নতুন ভারত এগিয়ে চলেছে সন্দেহ থেকে বিশ্বাস, ভয় থেকে মুক্তির দিকে
দশকের পর দশক ধরে ভারতের পরিচালন তন্ত্র নাগরিকদের যেন কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেছে। সামান্যতম বিচ্যুতিতেও কিংবা উচ্চপদে আসীন কোনও ব্যক্তির খেয়াল খুশি মতো মানুষকে অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে মোদী সরকার এগিয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতি আস্থা ও সংবেদনশীলতার বিষয়টিকে ভিত্তি করে।
পীযূষ গোয়েল
দশকের পর দশক ধরে ভারতের পরিচালন তন্ত্র নাগরিকদের যেন কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেছে। সামান্যতম বিচ্যুতিতেও কিংবা উচ্চপদে আসীন কোনও ব্যক্তির খেয়াল খুশি মতো মানুষকে অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে মোদী সরকার এগিয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতি আস্থা ও সংবেদনশীলতার বিষয়টিকে ভিত্তি করে।
ভারতের আইনগত চালচিত্রকে নাগরিক ও বাণিজ্য বান্ধব করে তুলতে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বাধ্যবাধকতা মেটানোর কাজ সহজ করা হয়েছে এবং বাস্তব দুনিয়ায় ব্যবসায়ীদের অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করেছে সরকার। বাধ্যবাধকতার বোঝা কমানো, ডিজিটাইজেশন, এক জানালা ব্যবস্থা-এসবই প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও যুক্তিযুক্ত করে তোলার উদ্যোগ।
আস্থা এবং সংবেদনশীলতার ওপর আধারিত যে প্রশাসনিক মন্ত্র প্রধানমন্ত্রী অনুসরণ করছেন তার প্রতিফলন ঘটেছে জনবিশ্বাস আইন ২০২৬ এবং ২০২৩-এর একটি সমধর্মী আইনে।
নাগরিক বান্ধব - নাগরিক বান্ধব নিয়ন্ত্রণ পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে এবং নাগরিকরা স্বেচ্ছায় যাতে আইনী বাধ্যবাধকতা মেটানোয় উদ্যোগী হন তা নিশ্চিত করা সরকারের লক্ষ্য। সেইজন্য নতুন আইনে ছোটখাটো বিচ্যুতিগুলির ক্ষেত্রে অনেক নমনীয় সংস্থান রয়েছে : যেখানে শাস্তি প্রদানের আগে সতর্কীকরণ, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির বিধান, যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একটি সংবেদনশীল প্রণালী গড়ে তুলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ যাতে আরও কার্যকর এবং প্রাসঙ্গিক হয় তা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন ২১ শতকের দাবি মেটাতে গেলে সেকেলে ঔপনিবেশিক জমানার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আঁকড়ে থাকলে চলবে না।
যে গতিতে এই সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়েছে তা অভূতপূর্ব। জনবিশ্বাস আইন ২৩টি মন্ত্রকের ৭৯টি কেন্দ্রীয় আইনের ৭৮৪টি ধারা পরিমার্জন করেছে। ৭১৭টি সংস্থানের ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিধি কার্যকর হওয়া বন্ধ হয়েছে এবং আরও ৬৭টি ধারায় পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জীবনযাপন সহজতর করার লক্ষ্যে।
১,০০০-এর বেশি বিচ্যুতির ক্ষেত্রে সেকেল আইন সংস্থান বাতিল করা হয়েছে এবং এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যাতে ফৌজদারি আদালতের বাইরেই বিরোধের মীমাংসা হতে পারে।
ইতিবাচক পরিবর্তন - আগে এমনও সংস্থান ছিল যাতে কোনও ব্যক্তি সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের মাঝে তালিকাভুক্ত কোনও বাড়ি বা গাড়িতে উপস্থিত থাকলে এবং এই উপস্থিতির সন্তোষজনক কারণ বলতে না পারলেই তার তিনমাসের কারাদণ্ড হতে পারে। সাধারণ নাগরিকদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত অবমাননাকর। আসলে সেই সময় নাগরিকদের সন্দেহভাজন অপরাধী হিসেবেই যেন দেখা হতো। সংস্কারের পর এই অযৌক্তিক আইন দূর হয়েছে।
অতীতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে পরদিনই চালককে জরিমানা দিতে হতো রাস্তায় গাড়ি বের করলেই। নতুন আইনে এক্ষেত্রে ৩০ দিনের ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ধরুন, কোনও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অ্যাপ্রেনটিস অ্যাক্টের আওতায় নিবন্ধন সংক্রান্ত আপডেশন কোনও একবার করতে পারেননি। আগে এটা ছিল ফৌজদারি অপরাধ। নতুন আইনী কাঠামোয় বারবার বিচ্যুতি ঘটলে তবেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনও খনন সংস্থা ডকুমেনটেশনের কাজ বিধি অনুযায়ী না করলেই দোষী ব্যক্তির কারাদণ্ড হতো। এখন হবে জরিমানা। তবে, অবৈধ খনন, জালিয়াতি, সবকিছু জেনে বুঝে কারোর ক্ষতি করা, জনস্বার্থের পক্ষে হানিকর তৎপরতা- এসবের ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিধিই প্রযোজ্য হবে। কাগজপত্রের কাজে সামান্য বিচ্যুতিতে বেশি ঝামেলায় পড়তে হবে না।
১২ বছরে সকলের লাভ – প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাপন আরও সহজসাধ্য করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে জনবিশ্বাস আইনে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছরের মেয়াদে এবং তার আগে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তিনি এবিষয়ে বিশেষভাবে সচেষ্ট থেকেছেন।
জনবিশ্বাস ২০২৬-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। ২০২৩-এ প্রথম জনবিশ্বাস আইনের আওতায় ৪২টি বিধির ১৮৩টি ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ বন্ধ হয়েছে। ২০২৬-এ আরও বেশি ক্ষেত্রে- প্রায় ৪ গুণ- ফৌজদারি বিধি ওঠে গেছে। বিষয়টি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
বৃহত্তর অভিমুখ – নতুন আইনটি, নাগরিকদের জীবনযাপন সহজতর করে তোলায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের একটি অংশমাত্র। সকলের অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থান-এর সংস্থান প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন এবং প্রকৃত প্রাপকের কাছে সরকারের প্রকল্পগুলির সুবিধা যাতে পৌঁছয় তা নিশ্চিত করতে চান তিনি। এই ছবিটা কংগ্রেস জমানার থেকে একেবারে আলাদা। মনে রাখা দরকার, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলেছিলেন যে, গরিব মানুষের জন্য সরকার ১টাকা খরচ করলে মাত্র ১৫ পয়সা যায় প্রকৃত প্রাপকের কাছে।
যত্রতত্র ফৌজদারি সংস্থানের প্রয়োগের বিলোপ শুধুমাত্র সাধারণ নাগরিক নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষেও সুবিধাজনক। পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আইন প্রণয়নকারী সংস্থাগুলি এখন বড় ধরনের বিচ্যুতির ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে পারছে। আদালতের ক্ষেত্রেও এই কথাই প্রযোজ্য।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ - বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার এই জমানায় বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রণবিধি একটি বড় বিষয়। বছরের পর বছর ধরে ছোটখাটো বিচ্যুতিকেও অপরাধের তকমা দেওয়ার রীতি লগ্নির পথ বন্ধুর করে রেখেছিল। ২০১৪ এবং ২০২৫-এর মধ্যে কিন্তু ভারতে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১৪৩ শতাংশ বেড়েছে এবং তারপরেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। নিয়ন্ত্রণবিধির সংস্কার এর বড় কারণ। জন বিশ্বাস ২০২৬ সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় এবং ভারতকে বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের সামনে নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
এই সংস্কার বিচারবিভাগকেও স্বস্তি দিয়েছে। জেলা এবং নিম্ন আদালতগুলিতে দায়ের হওয়া ৪.৯ কোটি সহ ৫.৫ কোটিরও বেশি বকেয়া মামলা আসলে ছোটখাটো পদ্ধতিগত বিচ্যুতি সংক্রান্ত। এইসব ক্ষেত্রে দোষীকে এখন আর অপরাধীর তকমা দেওয়া হচ্ছে না। আদালতের অমূল্য সময় বাঁচছে। বিচারকরা বড় ধরনের বিচ্যুতি ও বিবাদ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় মন দিতে পারছেন।
তবে, বড় ধরনের বিচ্যুতির ক্ষেত্রে কড়া সংস্থানই থাকছে নতুন আইনেও। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিটাই কেবল পরিবর্তিত হয়েছে। সন্দেহ নয়, আস্থা – কেবল শাস্তি দেওয়া নয়, সংশোধনের সুযোগ ; বর্তমান সরকারের নীতি এটাই। ভয়ের দুনিয়া থেকে স্বাধীনতার ভোর – এগিয়ে চলেছে ভারত।
লেখক: ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)