অন্ত্যমিলে সাজানো খিস্তি ‘স্লোগান’ নয়—এই সহজ সত্যি ময়দানফেরত সমর্থকরা বুঝবেন কবে?

'ফুটবলের মাঠে বন্ধুপক্ষ ও প্রতিপক্ষের মধ্যে কোথায় সীমারেখা?'—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, সেই রেখা সমর্থকরা নিজেরাই টেনে নেন সবচেয়ে ভাল! অশ্লীলতা নয়, শ্লেষ। খিস্তি নয়, ব্যঙ্গ। নোংরামি নয়, নাটকীয়তা। এটাই স্লোগানের আসল স্পিরিট৷

Aug 27, 2026 - 12:03
0 0
অন্ত্যমিলে সাজানো খিস্তি ‘স্লোগান’ নয়—এই সহজ সত্যি ময়দানফেরত সমর্থকরা বুঝবেন কবে?

ডুরান্ড কাপের ফাইনাল জিতে মেট্রোয় ফিরছেন ইস্টবেঙ্গলের একঝাঁক সমর্থক৷ তাঁদের অনেকেই সভ্য। মানে ইংরেজিতে (ক্লাব) মেম্বার। কিন্তু 'ভব্য' অর্থে সভ্য কতখানি—প্রশ্ন থেকে যায়৷।

অনভিপ্রেত এই সংশয়। কিন্তু তাকে খুঁচিয়ে তোলে উচ্ছ্বাসের তোড়ে চিৎকৃত স্লোগান৷ যেখানে প্রতিপক্ষ শিবিরকে বিঁধতে স্রেফ অন্ত্যমিলের ছন্দ নয়, আয়ুধ হয়ে ওঠে ঘোরতর লিঙ্গবিদ্বিষ্ট বয়ান। সে বয়ান ভুলে যায় স্থানকালপাত্রের জ্ঞান৷ শিষ্টাচার ও নৈতিকতার জরুরি পাঠ। কুঁকড়ে থাকা মহিলা সহযাত্রী, যাঁর সঙ্গে এই ফুটবল-আবেগ, এই বেলাগাম স্নায়বিক উচ্ছ্বাসের ন্যূনতম সংযোগ নেই, তিনি না পেরে প্রতিটি স্বর প্রক্ষেপণে আরও প্রাণপনে খোলসে ঢোকার চেষ্টা করেন, মেট্রো কামরার রডে এক হাতের পাঁচটি আঙুল আরও জোরসে চেপে বসে, অন্য হাত ওড়নার প্রান্ত প্রাণান্তকরভাবে মুচড়ে চলে। তবু বিজিত মোহনবাগানকে আরও পদদলিত করতে 'আদা বাটা পোস্ত বাটা'-র পরবর্তী পংক্তির পদান্তিক মিল ঘৃণ্য, নীচ, মধ্যযুগীয় বিশেষণ খুঁজে নেয়।

সভ্য সমর্থক ভুলে যান তাঁরা কোথায় আছেন৷ ভুলে যান 'গণপরিবহন' ব্যক্তিগত কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি নয়৷ ফুটবল খেলা উপভোগ করাটাও, বস্তুত, বাধ্যতামূলক জনমোচ্ছবের আওতায় পড়ে না। বিস্মৃত হন একটি সহজ তত্ত্ব: ময়দানি প্রতিবেশে যা সয়ে যায়, যে স্লোগান পলেটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার না ধেরে উপভোগ্য হয়ে ওঠে, তা বাতানুকূল মেট্রোয় ভিন্ন রুচির সহযাত্রী ও সহনাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও শালীনতায় আঘাত হানতে পারে। আমার আবেগ সমাজের চোখে অশালীন হলেও যেহেতু তা একজন খাঁটি সমর্থকের ক্রোধ-জ্বালা-আবেগের অনুভূতিসঞ্জাত, অতএব তা বিশুদ্ধ এবং তাতে বাকিদের কী এল-গেল দেখার দায় আমার নেই–এই প্রতিযুক্তিটিও ছেঁদো, অমূলক ও গাজোয়ারি বালখিল্য বয়ান ছাড়া আর কিছুই নয়! ময়দানে এগারো জন যোদ্ধার উদ্দীপ্ত পারফরম্যান্স যে 'বীর রসে'র সঞ্চার করেছিল, তার স্থায়ীভাব 'উৎসাহ'৷ কিন্তু সভ্য সমর্থকরা নগ্ন ও বেলাগাম উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে যে স্লোগানের নমুনা মেলে ধরেন (শুধু ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিও-ই নয়, এমন দৃষ্টান্ত আগেও দেখা গিয়েছে, খুব সম্ভবত পরেও দেখা যাবে) তা 'জুগুপ্সা' নামক স্থায়ীভাবে উদ্বোধিত বীভৎস রসের নগ্ন প্রদর্শন।

