নারীদের নিজের কথায় আস্ত শারদীয়া সংখ্যা! এই একটি কারণে কেনা উচিত কৃত্তিবাসের ‘দশভুজা'?

প্রাক-শরতের বাজারে অসংখ্য শারদীয়া সংখ্যার ভিড়ে কেন স্বতন্ত্র কৃত্তিবাসের 'দশভুজা'? শুধুই নারীদের কলমে সমৃদ্ধ এই উৎসব সংখ্যার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ।

Oct 27, 2026 - 17:03
নারীদের নিজের কথায় আস্ত শারদীয়া সংখ্যা! এই একটি কারণে কেনা উচিত কৃত্তিবাসের ‘দশভুজা'?

প্রাক-শরৎ মহানগরীর আনাচে-কানাচে তত শিউলিও ফোটেনি, যত শারদীয়া সংখ্যায় ছেয়েছে বাজার। বৃকোদর এক একটি পত্রিকা। ইয়া মোটা। পুরুষ্ট। হাতে নিয়ে বারকয়েক উপর-নীচ করলে অনায়াসে মুগুর ভাঁজার 'ভাইব' জাগে! কিন্তু তাই বলে পাতা ওল্টানো? উলটে পাঠসুখপ্রাপ্তি? সে বড় দায়! বিষয় নির্বাচন অকহতব্য, রচনাভঙ্গি বমন উদ্রেক করে। প্রচ্ছদ চকমকে৷ রঙিন৷ অলংকরণ নজর টানে৷ কিন্তু পড়তে শুরু করলেই উদ্দেশ্যহীন আলোকধাঁধায় চোখে ঝিকিমিকি লেগে যায়৷

এই পথভ্রষ্ট শারদীয়া সংখ্যার ভিড়ে কৃত্তিবাসের ‘দশভুজা’ দেখে বিভ্রম ও ভীতি—প্রথমটায় দুই-ই জেগেছিল৷ তবে গেট আপে আলাদা স্বাতন্ত্র‍্যও চোখ এড়ায়নি৷ যেমন, প্রচ্ছদে অসুরদলনী, বরাভয়প্রদায়িনী দুর্গার সনাতনী ইমেজের বদলে তিনটি আলদা কেশবিন্যাসের নারীর সাইড ফেস৷ আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্বের সূচক৷ ফলে ভয় কমে। বাড়ে আগ্রহ৷ মাপে মোটামুটি প্রমাণ সাইজ৷ ওজনেও অতিরেক নেই৷ ফলে হাতে তুলে এক ঝলক দেখে নেওয়ার পালা।

কিন্তু সেই দেখে নেওয়াই কাল হল! পত্রিকাটি আমি কিনে ফেললাম!

পুজোর মাসে তিনশোটি টাকা দুম করে খরচ করে ফেলাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অচিনপুরের ডাক এড়ানো গেল কই! সম্পাদকের জবানি ও লেখক সূচি এক ঝলক দেখে 'না' করা গেল না। আদ্যোপান্ত মহিলা কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিকদের রচনায় সমৃদ্ধ কৃত্তিবাসের ‘দশভুজা’ সার্থকনামা।

কেন দরাজ সার্টিফিকেট দিচ্ছি? একে একে বলা যাক।

প্রথমত, সম্পাদকের ঝুঁকি৷ নিঃসন্দেহে তারিফযোগ্য। একটি বর্গকে এক্সক্লুসিভলি বেছে নিলে অন্য বর্গ কুপিত হতেই পারে৷ অন্তত, বাংলার সাহিত্য বাজার এখনও ততটা উদার ও মানবিক হতে পারেনি৷ দলাদলি যার মজ্জায়, সেখানে লিঙ্গসাম্যের স্বপ্ন দেখাটা সোনার পাথরবাটি! অস্তিত্বহীন। কিন্তু সম্পাদক বীজেশ সাহা সেই ঝুঁকি নিয়েছেন৷ দার্ঢ্যকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘আমাদের এবারের উৎসব সংখ্যা কৃত্তিবাসের ‘দশভুজা' তাই শুধুই নারীদের নিজের কথায় নারীবিশ্ব।’

বস্তুত, এই শেষের শব্দগুলি বেশ ওজনদার৷ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও দলিলের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে৷ এর আগে কখনও এমন আয়োজনের সাক্ষী থেকেছে বাংলার শারদীয়া সাহিত্য? পুরুষের চোখে নারীদের অন্তর্জগতের মজলিশি ব্যাখ্যা নয়, মেয়েদের অশ্রু-স্বেদ, মিলন-বিরহ একমাত্র তাদেরই উপস্থাপনের সুযোগ করে দেওয়া… বিরল! পাঠক হিসেবে এই উদ্যোগকে সাবাশি জানাতেই হয়।

পত্রিকা কেনার দ্বিতীয় বড় কারণ বিষয় বৈচিত্র্য। প্রবন্ধের কথাই ধরা যাক৷ একদিকে লীনা চাকি লিখছেন পুরুষদের বাঁধা গানে নারীর অন্তর্বেদনার ছায়া নিয়ে৷ উত্তরবাংলার ভাওয়াইয়া-চটকা গানের উল্লেখ ও ব্যাখ্যায় সুখপাঠ্য নিবন্ধ৷ ঠিক এর পিঠোপিঠিই সবুজকলি সেন লিখছেন শান্তিনিকেতন নির্মাণে মহীয়সী নারীদের কথা নিয়ে। প্রথমটি বিশ্লেষণে সজীব৷ পরেরটি তত্ত্ব ও তথ্যে ঋজু৷

