‘প্রশ্নফাঁস আটকানোর ভাবনা নেই, সবটাই শুধু শাস্তির ভয়!’ নতুন বিলের কড়া সমালোচনা সিজেপির

সিজেপির মুখপাত্র বলেন, "প্রশ্নফাঁস কীভাবে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে এবার খোলা মনে ভাবুন। আমাদের দেওয়া ৫ দফার দাবি সনদের দিকে নজর দিন। তাড়াহুড়ো করে বা খেয়ালখুশি মতো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। কারণ এটা দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিষয়।"

Jul 30, 2026 - 16:25
0 0
‘প্রশ্নফাঁস আটকানোর ভাবনা নেই, সবটাই শুধু শাস্তির ভয়!’ নতুন বিলের কড়া সমালোচনা সিজেপির

পরীক্ষা হওয়ার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস (NEET UG row) হয়ে যাওয়ার ব্যাধি রুখতে সম্প্রতি লোকসভায় পাস হয়েছে ‘পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ (Anti-Paper Leak Bill)। কিন্তু কেন্দ্র সরকারের তৈরি এই নতুন আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলের স্পষ্ট বক্তব্য, এই আইনে কেবল পরীক্ষা শেষের পর অপরাধীদের সাজা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে গলদের কারণে বারবার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, তা মূল থেকে উপড়ে ফেলার বা আটকানোর কোনও সঠিক চিন্তাভাবনা এই বিলে নেই।

সম্প্রতি নিট-ইউজি (NEET-UG) কেলেঙ্কারির জেরে তীব্র জলঘোলা তৈরি হয় দেশজুড়ে। সেই বিতর্কের জেরে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan resignation)। এর পরই তড়িঘড়ি লোকসভায় এই প্রশ্ন ফাঁস বিরোধী সংশোধনী বিল পাস করায় মোদী সরকার। যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের জেল এবং ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

"শাস্তি নয়, প্রশ্নফাঁস আটকাতে কী করছেন বলুন!" কেন্দ্রকে তোপ আশুতোষের

বুধবার ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে সরকারের এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। তিনি বলেন, "আপনারা সবসময় প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরের ঘটনা নিয়ে কথা বলছেন! ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করা, কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি বা জরিমানার ভয় দেখানোর কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস যাতে প্রথম থেকেই আটকানো যায়, তার জন্য সরকার কী পদক্ষেপ করছে, তা নিয়ে বিলে একটা শব্দও নেই।"

প্রশ্ন ফাঁস রুখতে সিজেপির তরফে কেন্দ্রকে অবিলম্বে বেশ কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ করার দাবি জানানো হয়েছে। আশুতোষ রাঙ্কার মতে, কেবল কঠোর আইন এনে কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না, নজর দিতে হবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায়। তিনি জোর দেন -

  • এনটিএ-র (NTA) প্রশাসনিক কাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।
  • পরীক্ষার নির্দিষ্ট সূচি, ক্যালেন্ডার এবং সিলেবাস সংক্রান্ত সমস্ত তথ্যে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা আনতে হবে।
  • যে সমস্ত থার্ড পার্টি ভেন্ডর বা সংস্থাকে পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাদের ওপর কড়া নজরদারি চালাতে হবে। একবার কোনও ভেন্ডর ব্ল্যাকলিস্টেড (Blacklisted) হলে, তারা যাতে ঘুরপথে ফের সিস্টেমে না ঢুকতে পারে তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
  • জালিয়াতি রুখতে ফিজিক্যাল এবং ডিজিটাল, দু’ধরনের ব্যবস্থারই নিয়মিত অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সিজেপির মুখপাত্র বলেন, "প্রশ্নফাঁস কীভাবে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে এবার খোলা মনে ভাবুন। আমাদের দেওয়া ৫ দফার দাবি সনদের দিকে নজর দিন। তাড়াহুড়ো করে বা খেয়ালখুশি মতো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। কারণ এটা দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিষয়।"

অন্যদিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সরকারের উদ্দেশ্য ও নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও নীতি পরিষ্কার না থাকলে কেবল আইন তৈরি করে বা আইনি সংস্কার করে কোনও লাভ হবে না। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নতুন আইন নিয়ে এত ঢাকঢোল পেটানো সত্ত্বেও একটি প্রশ্ন ফাঁস মামলার ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের প্রথম শুনানি পিছিয়ে দিতে হয়েছে, কারণ আদালতে সিবিআইয়ের আইনজীবীই উপস্থিত ছিলেন না!

আইন সংশোধনে ঠিক কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?

উল্লেখ্য, সিজেপির নেতৃত্বে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের চরম প্রতিবাদের মুখে পড়ে গত ২৭ জুলাই লোকসভায় এই বিল পেশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁর দাবি ছিল, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার এই কড়া ব্যবস্থার পথে হেঁটেছে। এমনকি পরীক্ষা সংক্রান্ত মানসিক চাপের কারণে পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যাও নাকি আগের চেয়ে কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এই নতুন সংশোধনীতে মূলত ২০২৪ সালের ‘পাবলিক এগজামিনেশনস’ সংক্রান্ত আইনকে আরও কঠোর করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে থাকা সমস্ত অপরাধকে 'নন-বেলেবল' (জামিন অযোগ্য) এবং 'কগনিজেবল' বলে গণ্য করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে: আগে অনিয়মের দায়ে সর্বনিম্ন ৩ বছর ও সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেলের বিধান ছিল। এখন সর্বনিম্ন শাস্তি বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড। সঙ্গে জরিমানার অঙ্ক ১০ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে একধাক্কায় ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।

পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ক্ষেত্রে: পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ভেন্ডর বা সার্ভিস প্রোভাইডার দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের জরিমানার অঙ্ক ১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সংস্থাকে ৪ বছরের বদলে এক টানা ৮ বছরের জন্য যাবতীয় সরকারি পরীক্ষার কাজ থেকে নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকছে।

সংগঠিত চক্রের ক্ষেত্রে: অর্গানাইজড ক্রাইম বা আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস করার ঘটনা ঘটলে, সর্বনিম্ন শাস্তি ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করা হয়েছে। যেখানে জরিমানার অঙ্ক হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা।

এছাড়াও, নতুন সংশোধনী বিলে ১২এ (12A) এবং ১২বি (12B) নামে দু’টি একদম নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রথমবার তদন্ত শেষ করার একটা সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হল। কেন্দ্রের নির্দেশে সিবিআই বা সদ্য গঠিত স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) - যে সংস্থাই তদন্তের দায়িত্বে থাকুক না কেন, মামলা হাতে পাওয়ার ঠিক ২ মাসের মধ্যে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User