কিন্তু এটাই কি হওয়া দস্তুর? দল বদলে মোহনবাগানে যাওয়া মিগুয়েলকে নিয়ে বানানো যেত না তির্যক, শ্লেষাত্মক কোনও স্লোগান? বিপক্ষ ক্লাবের ইনভেস্টমেন্টকে নিশানা করে হুল ফোটানো খুব কঠিন? সময়সাপেক্ষ? অশ্লীলতাই কি তবে মোক্ষ? অন্তিম অভিপ্রায়? ছন্দ-শব্দের দ্যুতি গা ঘিনঘিন করে এমন পদসমন্বয় ছাড়া নেহাত অকেজো? নিষ্প্রাণ? স্লোগান কি তবে খিস্তির জাতভাই হয়ে উঠল? কোনও গোত্রভেদ রইল না? বুদ্ধিকে ছাপিয়ে ইতরামি, সৃজনশীলতাকে দমিয়ে নোংরামিই আজকাল কল্কে পাচ্ছে? রুচির বিকার নিয়ে হইহই করে রিলের উদযাপনে গা ভাসানোই কি ট্রফি জেতার চূড়ান্ত সেলিব্রেশন?

নিশ্চয় অন্য ছবিও আছে। যুবভারতীতে 'ভাইকিং রো'-য় মেতে উঠেছেন একদল লাল-হলুদ সমর্থক৷ ফেসবুক পোস্টে সুখপাঠ্য ও মজাদার কথা চালাচালি করেছেন, তর্কে মেতে উঠেছেন দুই শিবিরের অনুরাগীরা। কিন্তু এই সবই কোথাও যেন পিছু হটে। নখদাঁত উঁচিয়ে এগিয়ে আসে সেই একপাল অবিবেচকের হাল্লা বোল!

অথচ ফুটবল মাঠের এই স্লোগান বস্তুটিও যে নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল হতে পারে, তা একটি জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির মৌখিক পরম্পরার শিকড়কে ধরে রাখতে পারে, পাশ্চাত্যের গ্যালারি আমাদের সেই পাঠ দিয়েছে। ওল্ড ট্র‍্যাফোর্ড থেকে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ—হরেক ক্লাব, হরেক ময়দান, হরেক ধাতের সমর্থক৷ অথচ কালাপানির ওপারের গ্যালারিতে লেখা হয়েছে এমন কিছু স্মরণীয় তরজা, গান, ছড়া, বার্তা… যা এককথায় 'স্লোগান কী ও কেন'-র আবশ্যক ও জরুরি বাইবেল!

অ্যাংলো-স্যাক্সন থেকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড—স্লোগানের শিকড় কতটা গভীর?

বিলেতে ফুটবল স্লোগানের মুখরিত ইতিহাস শুধু মাঠে নয়। এর শিকড় মৌখিক কাব্যপরম্পরায়। আজ থেকে হাজার বছর আগে, যখন ইংরেজ সমাজ সাক্ষরতার মুখ দেখেনি, তখনও যোদ্ধারা মুখোমুখি হওয়ার আগে বিনিময় করতেন তরজা। এর নাম 'ফ্লাইটিং'—ছন্দোবদ্ধ গালাগালের প্রতিযোগিতা! 'ব্যাটেল অফ মালডন' কবিতায় ইংরেজ সেনাপতি ব্রিহ্তনথ ভাইকিং দূতের চ্যালেঞ্জে সাড়া দিলেন তীব্র ব্যঙ্গে। বললেন, 'তোমরা অস্ত্র চাও? দেব। তবে বর্শার ফলা হয়ে।' এই শব্দের যুদ্ধই পরে রূপান্তরিত হয়েছে গ্যালারির স্লোগানে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক পিট বয়েল, যিনি এরিক ক্যান্টোনার বিখ্যাত 'এরিক দ্য কিং' গানের রচয়িতা, বলছেন— 'যদি লোকজন যোগ না দেয়, আমি বিব্রত বোধ করি না। নিজেই এগিয়ে যাই।' এটাই স্লোগানের প্রাণ—বুদ্ধির ছটায় প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করা, ভাষার খেলায় নিজেদের ঐক্য জানান দেওয়া।

