অযোধ্যার হোটেলে গা ঢাকা দিয়েছিলেন দেবরাজ! প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কোন সূত্র ধরে তাঁকে ধরল পুলিশ?
পুলিশ সূত্রে খবর, উত্তর ২৪ পরগনার রাজারহাট-গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা দেবরাজের সঙ্গে বাঘমুণ্ডি ও অযোধ্যা পাহাড় এলাকার স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের ভাল যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্র ধরে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে গোয়েন্দারা জানতে পারেন যে, দেবরাজ সেখানেই গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন।
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তোলাবাজির অভিযোগে বুধবার গ্রেফতার করা হয়েছে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তীকে। কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হতেই রাজ্য পুলিশের এসটিএফ (STF) এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের যৌথ অভিযানে প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাকে পুরুলিয়া থেকে ধরা হয়। সূত্রের খবর, অযোধ্যা পাহাড়তলি এলাকার একটি হোটেলে আত্মগোপন করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। বৃহস্পতিবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হবে।
পুলিশ সূত্রে খবর, উত্তর ২৪ পরগনার রাজারহাট-গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা দেবরাজের সঙ্গে বাঘমুণ্ডি ও অযোধ্যা পাহাড় এলাকার স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের ভাল যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্র ধরে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে গোয়েন্দারা জানতে পারেন যে, দেবরাজ সেখানেই গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। এর পরেই একটি বিশেষ টিম তৈরি করে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দেবরাজের বিরুদ্ধে বাগুইআটি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন কেষ্টপুরের প্রোমোটার। বিধাননগর এলাকায় সিন্ডিকেট চালানো, তোলাবাজি, জমির বেআইনি কারবার এবং ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার মামলাতেও (2021 Post Poll Violence) তিনি অন্যতম অভিযুক্ত। এর আগে হাইকোর্টে আইনি রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারে তাঁর স্ত্রী অদিতি মুন্সিকে (Aditi Munsi) আগাম জামিন দিলেও সবদিক বিবেচনা করে দেবরাজের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল উচ্চ আদালত। তারপর থেকেই তাঁর গ্রেফতারির আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছিল।
বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারিরও মূল অভিযোগ ছিল, গত পাঁচ বছরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেআইনিভাবে বিপুল সম্পত্তি বানিয়েছেন দেবরাজ এবং তাঁর স্ত্রী অদিতি মুন্সি। নির্বাচনের সময় নিজেদের আসল প্রতিপত্তি আড়াল করতে এবং হিসাব বহির্ভূত কালো টাকা সাদা করার উদ্দেশ্যে অন্তত ১০০ কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তি বেনামে ও আত্মীয়দের নামে তড়িঘড়ি হস্তান্তর করেছেন এই দম্পতি।
হাইকোর্টের জামিন মামলার শুনানিতে রাজ্যের আইনজীবীর তরফেও আদালতে একগুচ্ছ মারাত্মক তথ্য পেশ করা হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, রাজারহাট-নিউটাউন (Rajarhat-Newtown) ও লাগোয়া এলাকায় দেদার তোলাবাজি, প্রোমোটারদের হুমকি এবং জোর করে জমি দখলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার এই রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছেন দেবরাজ। শুধু তাই নয়, ভোটের ঠিক আগে আগে তাঁদের কালিম্পঙের একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট-সহ একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে সমস্ত টাকা রহস্যজনকভাবে অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও আদালতে দাবি করে রাজ্য।
রাজনৈতিক মহলে দেবরাজের উত্থান বেশ চমকপ্রদ। যুব তৃণমূল কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করলেও ২০১৩ এবং ২০১৫ সালের পুরসভা নির্বাচনে (Municipality Election) দলের টিকিট পাননি তিনি। যোগ দেন কংগ্রেসে। ২০১৫ সালে বিধাননগর পুরনিগমের ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কংগ্রেসের টিকিটে জিতে কাউন্সিলর হন। তবে পরবর্তীতে তিনি আবার তৃণমূলে ফিরে আসেন। স্ত্রী তথা প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট-গোপালপুর আসন থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। এবারেও তাঁকে টিকিট দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু বিজেপির তরুণজ্যোতি তিওয়ারির কাছে হেরে যান।
বর্তমানে দেবরাজ ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পত্তি এবং অর্থপাচারের (মানি লন্ডারিং) মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এই সবকটি মামলার তদন্ত করছিল বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট। আদালত রক্ষাকবচের আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর থেকেই পুলিশ তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল। অবশেষে পুরুলিয়া থেকে পুলিশের জালে ধরা পড়লেন তৃণমূলের এই দাপুটে নেতা, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)