পুজোর মুখে দ্রুত রোগা হওয়ার তাড়া? ক্র্যাশ ডায়েটে মারাত্মক ক্ষতি, কোন ভুল এড়াবেন?
পুজোর আগে দ্রুত রোগা হতে গিয়ে ক্র্যাশ ডায়েটের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করলেন ডায়টিশিয়ান রিয়া বোস। 'দ্য ওয়াল আরোগ্য' পডকাস্টে পুজোর দিনগুলিতে পেটের যত্ন ও সঠিক খাওয়াদাওয়ার টিপস।
আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের দেখা নেই কিন্তু ক্যালেন্ডার বলছে পুজো এসে গেছে। শরতের রোদ মেঘ সরিয়ে দেখাও দিচ্ছে মাঝে মধ্যে। পুজো মানেই মায়ের আগমনের সঙ্গে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল নিজেকে সেরা কিছু উপহার দেওয়া। হতে পারে তা কোনও মেকওভার বা পছন্দের জামা। হতে পারে বহুদিন ধরে ভেবে রাখা কোনও ট্রিপ বা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো একটা নিখাদ সন্ধে। এই সব কিছুর সঙ্গে বেশিরভাগ বাঙালির যেটা জড়িয়ে থাকে, তা হল পুজোয় একটু অন্যরকম দেখতে লাগা বা রোগা দেখানো। এই ভাবনা থেকে এখন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে ডায়েট খোঁজার হিড়িক, জিমে ভিড়, সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে দ্রুত রোগা হওয়ার রিল। আদৌ কি কয়েকদিনে ওজন কমানো সম্ভব? হুট করে ডায়েট শুরু করলে বা শরীর বুঝে ডায়েট না মেনে, বাজারচলতি কোনও ডায়েট ফলো করলে, ঠিক কী কী হতে পারে? জানালেন ডায়টিশিয়ান রিয়া বোস।
দ্য ওয়াল আরোগ্যর পডকাস্টে রিয়া বোস ডায়েটের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করেন। কথা হয় পুজোর আগে রোগা হওয়ার ট্রেন্ড নিয়ে। তাঁর মতে, এই ট্রেন্ড এখন শুধু পুজোর আগে নয়, যেকোনও বিশেষ অনুষ্ঠান বা জীবনের বড় কোনও ঘটনা, যেমন বিয়ে, জন্মদিন, এঙ্গেজমেন্ট, সন্তানের অন্নপ্রাশন-এসবের আগেও ফলো করা হয়। আধুনিক যুগে দ্রুত জীবন বদলায়, কারও হাতে সময় নেই, তাই সকলেই চান দ্রুত রোগা হতেও। কেউ সময় বেঁধে দেন, কেউ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওজনও। এতে মানসিক এবং শারীরিক দুই দিকেই প্রভাব পড়ে।
কী ধরনের সমস্যা হতে পারে কম সময়ে অতিরিক্ত ওজন কমাতে গিয়ে?
ডায়টিশিয়ান নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জানান, পুষ্টিগত দিক থেকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পুষ্টিতে ঘাটতির বিষয়টি বাইরে থেকে বোঝা যায় না ফলে ক্র্যাশ ডায়েট শুরুর কদিন পর থেকে চুল পড়ে যাওয়া বা স্কিন খারাপ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভেঙে যেতে পারে নখ, হারিয়ে যেতে পারে ত্বকের জেল্লা। এছাড়া সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটি হয়, তা হল এনার্জি হারিয়ে যাওয়া। বাইরে কাজে গেলে ঘুম পেতে পারে সারাদিন বা কিছুই ভাল না লাগতে পারে। এগুলো বোঝা যায় না কেন হচ্ছে কিন্তু নেপথ্যে ক্র্যাশ ডায়েটের হাত থাকতে পারে বলে মনে করছেন ডায়টিশিয়ান।
দুর্গাপুজোর আগে রোগা তাহলে রোগা হওয়া যাবে না?