আসি ছোটগল্পে। সেখানে বড় চমক তসলিমা নাসরিন৷ ক্ষুরধার। প্রত্যক্ষ৷ উত্তম পুরুষ বচনে লেখা। বিষাদবিধুর আখ্যান ‘মানুষের লেখা বই'৷ সাগরিক রায়ের ‘গণ্ডি’ মধ্যবিত্তের ঘরের গল্প বলে। তসলিমা যেখানে প্রথম-বিশ্ব-বিহারিনী, নিউইউয়র্কের রাজপথে ভ্রাম্যমাণ। সেখানে সাগরিকার গল্প শুরুই হচ্ছে দরদী জিজ্ঞাসা দিয়ে: ‘ঘুম ভেঙে উঠে ছেলেবেলার মতো আনন্দ আসে না কেন, বোঝেন না শ্রীমন্ত বিশ্বাস।’ আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় অমৃতা ভট্টাচার্যের ‘স্পর্শ’-এর৷ কথোপকথনমূলক গল্প। কিন্তু কথার জাল বুনতে বুনতে অমৃতা ঢুকে পড়েন সম্পর্কের অন্ধকার বৃত্তে৷ গোটা গল্পে স্পর্শ শব্দটি ধ্রুবপদের মতো ফিরে ফিরে এসেছে৷ এবং প্রতিবার ছড়িয়েছে আলাদা দ্যোতনা! মৃত্তিকা মাইতির ‘শান্তিবালার শৈশব’ বাংলার চিরায়ত, বহমান কাহিনিপ্রধান ছোটগল্পের স্মারক।

যেহেতু কৃত্তিবাস, তাই আলদা নজর ছিল কবিতায়৷ বলা বাহুল্য, হতাশ হইনি৷ মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতাগুচ্ছ প্রতীকধর্মী। দৃষ্টান্ত: ‘ধরো এমন যদি হয়—/ ঢাকুরিয়া ব্রিজ পেরিয়ে/ একটা সমুদ্র পাওয়া গেল/ আমি ও আমার পুরোনো প্রেমিক/ হাত ধরাধরি করে সমুদ্রে নামলাম।’ তরঙ্গের চূড়ান্ত অভিঘাত কবিতার শেষে: ‘তুমি জনতে আমি আত্মহত্যাপ্রবণ।/ আর ঢাকুরিয়া ব্রিজে/ সারি সারি উদাসীনতা/ যানজটে থমকে আছে।’

এই শহুরে একাকিত্ব বদলে যায় নাগরিক বিষাদে: ‘অন্ধকার বাগান/ অন্ধকার গাছ/ জ্যোৎস্নার মতো সাদা কামিনী ফুল/ আলো করে আছে/ অন্ধকার একলা বারান্দায়/ আমাকে মাতাল করেছে তোমার সুবাস/ যে তুমি কোত্থাও নেই।’ মিত শব্দচয়ন, পরিমিত প্রকরণ৷ অথচ ব্যঞ্জনায় গভীর!

দশভুজার বিশেষত্ব আলাদা আলাদা ক্রোড়পত্র৷ ইসমত চুঘতাই, অমৃতা শেরগিল, মীরা নায়ার থেকে অসীমা চট্টোপাধ্যায়, অন্নপূর্ণা দেবী৷ গান থেকে বিজ্ঞান৷ ছায়াছবি থেকে কথাসাহিত্য। ভুবনজয়ী নারীদের নিয়ে ফিচারধর্মী প্রবন্ধ৷ তত্ত্বের কাঁটায় আকীর্ণ নয়৷ আদ্যন্ত ঝরঝরে, সাবলীল৷ তাই বলে সহজপাচ্য নয়৷ পাঠকের সজ্ঞান অভিনিবেশ দাবি করে। যেমন, ‘সুরের অন্তরালে ‘বিদুষী’ অন্নপূর্ণা’৷ লিখেছেন ঈশিতা সরখেল। রীতিমতো তত্ত্বতালাশের ফসল। উল্লেখ রয়েছে তথ্যসূত্রে৷ কিন্তু অন্নপূর্ণা দেবীর জীবন, ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের তৎকালীন পরিস্থিতি যে প্রাঞ্জল কৌশলে সাজিয়েছেন ঈশিকা, তাতে পাঠক বিনা বাধায় অক্লেশে পড়ে চলে। সমৃদ্ধ হয়৷ সংখ্যাটি খান দশেক উপন্যাসে সাজানো৷ পুজোর স্বল্পায়ু ছুটিতে সে সব পড়ে ফেলব নিশ্চিত।

কৃত্তিবাসের উৎসব সংখ্যা কেনার আগে ভীতি ছিল৷ হাতে নেওয়ার পর বিভ্রম কেটেছে৷ পাতা উলটে জেগেছে উৎসাহ৷ পেটমোটা, গিমিকসর্বস্ব শারদীয়ার ভিড়ে ‘দশভুজা’ স্বতন্ত্র৷ ঝুঁকি নিয়ে ছক ভাঙলে সাহিত্যের আঙিনাই খানিক চওড়া হয়৷ ইতিহাসের বর্ণময় অলিন্দে রয়েছে তার প্রমাণ৷ কৃত্তিবাসের এই উদ্যোগ সেই প্রমাণের ভিতকেই খানিক মজবুত করল।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0