World Cup 2026: অ্যাজটেকায় 'অল্টিটিউডে'র শৃঙ্গ কীভাবে 'অ্যাটিটিউড' দিয়ে জয় করল ১০ জনের ইংল্যান্ড?

গুঞ্জন যাতে পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, তার জন্য মা নিজেই ল্যাপটপে অনলাইন লেকচার ভিডিওগুলো দেখা শুরু করেন। গুঞ্জন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনত, আর মা নিজে সেই কঠিন কঠিন সায়েন্সের ক্লাসগুলো বুঝে গুঞ্জনের জন্য বিস্তারিত ও সহজ নোট তৈরি করতেন। তিন মাস ধরে মায়ের তৈরি করে দেওয়া সেই অমূল্য নোটই শেষ পর্যন্ত গুঞ্জনের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।

Jul 06, 2026 - 17:56
0 0
World Cup 2026: অ্যাজটেকায় 'অল্টিটিউডে'র শৃঙ্গ কীভাবে 'অ্যাটিটিউড' দিয়ে জয় করল ১০ জনের ইংল্যান্ড?

রাজস্থানের কোটা (Kota) এমন এক শহর, যার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকে হাজার হাজার পড়ুয়ার স্বপ্ন। কিন্তু  হাড়ভাঙা খাটুনি, আত্মত্যাগ আর জেদের গল্প। কিন্তু এবার জেইই অ্যাডভান্সড (JEE Advanced) পরীক্ষায় কোটা থেকে এমন এক অভাবনীয় সফলতার কাহিনি সামনে এসেছে, যা শুধু একজন পড়ুয়ার নয়, বরং এক মায়েরও সহপাঠী হয়ে ওঠার গল্প (Gunjan Kumar IIT Delhi success story)।

পরীক্ষার ঠিক মুখে যখন মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা হারিয়েছিল ছেলে, তখন মা নিজেই হয়ে উঠলেন শিক্ষিকা এবং সহযোদ্ধা। আর সেই মায়ের হাতে লেখা নোটের ওপর ভর করেই (Kota JEE preparation Gunjan Kumar mother notes) সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে এবার দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইটি (IIT) দিল্লিতে পড়ার সুযোগ পেলেন বিহারের গুঞ্জন কুমার।

এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্প বিহারের সীতামারহির বাসিন্দা গুঞ্জন কুমার এবং তার মা গুঞ্জা দেবীর। গত দু'বছর ধরে কোটার একটি বিখ্যাত ইনস্টিটিউট থেকে জেইই-র প্রস্তুতি নিচ্ছিল গুঞ্জন। সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু আসল পরীক্ষাটা নেওয়ার জন্য যেন নিয়তি ওঁত পেতে বসেছিল। পরীক্ষার ঠিক কয়েক মাস আগে আচমকাই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে গুঞ্জন।

চিকিৎসকরা জানান, গুঞ্জন 'নিউমোথোরাক্স' (Pneumothorax)-এ আক্রান্ত হয়েছে, যার সহজ অর্থ হল ফুসফুস অকেজো (Collapsed lung) হতে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশে প্রায় টানা তিন মাস সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী (Bed rest) থাকতে হয় তাকে। কোটা গিয়ে সশরীরে ক্লাসে বসার কোনও উপায় ছিল না। গুঞ্জনের জীবনের এত বড় স্বপ্ন কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? এই কঠিন সময়েই এগিয়ে আসেন মা গুঞ্জা। পেশায় গৃহবধূ হলেও তাঁর ঝুলিতে ছিল বিএড (B.Ed) ডিগ্রি। বহু বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মা শুধুমাত্র ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন করে খাতা-পেন তুলে নিলেন (pneumothorax student cracks JEE)।

গুঞ্জন যাতে পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, তার জন্য মা নিজেই ল্যাপটপে অনলাইন লেকচার ভিডিওগুলো দেখা শুরু করেন। গুঞ্জন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনত, আর মা নিজে সেই কঠিন কঠিন সায়েন্সের ক্লাসগুলো বুঝে গুঞ্জনের জন্য বিস্তারিত ও সহজ নোট তৈরি করতেন। তিন মাস ধরে মায়ের তৈরি করে দেওয়া সেই অমূল্য নোটই শেষ পর্যন্ত গুঞ্জনের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।

