World Cup 2026: বারতিনেক ভুরু তুললেন, বারচারেক চুইং গাম চিবোলেন, ৪-৩-৩ বদলে হল ৪-২-৪, বাকিটা ইতিহাস!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জাপানের বিরুদ্ধে নাটকীয় জয় ব্রাজিলের। হাফটাইমে ডন কার্লোর মগজাস্ত্রে ৪-৩-৩ বদলে ৪-২-৪ ছকে বাজিমাত সেলেসাওদের। গোল করলেন মার্টিনেলি।

Jun 30, 2026 - 12:10
0 0
World Cup 2026: বারতিনেক ভুরু তুললেন, বারচারেক চুইং গাম চিবোলেন, ৪-৩-৩ বদলে হল ৪-২-৪, বাকিটা ইতিহাস!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে বিরাট কিছু হাসিল করে ফেলার পর একটা বন্য আনন্দ হচ্ছে অথচ সেটা পুরোপুরি উপভোগও করতে পারছেন না। একটা দমচাপা অস্বস্তি হচ্ছে। চাইছেন নিয়ন্ত্রণ। যুগপৎ আবেগ ও আহ্লাদকে বশে আনতে মরিয়া। অথচ আইডল গোছের কাউকে পাচ্ছেন না। নাস্তিক আপনি৷ বুদ্ধের বাণী, খ্রিস্টের বচনেও ডাল গলছে না৷ অথচ দ্রুত পরিত্রাণ চাই (FIFA World Cup 2026)!

সহজ উপায় একটাই৷ ডন কার্লোর (Carlo Ancelotti Tactics) দিকে চেয়ে থাকুন৷ মিনিট দু'য়েক৷ অভিব্যক্তিটুকু পড়ুন। স্টপেজ টাইমে দল জিতেছে৷ পিছিয়ে পড়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে৷ ডাগ আউটে বাঁধনভাঙা উল্লাস৷ ময়দানে লাগমছাড়া উৎসব৷ অথচ তিনি দু'হাত তুলে শান্তি ধরে রাখার নির্দেশ দিয়ে চলেছেন: 'কাম ডাউন! কাম ডাউন!' ধৈর্য ধরো। নিয়ন্ত্রণ রাখো৷ অনেক পথ পেরনো বাকি৷ আরও অজস্র পাকদণ্ডী সামনে৷ চড়াই ভাঙতে হবে৷ এখনই সব উদ্যমটুকু উল্লাসে খরচ করে দিও না (World Cup Knockout Stage)।

তিনিই চাণক্য৷ তিনিই বিধাতা। তাঁর নির্দেশ ও প্রণোদনায় হাফ টাইমের পর চেনা মূর্তিতে জেগে উঠল ব্রাজিল (Brazil Football Team)৷ ট্যাকটিক্যাল সুইচ করলেন অব্যর্থ৷ যেমনটা এতদিন করে এসেছেন এসি মিলানে৷ রিয়াল মাদ্রিদে৷ বায়ার্ন মিউনিখে৷ চেলসিতে৷ জিতেছেন খেতাব৷ স্মরণীয় দ্বৈরথ৷ তবু অদ্ভুত এক আত্মনিয়ন্ত্রণে তিনি দু:খেষু অনুদ্বিগ্নমনা! আশ্চর্য তাঁর বীতস্পৃহা৷ বিপর্যয়ে ভেঙে পড়েন না৷ সাফল্যে আকাশে ওড়েন না। পা সতত মাটিতে৷ দীর্ঘ উল্লম্ফন নয়৷ ধাপে ধাপে সিঁড়ি ভাঙার পক্ষপাতী। একটা গোটা দেশের ফুটবল সিস্টেম কার্যত যখন গৃহযুদ্ধে পুড়ছে, সবকিছু ছন্নছাড়া, এলোমেলো, বছর একুশের ছোকরা জাপানি প্রতিপক্ষও (Brazil vs Japan) 'ব্রাজিল তো পরাজিত দৈত্য' বলে দুয়ো দিচ্ছে, মাঠের খেলায় আকস্মিক বিপর্যয়ে গোল খেয়ে দিকভ্রান্ত গোটা দল, সেই পরিস্থিতিতে তাঁর সর্বোচ্চ বিকলন বলতে একটি ভুরুর চড়ে যাওয়া, অন্যটির নেমে যাওয়া৷ আর শারীরিক অস্থিরতার প্রমাণ? নিবিড় মনে চুইং গাম চিবোনো!

গতরাতে জাপানের বিরুদ্ধে ঠিক এই দুটোই ঘটল। একবারও অস্থির হলেন না৷ ধৈর্য হারালেন না৷ হাফটাইম টিম টকে যথোপযুক্ত নির্দেশ দিলেন। আর ট্যাকটিক্যাল সুইচ করলেন খানকয়েক৷ যার অন্যতম ৪-৩-৩ বদলে ৪-২-৪-এ সরে যাওয়া৷ ফুটবলদুনিয়া সাক্ষী, অ্যান্সেলোত্তির ভুরু চঞ্চল মানেই ঝড় আসন্ন! আর হল-ও তাই! সেকেন্ড হাফে জাপানের দুর্ভেদ্য রণকৌশল ভেঙে খানখান৷ পরিবর্ত হিসেবে নামলেন যিনি, সেই গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলিই লিখলেন শেষ পরিচ্ছেদটুকু!

