা চলে।

লক্ষ্মী মানে শুধু টাকাপয়সা নয়

পৌরাণিক কাহিনিতে সমুদ্রমন্থনের সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের যোগ রয়েছে। দেবতা ও অসুরের ক্ষীরসমুদ্র মন্থনের সময়ে তাঁর প্রকাশ ঘটে বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
তবে লক্ষ্মীকে কেবল সোনা, টাকা বা সম্পত্তির দেবী হিসেবে দেখলে তাঁর ধারণাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অষ্টলক্ষ্মীর উপাসনায় সমৃদ্ধির নানা দিককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধনসম্পদের পাশাপাশি শস্য, জ্ঞান, সাহস, সন্তান ও সাফল্যও সেই ভাবনার অংশ।
গৃহস্থের কাছে তাই লক্ষ্মীর আশীর্বাদ মানে শুধু সিন্দুক ভরে ওঠা নয়। ঘরে অন্ন থাকা, পরিবারের মঙ্গল, সন্তানের উন্নতি এবং শান্তিতে জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষাও তাঁর আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

অমাবস্যার অন্ধকারে সমৃদ্ধিকে আহ্বান

দীপাবলির রাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মীকে বরণ করার মধ্যে আলো ও মঙ্গলের একটি সহজ প্রতীক রয়েছে। অন্ধকার দূর হোক, অভাব কাটুক, সংসারে ফিরে আসুক স্বস্তি—এই কামনাই পুজোর কেন্দ্রবিন্দু।

বিভিন্ন উপাসনাধারায় দেবীর রূপ ও আচার আলাদা হতে পারে। কোথাও মহালক্ষ্মীর পুজো হয়, কোথাও লক্ষ্মীর সঙ্গে গণেশের আরাধনা করা হয়। বাংলার কোনও কোনও পরিবারে আবার এই পুজোর আগে রয়েছে অলক্ষ্মী বিদায়ের প্রথা।

লক্ষ্মীকে বরণের আগে অলক্ষ্মী বিদায়

লোকবিশ্বাসে অলক্ষ্মী অভাব, অশান্তি, কলহ ও অমঙ্গলের প্রতীক। সংসারে লক্ষ্মীকে আহ্বান করার আগে সেই অমঙ্গলকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ভাবনা থেকেই অলক্ষ্মী বিদায়ের আচার।

বাংলার কিছু অঞ্চলে গোবর দিয়ে অলক্ষ্মীর প্রতীকী মূর্তি তৈরি করা হয়। কোথাও চোখের জায়গায় কড়ি বসানো হয়, কোথাও ব্যবহার করা হয় কলার খোল। মূর্তিটি ঘরের ভিতরে না এনে উঠোনের এক পাশে রেখে আচার পালনের রীতিও রয়েছে।

এর পরে কুলো বাজিয়ে অলক্ষ্মীকে বিদায় জানান পরিবারের মহিলারা। মুখে মুখে উচ্চারিত হয় পরিচিত আহ্বান—অলক্ষ্মী দূরে যাক, লক্ষ্মী ঘরে আসুন। কোথাও বাড়ির বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে প্রতীকী বিসর্জন দেওয়া হয়। তার পরে ঘরে ফিরে শুরু হয় লক্ষ্মীর পুজো।

তবে এই আচার সর্বত্র এক নয়। অঞ্চল, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী উপকরণ ও পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা যায়। অনেক পরিবারে অলক্ষ্মীর মূর্তি তৈরির চল নেই, অথচ দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজো হয় নিয়ম করেই।

কুলো বাজানোর মধ্যেও সংসারের কথা

অলক্ষ্মী বিদায়ের রীতিকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে তার সামাজিক অর্থটি চোখ এড়িয়ে যায়। ঘর থেকে অমঙ্গল তাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রয়েছে সম্পর্কের তিক্ততা, ঈর্ষা, বিবাদ ও অশান্তি দূর করার ইচ্ছাও।

এই অর্থে লক্ষ্মীকে বরণ মানে সংসারটিকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া। শুধু ঘরের ধুলো ঝাড়া নয়, একসঙ্গে ভাল থাকার সংকল্পও। লোকাচারের প্রতীকী ব্যাখ্যায় তাই পরিচ্ছন্নতা ও সৌহার্দ্য—দু’টিই জায়গা পায়।

দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি কেমন?

সাধারণত পুজোর আগে ঘরদোর পরিষ্কার করে আরাধনার স্থান সাজানো হয়। পরিষ্কার আসন বা চৌকিতে কাপড় পেতে দেবীর ছবি কিংবা প্রতিমা রাখা হয়। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী ঘট স্থাপন, ধান বা চাল, ফুল, ধূপ ও প্রদীপের আয়োজন থাকে।

নৈবেদ্যে দেওয়া হয় ফল, মিষ্টি, নারকেল, পান ও সুপারি। কোথাও আলপনায় আঁকা হয় পদ্ম ও লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্ন। ব্যবসায়ী পরিবারে হিসাবের খাতা বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সামগ্রী রাখার প্রথাও দেখা যায়।

লক্ষ্মীর সঙ্গে গণেশপুজোর চল থাকলে দু’জনেরই আরাধনা করা হয়। শেষে আরতি ও প্রসাদ বিতরণ। তবে প্রতিমা স্নান করানো থেকে উপবাস—সব আচার প্রত্যেক বাড়ির জন্য বাধ্যতামূলক নয়। নিজেদের পারিবারিক বিধি ও পুরোহিতের পরামর্শ মেনেই পুজো করা হয়।

পূর্ণিমার কোজাগরী আর অমাবস্যার দীপান্বিতা—দুই পুজোর আয়োজন আলাদা হলেও প্রার্থনার সুর কাছাকাছি। অভাবের বদলে স্বচ্ছলতা, কলহের বদলে শান্তি, অন্ধকারের বদলে আলো। কালীপুজোর রাতে লক্ষ্মীর প্রদীপও সেই আশাতেই জ্বলে।

কালীপুজোর সময় ও নির্ঘণ্ট (Kali puja 2026 date and time)

রবিবার ২২ কার্তিক শ্রী শ্রী শ্যামা পূজা বা কালীপুজো। ইংরেজি নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ। সেদিন সকাল ১১টা ২৯ মিনিট সময়ে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে।ল অমাবস্যা তিথি শেষ হবে ২৩ কার্তিক, সোমবার। অর্থাৎ ৯ নভেম্বর, সোমবার। সেদিন দুপুর ১২টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত অমাবস্যা তিথি থাকবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0