মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় 'পাঞ্চি' বাঁধলেন জনজাতিরা! হুল দিবসে সেই হলদে পাগড়ির গুরুত্ব খুঁজল দ্য ওয়াল
বই-পত্তর ঘাঁটলে ভালই মালুম হয়, যখন কোনও গুণীজন বা জননেতার মাথায় হলুদ গামছা পাগড়ির মতো জড়িয়ে সম্মান জানাতে দেখা যায়, তখন তা শুধু আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা বা ‘লৌকিকতা’য় সীমাবদ্ধ থাকে না; শত শত বছরের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রতীকের জীবন্ত দলিলও হয়ে ওঠে।
শুভম সেনগুপ্ত
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তার নেওটা সুদখোর মহাজন ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে তির-ধনুক হাতে গর্জে উঠেছিল সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবদের অকুতোভয় নেতৃত্ব। আজ সেই ঐতিহাসিক হুল দিবসের (Hul Diwas) অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) মাথায় 'গামছা' বেঁধে দিলেন উদ্যোক্তারা। এখন অনেকের মনেই কৌতূহল জাগতে পারে, এই বস্ত্রের গুরুত্বই বা কী!
বই-পত্তর ঘাঁটলে ভালই মালুম হয়, যখন কোনও গুণীজন বা জননেতার মাথায় হলুদ গামছা পাগড়ির মতো জড়িয়ে সম্মান জানাতে দেখা যায়, তখন তা শুধু আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা বা ‘লৌকিকতা’য় সীমাবদ্ধ থাকে না; শত শত বছরের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রতীকের জীবন্ত দলিলও হয়ে ওঠে।
জনজাতি, বিশেষত সাঁওতাল সমাজে এই বিশেষ শৈলীতে গামছা বা বস্ত্র মাথায় জড়ানোর নেপথ্যে রয়েছে শিকড়-ছোঁয়া ইতিহাস। সেই ইতিহাস ছুঁয়েই তুলে ধরা হল গামছার সালতামামি।
১. জনজাতি সমাজে ‘দহরি’র গুরুত্ব
সাঁওতাল ও অন্যান্য জনজাতি সমাজে মাথায় বাঁধা এই বিশেষ গামছা বা পাগড়িটি চিরাচরিতভাবে ‘দহরি’ (Dahri) নামে পরিচিত। যদিও এ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। অনেকের মতে এর নাম 'পাঞ্চি', যা ভারতের প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায়, বিশেষ করে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী ও স্বকীয় পোশাক। এই পোশাক সাধারণত দুই খণ্ডে বিভক্ত। যার নীচের অংশের পোশাককে বলা হয় পাঞ্চি এবং উপরের অংশের পরিধেয়টিকে বলা হয় পারহান।
সাঁওতাল সংস্কৃতিতে কোনও সম্মানিত অতিথি, গ্রামের প্রধান (‘মাঝি হড়’) কিংবা পরগনাইতকে বরণ করার সময় মাথায় এই দহরি বেঁধে দেওয়াই হল পরম সম্মান প্রদর্শনের রীতি। তাঁদের চিরাচরিত সামাজিক শাসনব্যবস্থায় (যেমন— মাঝি পারগানা ব্যবস্থা) কোনও ব্যক্তিকে যখন কোনও গুরুভার বা সামাজিক নেতৃত্ব অর্পণ করা হয়, তখন সমাজবদ্ধ মানুষের সামনে তাঁর মাথায় এই পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়। এটি ব্যক্তির দায়িত্বশীলতা ও সততার প্রতীক।
২. নৃতত্ত্বের আয়নায় আদিবাসী পোশাক ও গবেষকদের বয়ান
আদিবাসী সমাজের এই বস্ত্রবয়ন ও পরিধান শৈলীকে শুধু মুখের কথা বা লোকগাথায় আটকে না রেখে, দেশী-বিদেশী বহু নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষক তাঁদের আকর গ্রন্থে নথিভুক্ত করেছেন।
পি. ও. বোডিং (P. O. Bodding) – Traditions and Institutions of the Santals বইতে নরওয়েজিয়ান এই গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ দেখিয়েছেন, সাঁওতাল পুরুষদের আত্মমর্যাদার বড় অঙ্গ এই ‘দহরি’। সামাজিক বিচার সভা বা কোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে পুরুষদের মাথায় এটি বাঁধা ছিল বাধ্যতামূলক, যা তাঁদের শালীনতা ও গাম্ভীর্যের পরিচয় বহন করত।
ডব্লিউ. জি. আর্চার (W. G. Archer) – সাঁওতাল পরগনার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার আর্চার খুব কাছ থেকে এই সমাজকে চিনেছিলেন। The Hill of Flutes: Life, Love, and Poetry in Tribal India বইতে তিনি লিখেছেন, সোহরাই বা বাহা পরবের মতো উৎসবগুলিতে পরিধানের বস্ত্রের রঙের ভূমিকা অপরিসীম। এই হলুদ এবং লাল পেড়ে গামছা বা কাপড় হল শুভ, উর্বরতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের নিবিড় সম্পর্কের প্রতীক। যেন অরণ্যের নিজস্ব রঙে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া।
চারুচন্দ্র সান্যাল ও অন্যান্য ইতিহাসবিদদের মতে উত্তরবঙ্গের মেচ, টোটো বা রাজবংশী ও মুন্ডা সমাজেও অতিথিকে উত্তরীয় বা পাগড়ি দিয়ে আপন করে নেওয়ার এক সুন্দর ‘রীতি রেওয়াজ’ রয়েছে। আদিবাসী ভাবনায় হলুদ রঙটি হল সূর্যের আলো এবং নতুন ফসলের আগমনী বার্তার প্রতীক।
৩. হুল বিদ্রোহের আগুন ও প্রতিরোধের প্রতীক
১৮৫৫ সালের ঐতিহাসিক ‘হুল’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহের দিনগুলিতে এই দহরি এক অনন্য রণকৌশল ও একতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ইতিহাস বলছে, মরণপণ যুদ্ধে নামার আগে সাঁওতাল যোদ্ধারা মাথায় এই কাপড় শক্ত করে বেঁধে নিতেন। গবেষক জে. ট্রোইসি তাঁর The Santals: A Socio-Economic Study বইতে লিখেছেন— “সিধু-কানুর ডাকে যখন হাজার হাজার সাঁওতাল তির-ধনুক হাতে জড়ো হতেন, তখন তাঁদের পরনের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং মাথায় বাঁধা ‘দহরি’ তাঁদের বিচ্ছিন্ন জনতা থেকে সুশৃঙ্খল ও অপরাজেয় সেনাবাহিনী করে তুলেছিল।”
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)