তৃণমূলে ছিলেন বলেই ‘না’? কলকাতা চালাতে অভিজ্ঞ মুখ কোথায় পাবে বিজেপি
তৃণমূলত্যাগী মুখদের এড়িয়ে কলকাতা পুরসভা পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ প্রার্থী কোথায় পাবে বিজেপি? শমীক-সুকান্তদের নীতি বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
তৃণমূলে (TMC) ছিলেন, অতএব বিজেপিতে জায়গা নেই। কলকাতার পুরভোটের (KMC Poll) আগে শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) ও সুকান্ত মজুমদারের (Sukanta Majumder) অবস্থানের নির্যাস আপাতত এটাই। তৃণমূলের কাউন্সিলরদের বিজেপির টিকিট পাওয়ার জল্পনায় জল ঢালতে চাইছেন শমীক-সুকান্ত অনুগামীরা। কিন্তু এই অবস্থান একটি প্রশ্নও সামনে আনছে—প্রাক্তন দলের পরিচয়ই কি প্রার্থী বাছাইয়ের প্রধান মাপকাঠি হবে, নাকি বিবেচনায় আসবে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, কাজের রেকর্ড এবং পুর প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতাও?
প্রশ্নটি কেবল দলবদল নিয়ে নয়। কলকাতার মতো একটি মহানগর পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েও। নির্বাচনে জেতার আগে সংগঠন এবং জেতার পরে পুরসভা চালানোর দক্ষতা এক জিনিস নয়। প্রথমটির জন্য রাজনৈতিক হাওয়া সহায়ক হতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন পরিষেবা সম্পর্কে ধারণা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং নাগরিকের সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা।
পুর-ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়নি। কিন্তু তাতে জল্পনা থেমে নেই। কলকাতা পুরসভায় আসন পুনর্বিন্যাসের পর এবার ওয়ার্ড সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০৯টি। বিধানসভা ভোটে বিজেপির যা ফলাফল, তাতে পদ্মশিবিরের ছোট লালবাড়ি দখল করা সময়ের অপেক্ষা। কারণ বিরোধী পক্ষ ছন্নছাড়া। এই প্রেক্ষাপটে ভঙ্গুর তৃণমূলের কিছু মুখ বিজেপির একাংশের সঙ্গে ধারাবহিক যোগাযোগ রেখে চলছেন। যা প্রাক্তন তৃণমূলীদের বিজেপির টিকিট পাওয়ার জল্পনায় জল-বাতাস দিয়েছে। শমীক-সুকান্তরা সেই জল্পনা উড়িয়ে দিতে চাইলেও বাস্তব অন্য কথা বলছে। বাস্তব এই যে, জল থেকে জঞ্জাল, নর্দমা থেকে বিল্ডিং, বস্তি থেকে রাস্তার ব্যাপারে সম্যক ধারণা রয়েছে এমন লোক বিজেপিতে হাতে গোনা।
বিজেপির হাতে কী রয়েছে?
কলকাতার রাজনীতি এবং পুরসভার বিষয়ে ধারণা রয়েছে, এমন লোক বিজেপিতে হাতে গোনা। তাপস রায়, সজল ঘোষ, মীনাদেবী পুরোহিত—তারপর নাম খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এখানে এ-ও মনে রাখাতে হবে, তাপসবাবু রাজ্যের মন্ত্রী বা সজল বিধায়ক হলেও তাঁরাও কিন্তু ‘প্রাক্তন তৃণমূল’। শমীক বা সুকান্ত যদিও বলতে পারেন, তাপস-সজলরা বিজেপিতে ‘সম্পৃক্ত’ হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এ বাদ দিয়ে লোক কোথায় পাবেন তাঁরা? ঘটনাচক্রে, এঁদের মধ্যে মীনাদেবী ২০০-২০০৫ পর্যন্ত কলকাতা পুরসভার ডেপুটি মেয়র ছিলেন। যে বোর্ড ছিল তৃণমূল-বিজেপি জোট পরিচালিত। মেয়র ছিলেন অধুনাপ্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ধর্মতলা পার করার পর গড়িয়া বা বেহালা পর্যন্ত বিজেপির কে আছেন যিনি পুর রাজনীতিতে পোড় খাওয়া?
