‘৫০ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের সামনে বড় সুযোগ’, কলকাতা হোক বৌদ্ধিক মহানগরী: হর্ষবর্ধন নেওটিয়া
দ্য ওয়াল টাউন হলে হর্ষবর্ধন নেওটিয়া বললেন, ৫০ বছর পর কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার বাংলার শিল্প ও বিনিয়োগে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা, নীতি ও পরিকাঠামোর পাশাপাশি কলকাতাকে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব তাঁর।
প্রায় পাঁচ দশক পর পশ্চিমবঙ্গের সামনে এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এবং এহেন পরিস্থিতি রাজ্যের শিল্প, পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় সুযোগ এনে দিতে পারে বলেই মনে করছেন অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়া। তাঁর মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় বড় পরিকাঠামো প্রকল্প থেকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন—বহু ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের সুযোগ বেড়েছে।
কলকাতার ঐতিহাসিক টাউন হলে আয়োজিত ‘দ্য ওয়াল টাউন হল—স্ক্রিপ্টিং টুমরোজ বেঙ্গল’-এ শিল্পমহলের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে গিয়ে হর্ষবর্ধন বলেন, “৫০ বছর পরে আমাদের সরকার রাজ্যে আর কেন্দ্রে একই রাজনৈতিক দল ক্ষমতয়া রয়েছে। এটার আমাদের রাজ্যের জন্য একটা বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।”
তাঁর বক্তব্য, বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিল্প নয়, আয়ুষ্মান ভারতের মতো কেন্দ্রীয় জনকল্যাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দুই সরকারের সমন্বয় সাধারণ মানুষের উপকারে আসতে পারে বলে মত তাঁর।
‘যৌথ ভাবে কাজ করার সুযোগে শিল্পেরও উপকার হবে’
দ্য ওয়াল টাউন হলে হর্ষবর্ধনের আগে শিল্প নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন টিটাগড় রেল সিস্টেমসের ভাইস চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর উমেশ চৌধুরী। সেই প্রসঙ্গ টেনেই হর্ষবর্ধন বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ ভাবে কাজ করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার সুফল যেমন সাধারণ মানুষ পেতে পারেন, তেমনই লাভবান হতে পারে শিল্পমহলও।
রাজ্যের বর্তমান সরকারও শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য নতুন শিল্পনীতি, জমি নীতি, জমি-সিলিং আইনে পরিবর্তন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎসাহমূলক ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। চলতি মাসেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, এ সংক্রান্ত রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে।
শিল্পের জন্য দরকার তিনটি জিনিস
কিন্তু এই রাজনৈতিক সুযোগকে শিল্পের সুযোগে পরিণত করতে কী প্রয়োজন?
হর্ষবর্ধনের মতে, যে কোনও ব্যবসার জন্য মূলত তিনটি বিষয় দরকার—নিরাপত্তা, নীতি এবং পরিকাঠামো। তাঁর কথায়, “একটা সিকিউরিটি অ্যান্ড সেফটি, দ্বিতীয় পলিসি, আর তৃতীয় হল পরিকাঠামো। তাছাড়া বাকি যা কিছু আছে সেটা তো নিজের উদ্যোগে করতে হয়।”
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই তিনটি বিষয়েই ঘোষণা এবং কিছু কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। নিরাপত্তার প্রসঙ্গে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ থেকে শুরু করে শহরে অগ্নিনিরাপত্তা ও বাড়ি পরিদর্শনের কথাও উল্লেখ করেন।
পরিকাঠামোর ঘাটতি পূরণের আশা
পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন হর্ষবর্ধন। নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা, রিং রোড এবং মেট্রো করিডরের কাজের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে পরিকাঠামোর যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু পরিকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গকে এগিয়ে যেতে হলে যে একটি সক্রিয় ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পনীতি দরকার তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বার বার মনে করিয়ে দেন।
‘আমাদের টান বাংলাতেই ব্যবসা করার’
হর্ষবর্ধন বলেন, আজকের প্রতিযোগিতামূলক দুনিয়ায় কোনও শিল্পসংস্থা কোথায় বিনিয়োগ করবে, তা নির্ভর করে সেই রাজ্যে কী ধরনের সুবিধা ও নীতি পাওয়া যাচ্ছে তার উপর।
