নির্বাচন কমিশনে বিস্ফোরক মতবিরোধ! ১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি দুই কমিশনারের, বাংলার ভোটার নিয়েও প্রশ্ন
দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যা তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁদের না জানিয়েই নেওয়া হয়েছিল।
ভোটার তালিকায় নাম তোলা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারের ফর্ম বদল, ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, এমনকী পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের নাম পুনর্বহাল নিয়ে আপিল—নির্বাচন কমিশনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েই কমিশনের অন্দরে গুরুতর মতবিরোধ (rift in EC) তৈরি হয়েছিল। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত ভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। এমনই তথ্য উঠে এসেছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদনে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যা তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁদের না জানিয়েই নেওয়া হয়েছিল। কোনও কোনও পদক্ষেপকে তাঁরা ‘unauthorised’ এবং ‘illegal’ বলেও লিখিত ভাবে চিহ্নিত করেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, আপত্তিগুলির অনেকটাই সরাসরি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা, বাদ দেওয়া বা পুনর্বহালের মতো মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এক দিনেই চার বার আপত্তি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তদন্ত অনুযায়ী, জাতীয় স্তরে Special Intensive Revision বা SIR তিন নির্বাচন কমিশনারের তত্ত্বাবধানেই হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি নথিভুক্ত করেন সান্ধু ও জোশী। এমনকী একটি দিনেই চার বার আপত্তি জানানোর ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনটির জন্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দিল্লি, কলকাতা, গোয়া ও মুম্বইয়ের একাধিক আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলেছে এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ আদানপ্রদানের নথিও দেখেছে বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে এমন ধারাবাহিক মতপার্থক্য নজিরবিহীন।
নতুন ভোটারের Form 6 নিয়েই ‘বেআইনি’ অভিযোগ
বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন ভোটারদের Form 6 নিয়ে। চলতি বছরের জুলাইয়ে Form 6-এ নতুন একটি প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। আবেদনকারীর নিজের অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমা/নানা-নানির নাম আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হচ্ছিল।
কিন্তু তার আগেই মে মাসে বিবেক জোশী নথিতে মত দিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম সংশোধন না করলে এই ভাবে Form 6 বদল করা যায় না। সান্ধুও তাঁর সঙ্গে একমত ছিলেন। তার পরেও পরিবর্তনটি কার্যকর হয়। পরে ১৩ অগস্ট সান্ধু ওই পদক্ষেপকে ‘unauthorised and illegal’ বলে তা অবিলম্বে সরানোর কথা লিখেছিলেন।
ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কি দিল্লির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?
দ্বিতীয় বড় প্রশ্নটি ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সাধারণ ভাবে কোনও বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট Electoral Registration Officer বা ERO-র। কিন্তু দুই নির্বাচন কমিশনারের আশঙ্কা ছিল, সেই বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার বদলে ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
মে মাসে জোশী বিষয়টিকে “gradual centralisation of the electoral roll database” হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কারও ভোটার ডেটাবেস পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা অডিট করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অগস্টে সান্ধুও রাজ্য স্তরের নির্বাচন আধিকারিকদের ERONet-এ সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার না থাকার অভিযোগ নথিভুক্ত করেন।
এই IT ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ এতটাই বেড়েছিল যে দুই নির্বাচন কমিশনার আলাদা ভাবে ক্যাবিনেট সচিবের কাছেও বিষয়টি তুলেছিলেন বলে জানা গেছে।
বাংলায় ১৬ লক্ষের বেশি ভোটারের বিরুদ্ধে আপিল কার নির্দেশে?
এই গোটা প্রতিবেদনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে উঠে এসেছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন। SIR-এর পরে বাংলায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সম্প্রতি কমিশন আদালতকে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালগুলিতে প্রায় ৩৮ লক্ষ আপিল বিচারাধীন। তার মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আপিল করেছেন বাদ পড়া ভোটাররা নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য। অন্যদিকে ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে সেই সব ভোটারের বিরুদ্ধে, যাঁদের নাম বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
কিন্তু এই দ্বিতীয় শ্রেণির আপিলগুলি কারা করেছিল, সেই প্রশ্ন ওঠে।
সান্ধু অগস্টে কমিশনের আধিকারিকদের কাছে জানতে চান, কমিশনের হয়ে এই আপিল করার অনুমোদন কে দিয়েছিলেন এবং বাস্তবে কে আপিলগুলি দায়ের করেছিলেন। তাঁর নথিভুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি, জোশী বা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক—কেউই এই আপিলের ভিত্তি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।
গোয়াতেও ভোটার তালিকার সফটওয়্যার নিয়ে সমস্যার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে ERO-রা নথি পরীক্ষা করে ৯৭ জনকে ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্য বলে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু কমিশনের সফটওয়্যারে আগের সিদ্ধান্ত বদলে তাঁদের ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সময়মতো চালু হয়নি বলে প্রতিবেদনের দাবি। ফলে ওই ৯৭ জন চূড়ান্ত ভোটার তালিকার বাইরে থেকে যান।
এই মতবিরোধ গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act, 2023-এর Section 18 অনুযায়ী কমিশনের কাজ যত দূর সম্ভব সর্বসম্মত ভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ তিন সদস্যের কমিশনে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি কেবল ব্যক্তিগত মতভেদ নয়—কী ভাবে কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচন কমিশন কী বলেছে?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রশ্নপত্র পাঠিয়েছিল। দুই নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা জানতে চাওয়া হয়। সান্ধু ও জোশীর কাছেও পৃথক ভাবে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল। ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে পর্যন্ত কোনও পক্ষ থেকেই উত্তর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদপত্রটি।
সব মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—ভোটার তালিকা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের তিন সদস্যের মধ্যে দুই সদস্যই যদি বারবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান, তা হলে সেই আপত্তিগুলির নিষ্পত্তি কী ভাবে হয়েছিল?
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ১৬.১০ লক্ষ ভোটারের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপিল কে বা কার নির্দেশে করেছিল—সান্ধুর তোলা সেই প্রশ্নও নতুন করে তাৎপর্য পাচ্ছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)