বিধানসভা ভোটের আগে সংরক্ষণ ইস্যুতে উত্তরপ্রদেশে পথে বহু সম্প্রদায়, জেরবার যোগী সরকার
উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ বিধানসভা ভোটের আগে সংরক্ষণ ও সামাজিক মর্যাদার দাবিতে একাধিক সম্প্রদায়ের আন্দোলন। বারাণসী থেকে চিত্রকূট, পথে উচ্চবর্ণ ও অনগ্রসর গোষ্ঠীগুলিও।
আগামী বছরের গোড়ায় উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যে ইতিমধ্যে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে সব রাজনৈতিক দল। ভোটের উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে আরও কটি কারণে। রাজ্যের একাধিক জাতি সম্প্রদায় তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নেমেছে। বেশ কয়েকটি জাতি বিশেষ করে উচ্চবর্ণের সম্প্রদায়গুলি বর্তমান সংরক্ষণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবিতে সরব।
জানা যাচ্ছে, ওই সংগঠনগুলি মনে করছে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সরকারকে চাপ দিয়ে দাবি আদায় করে নেওয়া। সংরক্ষণ এবং সেই ইস্যুতে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন উত্তর প্রদেশে নতুন কিছু নয়। ভোটের মুখে জাতিগত ইস্যুতে পথে নামাও নতুন নয়। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে এবারের মত এত বেশি সংখ্যায় জাতিগত সম্প্রদায়গুলি সংরক্ষণ ইস্যুতে অতীতে পথে নামেনি। এর পাশাপাশি রয়েছে জেন-জি বা তরুণ সমাজের দাবি দাওয়া। সব মিলিয়ে উত্তর প্রদেশ সরকার রীতিমত জেরবার বলে একাধিক সুত্র জানাচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ব্রাহ্মণ সহ উচ্চ বর্ণের একাধিক সম্প্রদায়ের পথে নামা। সমাজের এই অংশ বিজেপির অনুগত ভোটার বলে পরিচিত। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ এর দশ বছরের শাসনের পরও উচ্চবর্ণের একাধিক সম্প্রদায় অভিযোগ করছে তারা বঞ্চিত, অবহেলিত।
উচ্চবর্ণের একটি সংগঠন স্বর্ণ সমাজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও চাকরিতে সংরক্ষণ নীতি পুনর্বিবেচনার দাবিতে গত ২০ দিন ধরে বারাণসীর গঙ্গার তীরে শাস্ত্রী ঘাটে ধর্না চালিয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল ২০ রবিবার সেখানে বড় জমায়েত করে শক্তি প্রদর্শন করতে চায় সংগঠনটি।
ধরনায় অংশ নেওয়া ব্রাহ্মণ সমাজের নেতা ব্রজেশ মিশ্র বলেন, আমরা চাই সংরক্ষিত শ্রেণির অধিকার রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিয়মে আনা সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলি সরকার প্রত্যাহার করুক। আমাদের মনে কোনও সন্দেহ নেই যে এই নিয়মগুলি উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে অপব্যবহার করা হবে। তাঁর কথায়, 'আমরা সংরক্ষণ নীতির পর্যালোচনাও চাই।'
সংগঠনের এক নেতা বলেন, এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তারা যদি আমাদের উপেক্ষা করে, তবে এবার আমরা ভেবেচিন্তে ভোট দেব।'
প্রসঙ্গত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কলেজগুলিতে জাতি ও পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য বন্ধ করতে একটি বিধানের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। ধর্নায় অংশগ্রহণকারীরা ইউজিসিকে এই ধারণাটি বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন।
একই ইস্যুতে গ্রেটার নয়ডার উচ্চবর্ণের সদস্যরাও বুধবার একটি মিছিল করেন। অন্যদিকে, গিহার সম্প্রদায়, যারা অতীতে তফসিলি উপজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকলেও ১৯৫৬ সালে তফসিলি জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, তারা তাদের আগের জাতিগত মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার মোরাদাবাদে ধর্ণা কর্মসূচি পালন করে
ওই সম্প্রদায়ের এক নেতা শিব কুমার গিহার বলছেন, অখিলেশ যাদব সরকারের সময় আমরা জাতিগত শংসাপত্র পেতাম, যেখানে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে 'কাঞ্জার' হিসেবে চিহ্নিত করা হত। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ সরকার এই নথি প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে 'কাঞ্জার' একটি গালি। আমরা চাই সরকার আবার আমাদের 'গিহার' হিসেবে স্বীকৃতি দিক।'
পূর্ব উত্তর প্রদেশের দলিত (তফসিলি জাতি) জাতিগোষ্ঠীর পাসি সম্প্রদায় বুধবার গোরখপুরে একটি সভা করে এবং খোরাবারে রাজা বিজলি পাসির একটি মূর্তি স্থাপনের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
সম্প্রদায়ের আইনজীবী নীরজ পাসওয়ান বলেন, 'আমরা এখনও উত্তরপ্রদেশের মূলধারা থেকে প্রান্তিক অবস্থানে আছি এবং চাই সরকার, সমাজ আমাদের স্বীকৃতি দিক।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই সরকার খোরাবারে মহারাজা বিজলি পাসির একটি মূর্তি স্থাপন করুক, যেখানে আমাদের সম্প্রদায়ের বহু মানুষ বাস করেন। আমরা আরও চাই সরকার বাইপাস চকের নামকরণ করে ‘মহারাজা বিজলি পাসি চক’ করুক।
বিজলি পাসি সম্পর্কে লিখিত ইতিহাস খুব কমই পাওয়া যায়, তবে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন যে তিনি দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজ্যের একটি অংশের শাসক রাজা ছিলেন।
তফসিলি জাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে অখিল ভারতীয় কাহার মহাসভা এবং অখিল ভারতীয় গোন্দ মহাসভা মঙ্গলবার চিত্রকূটে একটি মহাপঞ্চায়েত বা বড় সম্মেলন ও মোটরসাইকেল র্যালি বের করে।
কুমোর সম্প্রদায়ের নেতা বীর বাহাদুর রাইকওয়ার বলেন, 'তফসিলি জাতির অন্তর্গত অনেক জাতের চেয়েও আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। কিন্তু সরকার আমাদের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করে। এর সংশোধন প্রয়োজন। আমরা আশা করি, সরকার যদি আমাদের ভোট চায়, তবে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।'
মাল্লাহ (নৌকার মাঝি) সম্প্রদায়ও এলাহাবাদ ও চিত্রকূটে বেশ কয়েকটি স্থানে ধর্না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই সম্প্রদায়ের নেতা রাম নারায়ণ নিষাদ বলেছেন, 'আমরা বন্যার সময় মানুষকে উদ্ধার করি, কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় আমাদের নৌকাগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও সরকার আমাদের সাহায্য করেনি। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু খোঁজখবর পর্যন্ত করা হয়নি।
তিন দিন আগে দেওরিয়া জেলার রুদ্রপুরে বানিয়া সমাজ সভা করে 'যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের' দাবি জানিয়েছে।
মাল্লাহ সম্প্রদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে চিত্রকূটের মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট অজয় যাদব বলেন, 'আমরা তাদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছি।'
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)