গুঞ্জনের লড়াইটা কিন্তু শুধু ফুসফুসের রোগের সঙ্গেই ছিল না। জন্ম থেকেই তার দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ। প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি দৃষ্টিহীনতা রয়েছে তার চোখে, যার জন্য মাইনাস ৯.৫ পাওয়ারের চশমা তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা যে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য, তা প্রমাণ করে দিল গুঞ্জন। জেইই মেইনসে (JEE Main) ৯১.৮ পার্সেন্টাইল পাওয়ার পর, জেইই অ্যাডভান্সড পরীক্ষায় পিডব্লিউডি ওবিসি (PWD OBC) ক্যাটাগরিতে অল ইন্ডিয়া র‍্যাংক ৫০ এবং কমন পিডব্লিউডি তালিকায় ১২০ র‍্যাংক করে বাজিমাত করেছে সে। এবার আইআইটি দিল্লির সবথেকে ডিমান্ডিং ব্রাঞ্চ অর্থাৎ ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ নিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন এই লড়াকু ছাত্র।

গুঞ্জনের বাবা রাজনারায়ণ প্রসাদ বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO)-এর একজন ইঞ্জিনিয়ার। গুঞ্জনের এই লড়াকু মানসিকতা দেখে তার ছোট ভাইও এখন কোটাতেই জেইই-র প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সাফল্যের পর আবেগঘন গুঞ্জনের কথায়, "পরিস্থিতি সবসময় আমাদের পক্ষে থাকে না। পরীক্ষা শুধু আমাদের জ্ঞানের নয়, ধৈর্যের এবং সাহসেরও পরীক্ষা নেয়। আমি ঠিকই করেছিলাম কোটায় থেকে আইআইটি ক্র্যাক করব এবং নিজের সেরাটা দিয়েছি। আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, তখন মায়ের সমর্থন এবং শিক্ষকদের সঠিক গাইডেন্স না থাকলে আজ আমি এখানে পৌঁছতে পারতাম না।" অন্যদিকে চোখের কোণে আনন্দের জল নিয়ে মা গুঞ্জা দেবীর। তাঁর কথায়, "ছেলের স্বপ্নটাই আমার স্বপ্ন। ও যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেঙে পড়িনি। আমরা একসঙ্গে অনলাইন ক্লাস দেখতাম, আমি ওর জন্য নোট বানাতাম। আজ সেই নোট ওর কাজে লেগেছে দেখে একজন মা হিসেবে আমার বুক গর্বে ভরে যাচ্ছে।"

চোখে কম দেখলেও গুঞ্জনের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। দশম শ্রেণিতে ৮২.৫% এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ৭০% নম্বর পেয়েছিল সে। কোটায় আসার আগে ইন্টারনেটে জেইই প্রস্তুতির সেরা কোচিং খুঁজছিল গুঞ্জন। সেই সময়ই চোখে পড়ে ২০২১ সালের জেইই মেইন এবং অ্যাডভান্সডের অল ইন্ডিয়া টপার মৃদুলা আগরওয়ালের একটি ভিডিও। মৃদুলের সেই সাফল্য দেখেই গুঞ্জন বাবা-মাকে রাজি করিয়ে ২০২৩ সালে কোটায় চলে আসে স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে।

সবকিছু ভালই চলছিল, কিন্তু প্রথম ধাক্কাটা আসে গত বছরের ৫ অক্টোবর। ইনস্টিটিউটে একটি রুটিন পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরের দিনই বুকে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে গুঞ্জন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, অসাবধানতাবশত অতিরিক্ত ভারী কোনও জিনিস তোলার কারণে তার বাঁ দিকের ফুসফুসে প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং ফুসফুসটি কোলাপ্স করে। যার ফলে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ পরীক্ষার ঠিক আগের গোল্ডেন টাইমটাই সম্পূর্ণ বিছানায় কাটাতে হয়েছিল গুঞ্জনকে। কিন্তু কোটা এমন এক শহর যে শুধু পরীক্ষায় পাস-ফেলের গল্প হয়েই থেকে যায় না, বরং জীবনযুদ্ধে জিততে শেখায়। গুঞ্জন এবং তাঁর মায়ের জীবনের পরীক্ষার সঙ্গে এই লড়াই শুধু কোটায় নয়, বরং ছোট এই শহরের বারে বেরিয়ে আগামী দিনের কাছে এক মস্ত বড় অনুপ্রেরণা হয়ে রইল।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User