প্রথমার্ধে জাপানি ফাঁদ

খেলার প্রথম ৪৫ মিনিটে একচ্ছত্র দাপট। ম্যাচটা জাপানই খেলছিল। ৫-৪-১ রক্ষণ এতটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ, যে ভিনিসিয়াস জুনিয়র বল পেলেই সামনে দু'জন, কখনও তিনজন। ডানদিকে রিতসু দোয়ান, ভিতরে তাকেহিরো তোমিয়াসু—দু'জনে পালা করে চেপে ধরছিলেন। ফলে ব্রাজিলীয় উইঙ্গারকে বারবার মাঝমাঠে নেমে বল নিতে হল, যেখানে তিনি মোটেও বিপজ্জনক নন।

পাশাপাশি জাপানের প্রেসিং একই রকম কার্যকর। গোলের আগে কাইশু সানো যেভাবে দানিলোর ভুল পাস কেটে বল নিয়ে কাসেমিরোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন, সেটাই ফার্স্ট হাফে ম্যাচের আসল ছবি। ৩৪ বছরের ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার দৌড়ে তরুণ সানোর সঙ্গে পেরে ওঠেননি। আগেই হলুদ কার্ড দেখে ফেলেছেন। তাই ঝুঁকি নিয়ে ফাউলও করতে নাচার। ফায়দা তুলে জাপান এক গোলে এগিয়ে যায়।

হাফটাইমে অ্যান্সেলোত্তির চাল, বদলে গেল ম্যাচের ছবি

অনেকেই ভেবেছিলেন, ব্রাজিল নিয়ন্ত্রণ আনতে সেকেন্ড হাফের শুরুতেই আরও একজন মিডফিল্ডার নামাবে। কিন্তু অ্যান্সেলোত্তি দুর্দান্ত ‘ব্লাফে’ ঠিক উল্টোটা করলেন। লুকাস পাকেতা চোট পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর নামালেন এনড্রিককে। কাগজে-কলমে দল বদলে গেল ৪-২-৪-এ!

শুনতে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল জাপানের রক্ষণকে আরও স্ট্রেচ করে দেওয়া। ভিনি ও রায়ানকে দুই প্রান্তে একেবারে লাইনের উপর রেখে দিলেন। ফলে জাপানের পাঁচ ডিফেন্ডার আর আগের মতো মাঝখানে গাদাগাদি করে থাকতে অপারগ। এতে উইং খুলে গেল। ক্রস আসতে শুরু করল। জাপানের প্রেসিংও আগের মতো ধারালো রইল না।

এই বদলটুকুই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়। একের পর এক বল ঢুকতে থাকে বক্সে। জাপানের রক্ষণ প্রথমবার সত্যিকারের চাপে।

ভুল শুধরালেন কাসেমিরো, নায়ক মার্টিনেলি 

প্রথমার্ধে গোল হজমের খলনায়ক কাসেমিরো। দ্বিতীয়ার্ধে তিনিই নায়ক। সমতা ফেরালেন। গ্যাব্রিয়েলের ভাসানো ক্রসে নিখুঁত হেড। প্রিমিয়ার লিগে গত সিজনে সবচেয়ে বেশি হেডে গোল কাসেমিরোর। সেই অস্ত্রই কাজে লাগালেন। তারপর শুরু ভিনিসিয়াস শো। প্রথমার্ধে এক-দু’বার ঝলসে ওঠা বাদ দিয়ে দৃশ্যত ম্রিয়মাণ ব্রাজিলীয় তারকা এবার ডান-বাম বদলে বারবার ওয়ান-টু-ওয়ান ডুয়েলে বিপজ্জনক। একবার তোমিয়াসুকে নাটমেগ করে, কাইশু সানোকে কাটিয়ে তাঁর শট পোস্টে ঠেলে দেন জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকি। গোটা টুর্নামেন্টে অন্যতম সেরা সেভ।

কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল না। বদলি হিসেবে নামা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলিকে একটু ভিতরের দিকে খেলতে বলেছিলেন অ্যান্সেলোত্তি। সেই সিদ্ধান্তেই সোনা ফলল। যোগ করা সময়ে গোলমুখের ভিড়ে ঠিক জায়গায় হাজির হয়ে ম্যাচ জেতানো গোলটি করে দিলেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড। এই জয় শুধু শেষ ষোলো নয়, একজন কোচের দর্শনের সাফল্যও বটে। হেরে গেলে ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ ব্যর্থতার মুখে পড়ত ব্রাজিল। প্রশ্নবিদ্ধ হত কার্লোকে বিদেশি কোচ হিসেবে আনার সিদ্ধান্তও। কিন্তু অভিজ্ঞ ম্যানেজার বুঝিয়ে দিলেন, ম্যাচটা ৯০ মিনিটের। প্রথম ৪৫ মিনিটে সমস্যা দেখা দিলে দ্বিতীয় ৪৫ মিনিটে তার সমাধানও বের করা সম্ভব। আতঙ্ক নয়, পর্যবেক্ষণ। আবেগ নয়, সিদ্ধান্ত। এটাই তাঁর ফুটবল-দর্শনের সারাৎসার!

ম্যাচ শেষে ‘ডন কার্লো’ জানালেন, বিশ্বকাপে কোনও দলই স্পষ্ট ফেভারিট নয়। এই ব্রাজিলও এখনও নিখুঁত নয়। কিন্তু তারা লড়াই করতে জানে। সবচেয়ে বড় কথা, বেঞ্চে এমন একজন আছেন, যিনি ম্যাচ চলাকালীন দাবার ছক বদলে দিতে দড়। গতকাল জাপান হৃদয় জিতেছে। তাদের পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, দৌড়—সবই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয় একটি সিদ্ধান্ত, একটি বদলি, কিংবা একটি ট্যাকটিক্যাল সুইচ।

হিউস্টনের ময়দানে সেই সুইচের নাম—কার্লো অ্যান্সেলোত্তি!

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User