শূন্যে ডিগবাজি, আত্মপ্রকাশ উড়ন্ত টেসলার! মাস্কের রোডস্টারের কেরামতির নেপথ্যে কোন বিজ্ঞান?
আগুনের শিখা ছাড়াই গাড়িকে ধাক্কা দিচ্ছে উচ্চচাপের গ্যাস। মহাকাশযানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগছে বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারে?
গাড়ি ছুটবে, বাঁক নেবে, প্রয়োজনে মুহূর্তে থামবে—এ সবই পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সেই গাড়ি যদি মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে ডিগবাজি খায়, তার পরে ফের নেমে আসে? ইলন মাস্কের নতুন টেসলা রোডস্টারের (Tesla Roadstar) প্রদর্শন সেই দৃশ্যই সামনে এনেছে। স্পেসএক্সের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তৈরি বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারটির এই কসরত ঘিরে প্রশ্ন—এ কি সত্যিই উড়ন্ত গাড়ির পথে নতুন পদক্ষেপ?
এই কেরামতির কেন্দ্রে রয়েছে গাড়ির বিভিন্ন দিকে বসানো বিশেষ থ্রাস্টার। সহজ করে বললে, এগুলি এমন যন্ত্র, যা প্রবল বেগে গ্যাস ছুড়ে দিয়ে উল্টো দিকে ধাক্কা তৈরি করে। তবে ‘রকেট প্রযুক্তি’ শুনে আগুনের শিখা আর ধোঁয়ার যে ছবি মনে আসে, এখানে বিষয়টি তা নয়। ব্যবহৃত হচ্ছে উচ্চচাপে সঞ্চিত গ্যাস।
গ্যাস বেরিয়ে গাড়িকে ধাক্কা দেয় কীভাবে?
একটি বেলুন ফুলিয়ে তার মুখ ছেড়ে দিলে সেটি ছুটে যায়। ভিতরের হাওয়া এক দিকে বেরোয়, বেলুনটি এগিয়ে যায় বিপরীত দিকে। থ্রাস্টারের কাজ বোঝার জন্য এই পরিচিত অভিজ্ঞতাটিই কাজে আসতে পারে।
এর পিছনে রয়েছে নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র—প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। গাড়ির ট্যাঙ্কে সঞ্চিত উচ্চচাপের গ্যাস ভাল্ভ খুললে নির্দিষ্ট নজল দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসে। তার প্রতিক্রিয়ায় গাড়ির উপর বিপরীত দিকে বল তৈরি হয়।
এই ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার’। প্রচলিত রাসায়নিক রকেটের মতো এর ভিতরে জ্বালানি পুড়িয়ে গরম গ্যাস তৈরি করা হয় না। আগে থেকে চাপ দিয়ে রাখা গ্যাসই কাজটি করে। মহাকাশযানের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণেও কোল্ড-গ্যাস প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।
ভারী গাড়ি মাটি ছাড়বে কোন জোরে?
গাড়িকে উপরে তুলতে হলে প্রথমে তার ওজনকে অতিক্রম করার মতো ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করতে হবে। নজল দিয়ে গ্যাস নীচের দিকে ছোড়া হলে বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় গাড়ি উপরের দিকে ধাক্কা পাবে। সেই ধাক্কা যথেষ্ট শক্তিশালী হলে চাকা মাটি ছাড়তে পারে।
তবে মাটি ছাড়া এবং শূন্যে একই উচ্চতায় স্থির থাকা আলাদা বিষয়। অল্প সময়ের লাফে গাড়ি উপরে ওঠার পর মাধ্যাকর্ষণের টানেই নীচে নামে। অন্যদিকে, একই উচ্চতায় ভেসে থাকতে হলে ঊর্ধ্বমুখী বলকে প্রায় একটানা গাড়ির ওজনের সমান রাখতে হবে।
অর্থাৎ, কয়েক মুহূর্তের জন্য গাড়িকে শূন্যে তোলা সম্ভব হলেই দীর্ঘক্ষণ উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে যায় না।
শূন্যে ডিগবাজি খেয়েও ভারসাম্য থাকে কীভাবে?
