World Cup 2026: মাঠে জার্মান-বধ, দেশে ছুটি ঘোষণা! টাইব্রেকারের এক রাত বদলে দিল প্যারাগুয়ের আত্মপরিচয়
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল প্যারাগুয়ে। জার্মানি-বধের পর দেশজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট। জানুন বিস্তারিত।
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ পেনাল্টিটা জালে জড়াতেই আর নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি কেউ। মাঠে ছুটে গেলেন ফুটবলাররা। গ্যালারিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন সমর্থকেরা। কারও চোখে জল, কারও মুখে শুধু একটাই শব্দ—‘ভামোস!’ ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় উঠেছে প্যারাগুয়ে (Germany vs Paraguay Penalty Shootout)। দেশের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা সাফল্যের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মঙ্গলবার সরকারি ছুটি ঘোষণা প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার (FIFA World Cup 2026)।
টাইব্রেকারে শেষ শটটি নেন বদলি ডিফেন্ডার হোসে কানালে (Jose Canale)। স্নায়ুর চাপ সামলে গোল করতেই শুরু হয় উৎসব। ২০১৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট খেলতে নেমে ইউরোপের অন্যতম সফল দলের ছুটি করে দিল লা আলবিরোহা (World Cup Knockout Stage)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার টাইব্রেকারে বিপর্যয় জার্মানির (Germany Penalty Shootout Record)। এর আগে এই আসরে চারটি শুট-আউটে জিতেছিল তারা। বড় প্রতিযোগিতায় এটিই তাদের মাত্র দ্বিতীয় টাইব্রেকার হার। ১৯৭৬ ইউরো ফাইনালের পর এমন হতাশা আর দেখেনি জার্মানরা।
বল ছিল জার্মানির, লড়াই জিতল প্যারাগুয়ে
পরিসংখ্যান বলছে, লড়াই একতরফা। জার্মানির বলের দখল ৭৫ শতাংশ। সাকুল্যে ৭১৯টি পাস খেলেছে। প্যারাগুয়ে মাত্র ১৬১টি। মুসিয়ালারা শট নিয়েছেন ২১টি, বিপক্ষে মাত্র ৭টি। কিন্তু এই সংখ্যার আধিপত্যের কোনও মূল্য শেষ পর্যন্ত থাকল না।
পুরো ম্যাচে রক্ষণ জমাট রেখে প্রতিপক্ষকে আটকে দেয় গুস্তাভো আলফারোর দল। বাছাইপর্বেও এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র ০.৭৮ গোল করে প্যারাগুয়ে, যা মূলপর্বে ওঠা দলগুলির মধ্যে যৌথভাবে সর্বনিম্ন। তবু ৬৩ বছরের আর্জেন্তিনীয় কোচ আলফারোর অধীনে বদলে যায় গোটা ছবি। বাছাইপর্বের ৬ ম্যাচের পর দায়িত্ব নিয়ে শেষ ১২ ম্যাচে মাত্র একবার হেরেছিলেন তিনি। সাফল্যের ধারা বজায় রইল বিশ্বকাপেও।
টাইব্রেকারে ভাঙল জার্মানির দুর্গ
টাইব্রেকারের শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ে জার্মানি। প্রথম শটে ব্যর্থ হন কাই হাভার্ৎজ। পরে নিক ভল্টেমাডের শটও আটকে যায়। প্যারাগুয়েও অবশ্য দু'বার ম্যাচ শেষ করার সুযোগ নষ্ট করে। তবু শেষ পর্যন্ত আর ভুল করেননি হোসে কানালে।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ আপ্লুত। বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা কী অনুভব করছি, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। সতীর্থদের জন্য আমি গর্বিত। আমরা আরও একটি ম্যাচ খেলার যোগ্য ছিলাম। আজ প্রকৃত চরিত্র দেখাতে হত। জার্মানি জানত, তাদের জন্য ম্যাচটা সহজ হবে না। জানত, আমরা হার মানব না। এই জয় আমরা প্যারাগুয়ের সব মানুষের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।’
স্টেডিয়ামের বাইরে এক ষোলো বছরের সমর্থকের কথাতেও ধরা পড়ে সেই আবেগ। বলেন, ‘অনেকেই আমাদের বিশ্বাস করেনি। আমরা সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছি। ২০১০ সালের পর আমরা বিশ্বকাপে ফিরেছি। আমার জন্মও ২০১০-এ। আজকের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এখন সবাই জানবে প্যারাগুয়ে কারা!’
সামনে আরও বড় পরীক্ষা
ম্যাচের পর বিশ্লেষকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে প্যারাগুয়ের লড়াই। প্রাক্তন স্কটিশ ফুটবলার প্যাট নেভিন বলেন, ‘ফুটবল আমরা দেখি আবেগের জন্য, আনন্দের জন্য, বিশেষ মুহূর্তের জন্য। আজ সেই দৃশ্যই দেখলাম। সামনে বসে থাকা মানুষগুলো কাঁদছিল। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে এটাই অন্যতম সেরা ফল।’
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল বিশেষজ্ঞ টিম ভিকারির মন্তব্য, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা সীমাবদ্ধতা নিয়েই খেলে। কিন্তু লড়াই ছাড়ে না। ইউরোপের এক মহাশক্তিকে হারিয়ে তারা দেখিয়ে দিল, চরিত্রই সবচেয়ে বড় সম্পদ।’
দেশজুড়ে উচ্ছ্বাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা মঙ্গলবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিরুদ্ধে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয় এবং বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠার স্মরণে এই ছুটি ঘোষণা করা হল।’ কোচ গুস্তাভো আলফারোর বার্তাও স্পষ্ট। বলেন, ‘আমি চাই গোটা প্যারাগুয়ে এই মুহূর্ত উপভোগ করুক। আমাদের ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের হৃদয় কখনও হার মানে না। সেটাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।’
এবার শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের সামনে ফ্রান্স অথবা সুইডেন। ফলাফল যাই হোক, জার্মানিকে হারানোর রাত ইতিমধ্যেই দেশের ফুটবল ইতিহাসে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)