সমান যোগ্যতা, তবু ফারাক কেন? কর্পোরেট জগতে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতই কী সমস্যার মূলে?

লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের বড় প্রকাশ হল—একই আচরণকে পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে আলাদা চোখে দেখা। একজন পুরুষ দৃঢ়ভাবে মতামত প্রকাশ করলে তাঁকে আত্মবিশ্বাসী বা উদ্যোগী ভাবা হয়। অথচ একজন মহিলা সেটাই করলে তাঁকে আক্রমণাত্মক বা "স্টাবর্ন", অনমনীয় বা "রিজিড" অথবা সব ব্যাপারে অতিরিক্ত মতামতপ্রবণ বলে একদম ছাপ মেরে দেওয়া হয়।

Sep 24, 2026 - 15:46
0 0

যে কোনও কর্পোরেট ফিল্ডে কাজ করতে গেলে আজও মহিলাদের নানা রকমের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সমাজ এগোচ্ছে, প্রযুক্তি ক্রমশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু মানসিকতা! বদলেছে কি? এখনও প্রায় সর্বক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত একটা বিশাল সমস্যা। এদেশে তথা রাজ্যে বেশিরভাগ কোম্পানীতে উচ্চপদে পুরুষদের আধিক্য থাকায় এই পক্ষপাত কখনও প্রকাশ্য, আবার কখনও খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। যেখানে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কম আর সুযোগ সীমিত, সেখানে অফিসের সংস্কৃতি বা কালচার, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ক্ষমতার প্রতিপত্তি কেরিয়ারের অগ্রগতিতে বড় প্রভাব ফেলে। তবে বিষয়টিকে শুধু “পুরুষরা মহিলাদের পছন্দ করেন না” এভাবে দেখলে এর গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এর পেছনে থাকে সামাজিক ধারণা, পুরুষ-প্রধান ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং অবচেতন পক্ষপাত। ফলে এই বৈষম্য অনেক সময় নিয়ম মেনে তৈরি হয় না, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।

একই আচরণের ভিন্ন মূল্যায়ন, কেন এমন হবে? 

লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের বড় প্রকাশ হল—একই আচরণকে পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে আলাদা চোখে দেখা।
একজন পুরুষ দৃঢ়ভাবে মতামত প্রকাশ করলে তাঁকে আত্মবিশ্বাসী বা উদ্যোগী ভাবা হয়। অথচ একজন মহিলা সেটাই করলে তাঁকে আক্রমণাত্মক বা "স্টাবর্ন", অনমনীয়  বা "রিজিড" অথবা সব ব্যাপারে অতিরিক্ত মতামতপ্রবণ বলে একদম ছাপ মেরে দেওয়া হয়। 

পুরুষ নিজের সাফল্যের কথা বললে তা নেতৃত্ব হিসেবে ধরা হয়, আর মহিলা বললে তাকে আত্মপ্রচার বলা হয়। একইভাবে, পুরুষ পদোন্নতি চাইলে তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রশংসিত হয়, আর মহিলা চাইলে তাঁকে অতিরিক্ত দাবিদার বলা হয়। অর্থাৎ, প্রশ্নটা শুধু কী আচরণ করা হচ্ছে তা নয়, বরং কে করছেন সেটাই মূল্যায়নের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

যোগ্যতা প্রমাণের অতিরিক্ত চাপ 

আরেকটি সমস্যা হল, অনেক মহিলা পেশাদারকে বারবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। পুরুষ উচ্চপদে থাকলে তাঁর সক্ষমতা সহজেই মেনে নেওয়া হয়, কিন্তু একজন মহিলা একই জায়গায় পৌঁছালে তাঁর জ্ঞান ও নেতৃত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের মতো পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়। একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যদি একজনকে বারবার প্রমাণ করে যেতে হয়, তবে তা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে ক্ষমতার ব্যবহার 

অফিসের সিদ্ধান্ত শুধু মিটিং বা লিখিত নীতি দিয়ে হয় না, আনঅফিসিয়াল যোগাযোগও অনেক বড় ভূমিকা রাখে। কার সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে, কার মতামত আনুষ্ঠানিক নয় এমন আলোচনাই (আনঅফিসিয়াল) আগে শোনা হয়, কে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন—এসব বিষয় অনেক সময় প্রকল্প, দায়িত্ব এবং সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। 

একইসঙ্গে, দীর্ঘদিন পুরুষের আধিক্য থাকলে দেখা যায় সেই প্রতিষ্ঠানের চেনাশোনা বা আড্ডার জায়গাও পুরুষকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। ফলে একজন মহিলা সমান কাজ করেও ক্ষমতার পরিসরে পিছিয়ে পড়তে পারেন।

পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে বেশি আলোচনা

মহিলাদের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হল তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগেভাগে ধারণা তৈরি করে নেওয়া। ধরে নেওয়া হয়, তাঁরা হয়তো পারিবারিক কারণে কাজের জায়গায় বেশি সময় দিতে পারবেন না বা কর্মসূত্রে ভ্রমণ করতে পারবেন না। কিন্তু অনুমান করে কারও পেশাগত ক্ষমতা বিচার করা একেবারেই ঠিক নয়। তিনি যদি সব দায়িত্ব নিতে সক্ষম হন, তবে তাঁর বাস্তব দক্ষতার ভিত্তিতেই তাঁকে মূল্যায়ন করা উচিত।পারিবারিক পরিস্থিতি দিয়ে একজন মহিলার কর্মদক্ষতা যাচাই করা কখনই ঠিক নয়।