ব্যান্টারের ব্যাকরণ: যেখানে শ্লেষ, সেখানেই শিল্প

আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে নটিংহাম ফরেস্টের সমর্থকদের কথা। যারা নিউক্যাসলকে ঠেস মেরে চিৎকার ছুড়ে দিয়েছিল, 'চ্যাম্পিয়নস অফ ইউরোপ, ইউ'ল নেভার সিং দ্যাট!' নিউক্যাসল পাল্টা জবাব, 'ইউ ওয়্যারন্ট ইভেন বর্ন!' এই বিনিময়টা অশ্লীল নয়। ইতিহাসের টানে তৈরি, ব্যঙ্গের শানে ধারালো।

কিংবা আর্সেনাল। তাদের সমর্থকরা (football chants creativity) বিপক্ষ দল খারাপ খেললে গান ধরেন—'আর ইউ টটেনহাম ইন ডিসগাইজ?' এতে প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করা হয় ইঙ্গিতে। এবং অনুপস্থিত চিরশত্রু স্পার্সকেও!

আসবে লিভারপুলের কথাও৷ তাদের অনুগামীরা গত বছর প্রয়াত দিয়োগো জোতার স্মৃতিতে গান ধরেন ক্রিডেন্স ক্লিয়ারওয়াটার রিভাইভালের সুরে—প্রতিটি ম্যাচে ২০তম মিনিটে, কারণ জোতার জার্সি নম্বর ছিল ২০। এই স্লোগান স্রেফ উল্লাসপ্রদর্শন না থেকে হয়ে ওঠে যুগপৎ শোক ও ভালোবাসা প্রকাশের অনুপম মাধ্যম।

প্রেমেও গায় গ্যালারি

স্লোগান মানেই কি কেবল কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করা?

মোটেই না। গ্যালারির (Anfield chants) সবচেয়ে স্মরণীয় গানগুলো আসলে ভালোবাসার দলিল। ব্রাজিলীয় ববি ফিরমিনো লিভারপুল ছাড়ার আগে অবধি কপ স্ট্যান্ড গমগম করত তাঁর নামে—'সি সেনর, পাস দ্য বল টু ববি, অ্যান্ড হি'ল স্কোর।' এক সমর্থক তো গাড়ির জানালায় ছুটে গিয়ে বলেই ফেলেছিলেন, 'ববি, আমরা তোমাকে পাগলের মতো ভালবাসি।' গ্রানিত জাকা আর্সেনাল ছেড়ে লেভারকুজেনে গেলেন যেদিন, গ্যালারি গেয়েছিল, 'উই ওয়ান্ট ইউ টু স্টে।' কোচ আর্তেতার নামেও বাঁধা হয়েছে গান। বিদ্বেষ নেই এই সুরে। আছে শুধু তীব্র আনুগত্য।

তাহলে বিলেতের গ্যালারিও কি সবসময় শালীন?

এর জবাব: একেবারেই না। লেখক অ্যান্ড্রু লন 'উই লুজ এভরি উইক' বইয়ে জানিয়েছেন, নরউইচ সিটির 'অন দ্য বল, সিটি' সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীনতম ফুটবল-গান, আজও গাওয়া হয় ক্যারো রোডে। কিন্তু ছয়ের দশকে পপ সুর ধার করে যে বিদ্রুপ তৈরি হতে থাকে, তার ঝাঁজ অনেক সময় বিষে বদলে যায়৷ লিভারপুলের অনুপ্রেরণার সেই গান 'ইউ'ল নেভার ওয়াক অ্যালোন' প্রতিপক্ষের মুখে হয়ে যায় 'ইউ'ল নেভার ওয়াক অ্যাগেন।' সাত-আটের দশকে তো মারামারিই ছিল অনেক সমর্থকদের কাছে ময়দানে যাওয়ার আসল টান, খেলাটা গৌণ।