ডায়টিশিয়ান রিয়া বোস জানাচ্ছেন, রোগা চাইলেই হওয়া যায়। প্রথমে দরকার মানসিক দৃঢ়়তা, নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেকে ভাল রাখার অঙ্গীকার। তারপর যেকেউ যেকোনও সময় সঠিক ডায়েট করলেই ওজন কমাতে পারেন। তবে, সময় ধরে ওজন কমানো ঠিক নয়। ফলে যাঁরা ডায়েট করছেন, তাঁরা পুষ্টিবিদদের পরামর্শে একটু এদিক ওদিক করে সামান্য বেশি ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিতে পারেন। আর যাঁরা ডায়েট শুরু করবেন ভাবছেন, তাঁদের জন্য ডায়টিশিয়ানের পরামর্শ, শুরু করে ফেলুন, পুজোর আগে একটু হলেও নিশ্চয়ই কমবে। তবে, তিনি এক্ষেত্রে উল্লেখ করে দেন, 'যদি PCOS-এর মতো কোনও শারীরিক সমস্যা থাকে, তাহলে ওজন কমতে সময় লাগে। ফলে ওজন কমবেই এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেন না।'
ডায়েট ও দুর্গাপুজোর পাঁচদিন
ডায়েট শুরু করলেও দুর্গাপুজোয় অনেকেই হারিয়ে ফেলেন নিয়ন্ত্রণ। প্যান্ডেল হপিংয়ের সময় খিদে পেলে ফুচকা থেকে আইসক্রিম, মাঝরাতে বিরিয়ানিও বাদ যায় না। আবার বাড়িতে থাকলেও পাঁচদিনে নো ডায়েট। কখনও মাটন, কখনও বিরিয়ানি, কখনও খিচুরি! এখন এই পাঁচদিন বছরে একবারই আসে, তাই পুজোর দিনে ডায়েটের পক্ষে নন রিয়া বোস। তিনি পাঁচদিনই চিট-ডে পালনের কথা বলছেন। কিন্তু সতর্ক করেছেন, খাবার পরিমাণ নিয়ে।
একজন মানুষ পর পর তিনদিন বিরিয়ানি খেতে পারেন কিন্তু মাথায় রাখতে হবে পরিমাণ। একজন সুস্থ মানুষ যতটুকু খেতে পারেন, ততটুকুই খাওয়া উচিত বলে জানাচ্ছেন ডায়টিশিয়ান। অর্থাৎ পেট ভরে বিরিয়ানি খাওয়া ঠিক হবে না। বুঝে খেতে হবে। বিরিয়ানি খেলে সঙ্গে ঠান্ডা মিষ্টি পানীয় বা মিষ্টি ও অন্যান্য জাঙ্ক এড়িয়ে যাওয়া ভাল। একটা মিল ভারী খেলে বাকিগুলো অবশ্যই ব্যালেন্স করে খেতে হবে, তাহলে ওজন শুধু নয়, শরীরে কোনও চাপ পড়বে না।
লিভারে বছরে ৩৬১ দিন একরকম খাবার দিয়ে হঠাৎ পাঁচদিন চারবেলা ভারী খাবার দিলে লিভারকে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। এর ফলে পেট ব্যথা, পেট খারাপ হওয়া বা গ্যাম-অম্বল-বমি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ডায়টিশিয়ান বলছেন, এমনিতেই দুর্গাপুজোর সময় ঠিক মতো ঘুম হয় না,খাওয়ার সময়ও ঠিক থাকে না তাই লিভারকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে লাভ নেই।
পুজোয় জাঙ্ক খেয়েও পেট ভাল রাখার টিপস
পুজোয় পেট ভাল রাখার টিপস হিসেবে বিভিন্ন ডিটক্স ওয়াটারের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সকালে উঠে খালি পেটে ওই জল খেয়ে নিলে গ্যাস-অম্বলের সমস্যা কম হবে। কোন কোন ডিটক্স ওয়াটার খাওয়া যেতে পারে? উত্তরে ডায়টিশিয়ান জানান, যেকোনও ডিটক্স ওয়াটার। খুব কষ্ট করতে না চাইলে জিরে ভেজানো জল, মেথি ভেজানো জল বা ধনে ভেজানো জল খাওয়া যেতে পারে। ঘুম থেকে উঠে জলটা খেয়ে অন্যান্য খাবার খেলে হজমে সমস্যা হবে না। লিভার থেকে টক্সিনও বেরিয়ে যাবে।
পুজোর ডায়েট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ডায়টিশিয়ান রিয়া বোস বার বার সতর্ক করেছেন নিয়মে ফেরা নিয়ে। অর্থাৎ যাঁরা পুজোর আগে ডায়েট শুরু করছেন তাঁদের পুজো শেষেই ফিরতে হবে নিয়মে। না হলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। পুজোয় আনন্দ করা হোক মূল মন্ত্র কিন্তু শেষ হলেই ফিরতে হবে পুরনো ছন্দে। অফিস বা অন্যান্য কাজের সময় নিয়ম মেনে ডায়েটও করতে হবে।
সবচেয়ে ভাল ডায়েট প্ল্যান কী?
শরীর ভাল থাকবে, ওজনও কমবে, এমন ডায়েট একজন ডায়টিশিয়ানই বলতে পারেন। বিএমআই মেনে তাই ডায়েট চার্ট তৈরি করতে হবে। সেটা মেনেই এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে এদিক-ওদিক ডায়টিশিয়ানই করে দেবেন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)