আসানসোলে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়তে আগ্রহী বেদান্তা, ৮০ হাজার কোটি বিনিয়োগ করতে পারেন অনিল

আসানসোলে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ও ১০ হাজার কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নিয়ে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করলেন বেদান্তা চেয়ারম্যান অনিল আগরওয়াল।

Oct 29, 2026 - 16:31
আসানসোলে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়তে আগ্রহী বেদান্তা, ৮০ হাজার কোটি বিনিয়োগ করতে পারেন অনিল

বড়বাজারের তুলাপট্টিতে ছিল পরিবারের দোকান। কলকাতাতেই কেটেছে ছোটবেলার বেশ কয়েকটি বছর। সেই শহরে ফিরে এ বার বাংলায় বড় শিল্প গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন বেদান্তা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান অনিল আগরওয়াল (Anil Agarwal Vedanta)। বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে তাঁর বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। সূত্রের খবর, আসানসোলে (Asansol) অ্যালুমিনিয়াম কারখানা (aluminium smelter) গড়তে চায় বেদান্তা। প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী তারা।

কয়লার জোগান এবং চালু পরিকাঠামোর সুবিধা থাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির জন্য আসানসোলকেই সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে বেদান্তা। তা ছাড়া আসানসোলে গোষ্ঠীর প্রায় ৩০০ একর জমি রয়েছে। সেখানে কারখানা গড়া সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে প্রকল্পের জন্য আরও জমির প্রয়োজন হতে পারে।

অনিল আগরওয়াল জানিয়েছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফল অনুকূল হলে এবং সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া গেলে ৩ বছরের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলি চালু করা সম্ভব হতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীও বৈঠকে কর্মসংস্থানের বিষয়টিতেই বিশেষ জোর দিয়েছেন। নবান্ন সূত্রে খবর, অনিলকে তিনি বলেছেন, রাজ্যে ১০ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বেদান্তার বিবৃতিতেও বিনিয়োগ ও ১০ হাজার কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার কথা জানানো হয়েছে।

বাংলায় শিল্পে বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ানো রাজ্য সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন, তিনি শ্রমনিবিড় শিল্পে বিনিয়োগ টানতে আগ্রহী। সেই প্রেক্ষাপটে খনি ও ধাতুশিল্পের আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বেদান্তার আগ্রহ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আগরওয়াল।

অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও ভাবছে বেদান্তা। দুই ক্ষেত্র মিলিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। কয়লা ও জল পাওয়ার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং পরিকাঠামো—সব দিক খতিয়ে দেখেই এগোবে সংস্থা।

আসানসোলে বড় কারখানা হলে তার চারপাশে ছোট ও মাঝারি শিল্পের সুযোগও তৈরি হতে পারে। আগরওয়ালের বক্তব্য, অ্যালুমিনিয়ামকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নানা পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিতে পারবেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁর মতে, বড় শিল্পের সঙ্গে সরবরাহকারী সংস্থা ও ছোট উদ্যোগের যোগসূত্র তৈরি হলে কর্মসংস্থানের পরিসরও বাড়বে। 

বুধবার কলকাতায় ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স এবং তার ইয়ং লিডার্স ফোরামের অনুষ্ঠানেও বাংলার শিল্পসম্ভাবনার কথা বলেছেন বেদান্তা চেয়ারম্যান। দক্ষ কর্মী, মেধাসম্পদ এবং শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে রাজ্যের বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। বিনিয়োগ, উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারের সঙ্গে শিল্পমহলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

কলকাতার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেছেন অনিল। জন্ম পাটনায় হলেও তাঁর পরিবারের একাধিক প্রজন্মের বাস ছিল বড়বাজারে। তুলাপট্টির দোকানের পাশাপাশি উঠে এসেছে জৈন বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার স্মৃতি। বাংলায় বিনিয়োগের আগ্রহের সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত টানের কথাও বলেছেন তিনি। 

নবান্ন সূত্রে খবর, বৈঠকের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় শুভেন্দুর বক্তৃতার প্রশংসাও করেছেন আগরওয়াল। মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, লন্ডনে শিল্পপতি ও অনাবাসী ভারতীয়দের কোনও সভায় তাঁর বক্তব্য শুনতে চান তিনি। তবে এ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট সফরসূচির কথা জানা যায়নি।

ব্যবসার বিস্তারের নিরিখেও বেদান্তার আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালুমিনিয়াম, দস্তা, তেল ও গ্যাস, বিদ্যুৎ, লোহা-ইস্পাত এবং তামা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা রয়েছে গোষ্ঠীর। তার অন্যতম প্রধান সংস্থা বেদান্তা লিমিটেডের ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজস্ব ছিল ১ লক্ষ ৭৪ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। 

আইসিসির অনুষ্ঠানে আগামী দু’বছরে গোষ্ঠীর মুনাফা ২ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথাও বলেছেন আগরওয়াল। প্রাকৃতিক সম্পদে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশে উৎপাদিত ধাতু থেকে আরও বেশি মূল্যযুক্ত পণ্য তৈরির উপর জোর দিয়েছেন তিনি। টেলিভিশন, মোবাইল ও গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ব্যবহৃত বিশেষ কাচ তৈরির সম্ভাবনার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের প্রয়োজনও তুলে ধরেছেন। সংগঠনে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের কথাও বলেছেন বেদান্তা চেয়ারম্যান।

এখন নজর থাকবে আসানসোলের প্রস্তাব কত দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, জমি-পরিকাঠামো ও অনুমোদনের ধাপ পেরোয়, সে দিকে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য উঠে এসেছে, তার বাস্তব রূপ নির্ভর করবে সেই অগ্রগতির উপর।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0