আজও কিছু গান সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়। নারীবিদ্বেষী, বর্ণবিদ্বেষী কিংবা ট্র্যাজেডি নিয়ে বিদ্রুপ—ব্রিটেনে এসব আইনত দণ্ডনীয়। ২০০৬ সালে নরউইচে যখন এক সিরিয়াল কিলার গোপনে সক্রিয় রয়েছে, মানুষ খুন করে চলেছে, ইপসউইচ ম্যাচে সমর্থকরা তা নিয়েও কুৎসিত গান বেঁধেছিলেন। আজও সে দেশে ‘কিক ইট আউটে’র (Kick It Out campaign) মতো প্রচারাভিযান চলে বছরভর, তবু পুরোপুরি থামে না।

এর সমাধান তবে কী?

মিলওয়াল সমর্থক তথা সমাজবিজ্ঞানী লেস ব্যাকের মতে, আসল প্রতিকার সমর্থকদেরই বিবেক। তাঁর কথায়, 'রেষারেষি জরুরি, রসিকতা জরুরি, ঝাঁজ আর ধারও জরুরি—এগুলোই ফুটবলকে এত রুদ্ধশ্বাস করে তোলে।' একই সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন, 'রসিকতা আর অপমানের মধ্যের বিভাজনরেখাটা সমর্থকরাই সবচেয়ে ভাল চেনেন।' মিলওয়াল, নরউইচ কিংবা গ্লাসগো রেঞ্জার্সে লেস ব্যাক নিজেই দেখেছেন, সমর্থকরা একদিন ঠিক করে দেন—এই গান আর নয়! বাইরে থেকে নিয়ম চাপালে যা হয় না, ভেতর থেকে সবার আড়ালে ঠিক সেই শুভকর বদলটুকু ঠিক ঘটে যায়!

আপাতত মেট্রো কামরায় ফেরা যাক। এখানেও উচ্ছ্বাস থামানোর কথা কেউ বলছে না। উল্লাস চাই, চিৎকার চাই, প্রতিপক্ষকে চিমটিটুকুও দিতে হবে। যুবভারতীর 'ভাইকিং রো' বা ফেসবুকের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যান্টার প্রমাণ করে, বাংলার সমর্থকদের মননে-চিন্তনে এই কাঙ্ক্ষিত ধার এখনও সজীব৷ প্রশ্ন একটাই—হাজার বছরের যে মৌখিক পরম্পরা যোদ্ধাদের তরজা থেকে গ্যালারির গান পর্যন্ত বেঁচে রইল নিছক বুদ্ধির জোরে, তার শেষ পরিণতি কেন খিস্তি-ই? ধার থাকলে খোঁচা বিঁধে যায় গভীরে। শান না থাকলে সেটাই স্রেফ শব্দদূষণ।

ফুটবলে স্লোগানের (Kolkata derby slogan) সংস্কৃতি মৌখিক পরম্পরায় বাঁচে। লেখা থাকে না, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। 'উই লুজ এভরি উইক' বইয়ের লেখক অ্যান্ড্রু লন যেমন বলেছেন— ভিড়ের মধ্যে বেনামিত্ব ও পুরনো উপজাতি-মনোবৃত্তি মানুষকে সংযম খোয়াতে বাধ্য করে। কিন্তু এই বেসামাল হওয়াটাই শেষ কথা নয়। 'ফুটবলের মাঠে বন্ধুপক্ষ ও প্রতিপক্ষের মধ্যে কোথায় সীমারেখা?'—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, সেই রেখা সমর্থকরা নিজেরাই টেনে নেন সবচেয়ে ভাল! অশ্লীলতা নয়, শ্লেষ। খিস্তি নয়, ব্যঙ্গ। নোংরামি নয়, নাটকীয়তা। এটাই স্লোগানের আসল স্পিরিট।

প্রশ্ন একটাই: কলকাতার গ্যালারি এই শিক্ষা নেওয়ার জায়গায় এসে পৌঁছেছে কি? মিগুয়েলের বিরুদ্ধে, মোহনবাগানের কর্পোরেট মডেলের বিরুদ্ধে, একটি তির্যক কিন্তু মেধাবী স্লোগান কি রচনা করা যায় না? ওল্ড ট্র্যাফোর্ড যদি পারে, যুবভারতীরও পারা উচিত।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User