গাড়ির কোন জায়গায় কতটা ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে সেটি সোজা এগোবে, না ঘুরবে। ভরকেন্দ্র থেকে দূরে নির্দিষ্ট দিকে বল প্রয়োগ করা হলে ঘূর্ণন সৃষ্টিকারী প্রভাব বা টর্ক তৈরি হয়।
সহজ করে বললে, বিভিন্ন জায়গার থ্রাস্টার আলাদা সময়ে চালিয়ে গাড়ির নাক ওঠানো-নামানো কিংবা শরীর ঘোরানো সম্ভব। আবার উল্টো দিকে উপযুক্ত ধাক্কা দিয়ে সেই ঘূর্ণন কমানোও যায়।
মহাকাশযানে এই কাজের জন্য সেন্সর ও কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকে। পৃথিবীতে একটি গাড়ির ক্ষেত্রে এর সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণ, বাতাস এবং মাটিতে ফিরে আসার মুহূর্তের হিসাবও মেলাতে হয়।
ওঠার চেয়ে নামার অঙ্ক কেন কঠিন?
শূন্যে ওঠার পরে গাড়িকে ঠিক অভিমুখে ফেরানো এবং নামার গতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সময়ে বা ভুল দিকে থ্রাস্টার চললে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
নামার সময়ে যথাযথ ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কা পতনের গতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তার জন্য গাড়ির অবস্থান, ঘূর্ণনের হার এবং মাটি থেকে দূরত্ব সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনে কোনও কসরত সফল হওয়া এবং সাধারণ রাস্তায় বারবার নিরাপদে তা করা—দুইয়ের মধ্যে বড় প্রকৌশলগত ব্যবধান রয়েছে।
সঙ্গে গ্যাস থাকলেই কি যত খুশি উড়তে পারবে?
এখানেই এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। ট্যাঙ্কে গ্যাসের পরিমাণ নির্দিষ্ট। বারবার গ্যাস বেরিয়ে গেলে সঞ্চয় কমবে, চাপও বদলাবে। ফলে একই ক্ষমতায় অনির্দিষ্টকাল ধাক্কা তৈরি করা যাবে না।
গাড়িতে কম্প্রেসর বসিয়ে ফের গ্যাসের চাপ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা থাকলেও তাতেও সময় ও বিদ্যুৎ লাগবে। উচ্চচাপের ট্যাঙ্ক, ভাল্ভ এবং পাইপের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। দহন না থাকলেও ব্যবস্থাটি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
তা হলে কি উড়ন্ত গাড়ি এসে গেল?
এখনই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। রোডস্টারের প্রদর্শনে অল্প সময়ের জন্য শূন্যে ওঠা ও কসরত করার ক্ষমতা সামনে এসেছে। বিমান বা হেলিকপ্টারের মতো দীর্ঘক্ষণ আকাশপথে যাতায়াতের প্রমাণ এটি নয়।
টেসলা নতুন রোডস্টারের উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রেখেছে ২০২৮ সালে। তবে বাজারে আসা চূড়ান্ত গাড়িতে কোন বৈশিষ্ট্য থাকবে, কোথায় এবং কী শর্তে সেগুলি ব্যবহার করা যাবে, তা এখনও দেখার বিষয়।
মাস্কের এই পরীক্ষার আকর্ষণ তাই শুধু গাড়ির ডিগবাজিতে সীমাবদ্ধ নয়। মহাকাশযানের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে মাটির গাড়িতে প্রয়োগ করার চেষ্টা প্রযুক্তিগতভাবে চমকপ্রদ। সেই চমক দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে কি না, তার উত্তর দিতে হবে নিরাপত্তা ও বাস্তব পরীক্ষাকেই।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0