বাংলার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বোঝাতে তিনি জানান, তাঁর পরিবার প্রায় ১৩০ বছর ধরে কলকাতায় বসবাস করছে। তাঁর ব্যবসারও প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাংলায় ব্যবসা করার একটা টান রয়েছে।
কিন্তু আবেগের পাশাপাশি শিল্পের বাস্তবতাও রয়েছে। টিটাগড়ের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চান, প্রয়োজনীয় নীতিগত সুবিধা অন্য রাজ্যে থাকলে শিল্পসংস্থাকে কখনও কখনও সেখানেই নতুন প্রকল্প নিয়ে যেতে হয়।
এই কারণেই রাজ্যের প্রস্তাবিত নতুন শিল্পনীতি নিয়ে আশাবাদী অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান। তাঁর কথায়, “আমি খুবই আশাবাদী যে আমাদের নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি খুব শীঘ্রই আসবে। সেটা একটা প্রোগ্রেসিভ আর পজিটিভ পলিসি হবে।”
রাজ্য ইতিমধ্যে শিল্পের জন্য জমি পাওয়া সহজ করতে ভূমি আইন সংস্কারের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তও অগস্টে জানিয়েছিলেন, বড় শিল্পের জন্য জমি ধরে রাখা ও ব্যবহার সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সহজ করার বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরবান ল্যান্ড সিলিং, ঠিকা টেন্যান্সি আইনেও বদলের প্রস্তাব
হর্ষবর্ধনের মতে, বড় শিল্পের জন্য বড় জমি অধিগ্রহণের সমস্যা রাতারাতি মেটানো কঠিন। কিন্তু তার মধ্যেও কয়েকটি ‘ছোট সমাধান’ দ্রুত করা সম্ভব।
সেই সূত্রেই আরবান ল্যান্ড সিলিং আইন এবং ঠিকা টেন্যান্সি আইনে পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যে পরিস্থিতিতে এই আইনগুলি তৈরি হয়েছিল তার যুক্তি নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের বহু জায়গায় এই ধরনের আইনে পরিবর্তন এসেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সম্পূর্ণ বাতিল না হলেও বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
রাজ্য সরকারও আরবান ল্যান্ড সিলিং আইন পুনর্বিবেচনার কথা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি শিল্পের জন্য জমি ব্যবহারের নিয়ম সহজ করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিশেষ প্রস্তাব—কলকাতা হোক ‘আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক শহর’
বক্তব্যের শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে কলকাতাকে ঘিরে একটি বিশেষ প্রস্তাব রাখেন হর্ষবর্ধন নেওটিয়া।
তাঁর মতে, কলকাতার আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং বৌদ্ধিক ঐতিহ্য এখনও বিরাট সম্পদ। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কলকাতাকে এমন একটি শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে ব্যবসা, অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি ও চিন্তাচর্চা নিয়ে বিশ্বের বড় বড় সম্মেলন হবে এবং দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট মানুষ নিয়মিত আসবেন।
তার জন্য সব কিছু নতুন করে তৈরি করতে হবে না বলেই মত তাঁর। প্রয়োজন শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করা, আবর্জনা ব্যবস্থাপনার উন্নতি, হকার সমস্যার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং কয়েকটি মৌলিক নাগরিক পরিষেবায় নজর দেওয়া।
কলকাতার সঙ্গে নেওটিয়া পরিবারের এই ভাবনার একটি ঐতিহাসিক যোগও রয়েছে। অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী, হর্ষবর্ধন নেওটিয়া ও সুরেশ নেওটিয়ার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘এ হোমেজ’ প্রকল্পের তহবিল কলকাতা টাউন হল পুনরুদ্ধারের কাজে দেওয়া হয়েছিল।
হর্ষবর্ধনের আশা, ঠিক ভাবে পরিকল্পনা করা গেলে কলকাতা আবার ‘আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক শহর’ হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করতে পারে।
আর তাঁর গোটা বক্তব্যের মূল সুর এক জায়গাতেই—প্রায় ৫০ বছর পর তৈরি হওয়া কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পশ্চিমবঙ্গ যদি নীতি, নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোর উন্নতির সঙ্গে জুড়তে পারে, তা হলে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজ্যের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)