পুর পরিষেবা বোঝেন এমন লোক কিন্তু রাজ্য মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। অর্জুন সিং বাম জমানা থেকে টানা ভাটপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর পুত্র তথা ভাটপাড়ার বিধায়ক পবনও পুরসভার কাজকর্ম বোঝেন। পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বামফ্রন্ট পরিচালিত শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র পারিষদ ছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউ কলকাতার নন। আবার তাঁরা আদি বিজেপি-ও নন।
বাস্তবতার কথাও রয়েছে বিজেপির অন্দরে
শমীক-সুকান্তরা যতই অ্যালার্জির কথা বলুন, বিজেপির অন্য একটি অংশ মনে করে, পুরসভা চালাতে করিৎকর্মা লোক দরকার এবং তা মঙ্গলগ্রহ থেকে আসবে না। বিশেষত সরকারের কাজে যাঁরা প্রতিনিয়ত যুক্ত, তাঁরা অনুধাবন করছেন, পুরসভা সঠিক ভাবে পরিচালিত না-হলে, তার প্রভাব সামগ্রিক ভাবে নবান্নর গায়েও লাগবে। উল্টোদিকে এ-ও সত্য, স্থানীয়স্তরের পরিষেবা মানুষ সঠিক ভাবে পেলে তার সুফল পাবে সরকারও।
শমীকরা তাহলে একথা বলছেন কেন?
তিনি দলের রাজ্য সভাপতি। সাংগঠনিক স্তরে কর্মীদের আবেগ রক্ষা করাও তাঁর কাজ। যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে এত লড়াই করে রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে তৃণমূলের প্রাক্তনীদের জায়গা দিলে দলের কর্মীদের মনোবল ধাক্কা খেতে পারে। তাঁরা মনে করতে পারেন, দুর্দিনে তাঁরা দল করলেন। আর সুদিনে ক্ষীর খেয়ে চলে যাবেন সেই তৃণমূলেরই কিছু লোকজন— এ কেমন ভাবে মেনে নেওয়া যায়!
সেই আবেগের জায়গাটি যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না-হয়, শমীকরা হয়তো সে কারণেই অ্যালার্জির কথা বলছেন। তবে এ-ও ঘটনা যে, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্যসভার চারজন তৃণমূল সাংসদ ইস্তফা দেওয়ার পরে সরাসরি বিজেপির মনোনয়ন পেয়েছেন। সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশচিক বরাইক, সুস্মিতা দেব এবং কোয়েল মল্লিকের সেই মনোনয়নের সময়ে উপস্থিত ছিলেন সেই শমীকই। পুরসভা তো সংসদীয় রাজনীতির একেবারে নিচুতলার ব্যাপার।
তৃণমূলের এই সঙ্কট ছিল না
২০০০ সালে রাজ্যে ভরা বাম জমানায় কলকাতা পুরসভা দখল করেছিল তৃণমূল। আবার বাম জমানার শেষ লগ্নে ২০১০ সালেও কলকাতা দখল করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। কিন্তু মমতার দলের কাছে এই সঙ্কট ছিল না। কারণ, তখন তৃণমূলনেত্রীর হাতে এমন অনেক নেতা ছিলেন, যাঁরা পুর রাজনীতির ব্যাপার গুলে খেয়েছেন। প্রশাসনিক কাজে সুব্রত ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। শোভন চট্টোপাধ্যায়, ববি হাকিমরাও পুরসবার ব্যাপারে পোড় খাওয়া। ফলে পুর প্রশাসন চালাতে তৃণমূলকে হোঁচট খেতে হয়নি।
কিন্তু বিজেপির কাছে তেমন সুযোগ নেই। তা ছাড়া, নতুনদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে যে সময় লাগবে, তারও ফুরসত নেই। কারণ, সরকার মনে করছে, দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তা করতে গেলে দরকার অভিজ্ঞ, পোড় খাওয়া লোক।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0