নমো-যন্ত্র, নমো-যন্ত্র! চ্যাটজিপিটি দিয়ে বই লিখে ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য সম্মান পেলেন 'সেকেলে' লেখক

পকেটে মোবাইল নেই। অথচ চ্যাটজিপিটির সাহায্যে বই লিখে ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য পুরস্কার প্রিক্স গঁকুর জিতে নিলেন ফিলিপ জায়েসাদা। এআই বিতর্কে তোলপাড় ফরাসি সাহিত্যজগৎ।

Nov 07, 2026 - 14:23
নমো-যন্ত্র, নমো-যন্ত্র! চ্যাটজিপিটি দিয়ে বই লিখে ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য সম্মান পেলেন 'সেকেলে' লেখক

ভদ্রলোকের পকেটে একটা মোবাইল ফোন পর্যন্ত নেই। নিজেকে সাবেকি ঘরানার বা নেহাতই 'সেকেলে' লেখক (Philippe Jaenada) হিসেবে পরিচয় দিতে বুক ফুলে ওঠে তাঁর। কিন্তু বই লেখার সময় সেই তিনিই কিনা দিব্যি শরণাপন্ন হলেন আধুনিক কৃত্রিম মেধার!

শুধু তাই নয়, চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) আর ক্লডের মতো এআই টুল ব্যবহার করে বই লিখে ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কারটাও অনায়াসে বগলদাবা করে ফেললেন ৬২ বছরের ফরাসি সাহিত্যিক ফিলিপ জায়েসাদা। সাহিত্যের আঙিনায় এ এক অভাবনীয় ভেলকি!

এআই-এর জোড়া মাপকাঠি আর দ্বিচারিতা

লেখককে একহাত নেওয়ার আগে সমালোচকদের কাঠগড়ায় ফরাসি সাহিত্যজগতের চূড়ান্ত দ্বিচারিতা। এই প্রিক্স গঁকুর (Prix Goncourt) পুরস্কারের মঞ্চেই ক'দিন আগে ঘটে গেছে আরেক চূড়ান্ত কেলেঙ্কারি। থেলিসন ওরেলিয়েন নামে এক হাইতিয়ান-কানাডিয়ান লেখকের বইকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে সটান বাতিল করা হয়। অভিযোগ, এআই ডিটেকশন টুলে ধরা পড়েছে তাঁর লেখা 'সিটেট সা ওউ মোরির' ৯৫ শতাংশই নাকি যন্ত্রের রচনা।

এই কারণে উঠেছে প্রশ্ন। থেলিসনকে তো কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিল অ্যাকাডেমি। অথচ ফিলিপ জায়েসাদা যখন নিজেই বুক বাজিয়ে স্বীকার করলেন, সদ্যপ্রকাশিত বইয়ে এআই-এর (Artificial Intelligence) সঙ্গে গবেষণামূলক কথোপকথন রয়েছে, তখন তাঁকেই কীভাবে সসম্মানে সেরার মুকুট পরিয়ে দিল বিচারকমণ্ডলী? 

ফিলিপের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি আরও চমৎকার। সমালোচকদের উদ্দেশে তাঁর সাফ কথা, 'একজন চিত্রপরিচালক কি কখনও স্পেশাল এফেক্টস ব্যবহারের কথা লুকিয়ে রাখেন?' অর্থাৎ, লেখকের মতে, আধুনিক সাহিত্যেও এখন ভিএফএক্স বা স্পেশাল এফেক্টসের যুগ সমাগত!

সেকেলে খুনের কিনারা আর যন্ত্রের মগজ

ফিলিপের পুরস্কৃত উপন্যাসের নাম 'ল'ইনকন্যু দু কুয়ে দে জ্যাভেল' (L'Inconnue du quai de Javel)। ১৯৪৯ সালে প্যারিসের বুকে লুইস ক্যানসট নামে ২৯ বছরের এক তরুণী মডেলের অমীমাংসিত খুনের তদন্ত নিয়েই এই বই। ক্যানসটের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল শেন নদীর তীরে। পুরনো পুলিশি খাতা ঘেঁটে জর্জেস সিমেননের বিখ্যাত গোয়েন্দা জুলস মেগ্রেটের কায়দায় তদন্ত এগিয়েছেন লেখক। আর সেই গবেষণাতেই দেদার সাহায্য নিয়েছেন যন্ত্রের।

যদিও ফিলিপের দাবি, যন্ত্র নাকি কখনও মানুষের আবেগ বা হৃদয়ের বিকল্প হতে পারে না। তাঁর দার্শনিক উত্তর, 'এআই কখনও বুক চিরে, হৃদয় নিংড়ে, স্মৃতি দিয়ে বা মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বই লিখতে পারবে না।' তা হৃদয় দিয়ে না লিখুক, চ্যাটজিপিটির মস্তিষ্ক আর তথ্য দিয়ে যে ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য পুরস্কার জেতানো যায়, সে তো তিনি নিজেই প্রমাণ করে দিলেন!

১০ ইউরোর পুরস্কারে রাতারাতি লাখপতি

এই এআই বিতর্কে রীতিমতো মুখ পুড়েছে ফরাসি প্রকাশনা সংস্থার। তড়িঘড়ি নিয়ম বদলাতে আসরে অ্যাকাডেমি গঁকুর (Académie Goncourt)। সভাপতি ফিলিপ ক্লডেল জানিয়েছেন, এ বছরের শেষেই নতুন নিয়ম আসছে। যাতে স্পষ্ট বলা থাকবে, এই সম্মানজনক পুরস্কার কেবল রক্তমাংসের মানুষের লেখা বইয়ের জন্যই বরাদ্দ। প্রকাশনা সংস্থার প্রধান আন্তোইন গ্যালিমার্ডের আবার অসহায় আর্জি, কেউ যন্ত্র ব্যবহার করলে অন্তত সততার সঙ্গে যেন তা স্বীকার করেন।

এসব বিতর্কের মধ্যে অবশ্য প্যারিসের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ লে ড্রুয়ান্তের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ফিলিপের মুখে চওড়া হাসি। এই জয়ে তাঁর পক্ষে ভোট ছিল ছ'টি। দৌড়ে ছিলেন আরও দুই লেখক—ক্লেমেন্টিন মেলোইস এবং ইয়ানিক হ্যানেল। তবে তাঁদের টেক্কা দিয়ে সেরার শিরোপা ফিলিপেরই।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, প্রিক্স গঁকুর (Fiction books) পুরস্কারের অর্থমূল্য নেহাতই হাস্যকর—মাত্র ১০ ইউরো (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০০ টাকা)! তবে অর্থমূল্য নামমাত্র হলেও, এই সম্মান পেলেই রাতারাতি লেখকদের ভাগ্য ফিরে যায়। হুহু করে বাড়ে বইয়ের বিক্রি। গত বছরের বিজয়ী লরেন্ট মাউভিগনিয়ারের বই প্রায় ৬ লক্ষ ৪০ হাজার কপি চোখের পলকে উড়ে গিয়েছিল। এবারও ফিলিপের বইয়ের বিক্রি যে আকাশছোঁয়া হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাহিত্যপ্রেমীদের আবেগ যা-ই থাক, যন্ত্রের দৌলতে অন্তত পকেট তো ভরল 'সেকেলে' লেখকের!

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0