আত্মহত্যা, না অন্য কিছু? আশিসের মৃত্যুতে বিজেপির দিকে আঙুল তুললেন কুণাল, ধিক্কার অভিষেকের
রামপুরহাটে প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার। সুইসাইড নোটে অপমানের অভিযোগ। বিজেপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তোপ দেগে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি অভিষেক ও কুণাল ঘোষের।
রামপুরহাটে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক ও বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক চাপানউতর। তাঁর হাতে লেখা বলে দাবি করা এক পাতার চিঠিতে ‘অপমান’ এবং দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখার কথা উঠে এসেছে। সেই সূত্রেই একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তাঁদের বক্তব্য, কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে কাউকে হেনস্থা করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই মৃত্যু তারই উদাহরণ। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
রবিবার সকালে রামপুরহাটে নিজের বাড়ির কাছের দলীয় কার্যালয় থেকে আশিসের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাস্থল থেকে হাতে লেখা একটি চিঠি উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও, পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে।
চিঠিতে উল্লেখ থাকা একাধিক বক্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে। প্রবীণ নেতার কথায় বার বার উঠে এসেছে ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করা এবং কোনওরকম দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকার কথা। চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পাওয়া যায় টিআরডিএ-তে তাঁর ভূমিকার কথা। তিনি সেখানে উল্লেখ করেছেন টিআরডিএ-র সাধারণ সভা ছাড়া তাঁর কোনও দায়িত্ব ছিল না, টেন্ডার কমিটিতে তিনি ছিলেন না, চেক পাওয়ার বা পরিকল্পনা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না। অভিযোগ, তাঁকে ‘ম্যালাইন’ বা অপমান করার জন্য নানা কিছু করা হয়েছে। তাই‘রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছে।’
এখানেই শেষ নয়, প্রবীণ তৃণমূল নেতা ওই চিঠিতে পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে চিঠির বক্তব্য ঘিরে একাধিক বিষয় উঠে আসছে। কোনও অভিযোগ বা রাজনৈতিক চাপ কি তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল? নাকি মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে?
এই মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেনে’র যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, আশিসের শেষ চিঠিতে যে অভিযোগের ইঙ্গিত রয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে অভিষেক লেখেন, 'আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু হৃদয়বিদারক নয়, রাজনীতি ও সাংবাদিকতারও যে সীমারেখা থাকা উচিত, সেই বিষয়ে প্রত্যেককে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর শেষ চিঠিতে দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের যে অভিযোগ রয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কারও বিরুদ্ধে প্রচার চালানো, তাঁর ভাবমূর্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং জনসমক্ষে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়ার রাজনীতির পরিণতি নিয়ে ভাবা দরকার।”
অভিষেক আরও লিখেছেন, “যাঁরা এই অপপ্রচারে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের নিজেদের কথা ও কাজের মানবিক পরিণতি নিয়ে ভাবা উচিত। রাজনৈতিক লড়াই আসবে, যাবে। কিন্তু একটি জীবন চলে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না।”
এদিকে কুণাল ঘোষ এই মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেনস্থার অভিযোগের পাশাপাশি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন নিয়েও সওয়াল করেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে কুণালের বক্তব্য, “বীরভূমে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু। বলা হচ্ছে আত্মহত্যা, সুইসাইড নোটও নাকি পাওয়া গেছে, তবু বলব, ঘটনা অনুসন্ধানসাপেক্ষ। ভাবা যাচ্ছে না। নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”
সরাসরি বিজেপির দিকে আঙুল তুলে বেলেঘাটার বিধায়কের দাবি, “কোনও দোষ প্রমাণের আগে কাউকে অপবাদ, কলঙ্ক, সামাজিক অপদস্থ করার যে প্রবণতা বিজেপি শুরু করেছে, এই ঘটনা তার পরিণাম কি না, সেটাও দেখা উচিত। কিছুদিন আগেই রাস্তায় তাঁকে বিজেপি নেতার অপমান করার যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তাকেও আত্মহত্যায় প্ররোচনার সম্ভাবনার দিক থেকে তদন্ত করা উচিত।”
তবে কুণাল একই সঙ্গে আত্মহত্যার তত্ত্বেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছে পুলিশ-প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আত্মহত্যাই, না কি অন্য রহস্য আছে, তদন্তকারীরা দেখুন। পুলিশ, প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করুক। প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।”
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আশিস ছিলেন তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী। তৃণমূলের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সঙ্গে ছিলেন। পাঁচ বার রামপুরহাটের বিধায়ক হয়েছেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন। ছিলেন ডেপুটি স্পিকার। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও রামপুরহাট থেকে লড়েছিলেন তিনি কিন্তু জয় পাননি। পরে 'ভাল তৃণমূলে' যোগ দেন। তাঁর দলের অনেকে বলছেন, তারপর থেকেই তিনি নাকি মানসিকভাবে ঠিক ছিলেন না।
কী হয়েছে, কীভাবে এই মৃত্যু সবটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)