ভারতের ওপর আকাশছোঁয়া শুল্ক চাপানোই হল কাল! ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ক্ষুব্ধ আমেরিকা?
ভারতের পণ্যে আকাশছোঁয়া শুল্ক এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জেরে কি ক্ষুব্ধ আমেরিকার মানুষ? মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও ক্রমবর্মান অর্থনৈতিক উদ্বেগের মধ্যে ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তাঁর রাষ্ট্রপতি মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে ফলাফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান দল (Republican Party)। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বড় জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (Democratic Party)। সেনেটে ৫৪-৪৪ আসনে এগিয়ে থাকার পাশাপাশি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে অন্তত ৩০টি নতুন আসন দখল করেছে তারা।
সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটরা ২৪০-১৪৭ আসনে এগিয়ে রয়েছে, যদিও কিছু আসনের গণনা এখনও বাকি। এই জয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ভিত্তি জুগিয়েছে। নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তাঁর দলেরই সহ-সভাপতি জে ডি ভ্যান্স সহ একাধিক শীর্ষ রিপাবলিকান নেতা। তাঁদের মতে, ইরানে যুদ্ধ এবং ইজরায়েল সংক্রান্ত মার্কিন নীতিই রিপাবলিকান ভোটারদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পরাজয়ের আসল কারণ কেবল এটুকুই নয়, গত দুই বছর আগে ট্রাম্পকে সমর্থন করা ভোটাররাও এবার কেন তাঁর দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোড় আলোচনা।
টেক্সাসের রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজ ‘জর্জটাউন ব্লাড অ্যান্ড প্লাজমা রিসার্চ গ্রুপ’-এর তথ্য উল্লেখ করে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ লেখেন, ২০২৬ সালে মার্কিন নাগরিকরা ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি বার অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে প্লাজমা দান করেছেন, যা এক নতুন রেকর্ড। প্রতিদিন প্রায় ২ লক্ষ আমেরিকান শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গ্রোসারি কেনাকাটার খরচ মেটাতে নিজেদের রক্ত বা প্লাজমা বিক্রি করছেন।
রয়টার্স/ইপসোসের (Reuters/Ipsos) এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক খরচকে ভোটদানের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একইসঙ্গে প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প যে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর ভর করে প্রচার চালিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনিক বাজেটের সামনে এসে ধাক্কা খায়।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যে শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৫ এপ্রিল ২০২৫ থেকে তিনি অন্যান্য দেশ থেকে আসা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করেন। আমেরিকার দাবি ছিল, এর ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলি খেসারত দেবে। কিন্তু ‘কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি’-র গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবহন বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, বিদেশি রপ্তানিকারকরা মাত্র ৪ শতাংশ শুল্কের বোঝা সহ্য করেছেন, বাকি ৯৬ শতাংশ শুল্কই মার্কিন আমদানিকারক ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর এসে পড়েছে।
এই শুল্ক যুদ্ধের একটি বড় শিকার ভারত। প্রথমে ভারতীয় পণ্যে ২৫ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বসানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা জারি রাখায় অতিরিক্ত আরও ২৫ শতাংশ লেভি যোগ করা হয়, যার ফলে বহু ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট মার্কিন শুল্কের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মার্কিন বাজারে। ভারত থেকে তৈরি পোশাক এবং সুতি কাপড়ের ব্যাপক আমদানি থাকায় আমেরিকান খুচরা বিক্রেতারা মারাত্মক পাইকারি খরচের মুখে পড়েন। বিশ্ব জুয়েলারি বাজারে হিরের পলিশিংয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা ভারত থেকে আমদানি শুল্ক বাড়ায় মার্কিন জুয়েলার্সদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়। এছাড়া ভারতীয় বাসমতি চাল, মশলা, হিমায়িত চিংড়ি থেকে শুরু করে গাড়ির যন্ত্রাংশ—সবকিছুরই দাম লাফিয়ে বাড়ে আমেরিকান সাধারণ মানুষের জন্য। মার্কিন শুল্ক রাজস্ব ২০২৫ সালে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও বাস্তবে তা সাধারণ মানুষের ওপর বিক্রয় করের মতোই চেপে বসে।
সেনেটর ক্রুজ উল্লেখ করেছেন যে ক্যানসাস রাজ্যের ভোটারদের প্রধান সমস্যা ছিল জীবনযাত্রার খরচ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম (৩০.৬%), দুর্নীতি (১৮.৫%) এবং ইরান যুদ্ধের খরচ (১০.১%)। অর্থাৎ মার্কিন ভোটারদের মূল চিন্তার বিষয় ছিল প্রতিদিনের গ্রোসারি বিল, জ্বালানির দাম ও পারিবারিক বাজেট।
রিপাবলিকানদের মূল সমস্যা ছিল তারা সাধারণ আমেরিকানদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার আশ্বাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তাঁর নিজের কাজ ও মেয়াদের ওপর একধরনের ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোট হিসেবে দেখার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। মার্কিন জনগণ সেই গণভোটের রায় দিয়েছে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধেই, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের আধিপত্য কেড়ে নিয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0