ভাল কাজ এবং কাজ দেখানোর মধ্যে পার্থক্য 

কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে, অফিসে শুধু ভাল কাজ করাই যথেষ্ট নয়, কাজটা কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে সেটাও জরুরি। অর্থাৎ আপনি যে কাজ করছেন সেটা সবাই কতটা দেখছে বা জানছে সেটাও জরুরি। কেউ নিজের সাফল্য সহজে সামনে আনতে পারেন, আবার কেউ ভাবেন ভাল কাজ নিজেই কথা বলবে। ফলে কাজের সঙ্গে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে ফারাক তৈরি হয়। এখানে প্রতিষ্ঠানের কাজ হল শুধু কে কতটা নিজের কাজ প্রচার করতে পারছে, সেই প্রচারের ক্ষমতা না দেখে প্রকৃত অবদানকে মূল্যায়ন করা।

প্রশ্ন তুললেই “কঠিন” হয়ে যাওয়া 

সিনিয়র মহিলা পেশাজীবীরা যখন কোনও অন্যায় বা প্রশাসনিক সমস্যার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, তখন অনেক সময় কাজের কথার চেয়ে তাঁদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা শুরু হয়। পুরুষ একই অবস্থান নিলে তাঁকে নেতা ভাবা হয়, আর মহিলা নিলে তাঁকে “কঠিন স্বভাবের” বা “সহযোগিতায় অনাগ্রহী” বলে ব্যাখ্যা করা হয়। এখানে প্রশ্ন জাগে—একই আচরণে পুরুষকে কি একই কথা বলা হতো?

সিনিয়র পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে পক্ষপাত কেন আরও সূক্ষ্ম? 

শুরুতে বৈষম্য সহজে বোঝা গেলেও সিনিয়র পর্যায়ে তা আরও সূক্ষ্ম রূপ নেয়। তখন সরাসরি না বলে বলা হয়—আপনার যোগাযোগের ধরন বদলাতে হবে, আপনার নেতৃত্ব বড় কঠিন, বা আপনার সঙ্গে কাজ করা শক্ত। মূল্যায়নের সময় উভয়কে একই মাপকাঠিতে মাপা হচ্ছে কি না, সেটাই আসল কথা।
এসব মন্তব্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে যথার্থও হতে পারে। কিন্তু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিই আসল বিষয়।

প্রশাসনিক নীতি থাকলেই কি পক্ষপাত দূর হয়? 

অনেক প্রতিষ্ঠানে সমতা ও বৈষম্যবিরোধী নীতি থাকে। কিন্তু লিখিত নীতি থাকা এবং বাস্তবে তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ—দুটি এক বিষয় নয়। পদোন্নতি, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং নেতৃত্বের সুযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ কতটা হচ্ছে সেটাই আসল।

তবে সব পুরুষ পক্ষপাতদুষ্ট নন, ব্যতিক্রমও আছে

এই আলোচনার অর্থ এই নয় যে সব পুরুষ পক্ষপাতদুষ্ট। অনেক পুরুষই সমতার পক্ষে থাকেন। আবার অনেক সময় মহিলারাও অবচেতনভাবে এই পক্ষপাতের অংশ হয়ে যান। তাই দোষ না খুঁজে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটা সত্যি নিরপেক্ষ কি না, সেটাই দেখা উচিত।

প্রকৃত সমতা কোথা থেকে শুরু হবে? 

কর্পোরেট সমতা মানে শুধু সংখ্যা সমান করা নয়। প্রকৃত সমতা তখনই আসবে যখন—

•    একই যোগ্যতার মূল্যায়ন একই মানদণ্ডে হবে;

•    একই আচরণকে লিঙ্গভেদে আলাদাভাবে দেখা হবে না;

•    ভুলের জন্য জবাবদিহি সবার ক্ষেত্রে সমান হবে;

•    এবং নেতৃত্বের সুযোগ মেধা ও অবদানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, একজন মহিলা নিজের অধিকার বা সমস্যা নিয়ে কথা বললে তাঁকে প্রথমেই “কঠিন” বা “আক্রমণাত্মক” না বলে তাঁর কথাটি শুনতে হবে। একজন মহিলা চুপ থাকলেই ভাল কর্মী, আর মুখ খুললেই কঠিন বা রূঢ় ব্যক্তিত্ব—এমন মানসিকতা সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।

একটি ভাল প্রতিষ্ঠান সেটাই, যেখানে একজন মহিলাকে আগে ‘মহিলা’ নয়, বরং একজন ‘যোগ্য পেশাদার’ হিসেবে দেখা হবে।

-লিঙ্গ নয়, যোগ্যতা; পরিচয় নয়, অবদান; ধারণা নয়, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন—এটাই হোক কর্পোরেট নেতৃত্বের ভিত্তি। সেখানেই শুরু আসল সমতার।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User