আমরা কি ক্ষমা করতে ভুলে যাব?
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতির দেহ মিলেছে ছাদে। স্ত্রী ও মেয়ের দেহ পড়েছিল সিঁড়িতে। ছেলের দেহ পাওয়া যায় খাটের নীচে। দেহগুলির অবস্থানই বলে দেয়, ওই রাতে বাড়িটির ভিতরে কী ভয়াবহ লড়াই হয়ে থাকতে পারে। চার জনেরই বাঁচার চেষ্টা করার কথা। স্বাভাবিক ভাবেই তাই প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, এত অল্প সময়ে চার জনকে খুন করা সম্ভব হল?
বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে গত কয়েকদিন ধরে উত্তাল থেকেছে আমাদের রাজ্যের সমাজমাধ্যমগুলি। প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বাংলাদেশে যাঁরা এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশের অতিসক্রিয়তাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তাঁরা সকলেই হিন্দু। সাধারণ মুসলমান থেকে লেখক-শিল্পীদের অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। আসলে মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলায় ‘লজ্জায়’ গভীর রাতে একই পরিবারের চার জনকে খুন—পুলিশের দেওয়া এই প্রাথমিক বয়ান সামনে আসার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। হত্যাকাণ্ডের বিবরণে আরও কিছু তথ্য সেই সংশয়কে বাড়িয়েছে। খুনের পর নিহতদেরই বাথরুমে গিয়ে অভিযুক্তদের স্নান করা, ফ্রিজ খুলে শসা-খেজুর খাওয়া, এমনকি বিদ্যুতের লাইন কেটে অন্ধকারে ঘরে সোনা পরীক্ষা করার মতো যেসব কথা পুলিশের তরফে সামনে এসেছে, সেগুলি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে বিস্তর। তার মধ্যেই পাওয়া গেছে আদালতে দুই অভিযুক্তের দায় স্বীকারের খবর। কিন্তু এরপরেও অনেকেই প্রশ্ন করছেন—এত দ্রুত তদন্তটির নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া কি আদৌ স্বস্তিদায়ক?
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতির দেহ মিলেছে ছাদে। স্ত্রী ও মেয়ের দেহ পড়েছিল সিঁড়িতে। ছেলের দেহ পাওয়া যায় খাটের নীচে। দেহগুলির অবস্থানই বলে দেয়, ওই রাতে বাড়িটির ভিতরে কী ভয়াবহ লড়াই হয়ে থাকতে পারে। চার জনেরই বাঁচার চেষ্টা করার কথা। স্বাভাবিক ভাবেই তাই প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, এত অল্প সময়ে চার জনকে খুন করা সম্ভব হল?
পুলিশের দাবি, রাতের শেষ দিকে পাশের নির্মাণাধীন ভবন টপকে ওই দুই তরুণ গণপতিদের ছাদে এসেছিলেন ইয়াবা সেবন করতে। শব্দ পেয়ে গণপতি বাইরে বেরিয়ে তাঁদের দেখে ফেলেন। তাঁকে খুন করার পর পরিবারের অন্য সদস্যরা একে একে বেরিয়ে এলে তাঁদেরও খুন করা হয়, কারণ তাঁরা অভিযুক্তদের চিনে ফেলেছিলেন। প্রশ্ন উঠেছে, ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতিদের ছাদই কেন? এই বাড়ির লাগোয়া নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনটি কি তুলনায় বেশি নির্জন ও নিরাপদ জায়গা ছিল না? যে ব্যক্তি গোপনে মাদক সেবন করতে চান, তিনি এমন একটি বাড়ির ছাদ বেছে নেবেন কেন যেখানে যে কোনও মুহূর্তে বাড়ির লোকজন তাঁকে দেখে ফেলতে পারেন? শুধু দেখে ফেলেছে বলে দু’জন মানুষ একটি পরিবারের চার জনকে খুন করবেন—এই মোটিভও কি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য? স্থানীয় সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থল দেখে জানিয়েছেন, পাশের নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলা থেকে গণপতিদের দোতলার ছাদে যাওয়া সম্ভব হলেও তা সহজ নয়। দুই বাড়ির মাঝখানে রয়েছে ফাঁকা জায়গা। তা হলে অভিযুক্তরা কী ভাবে সেখানে পৌঁছলেন? পুলিশের বয়ানে এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। মাদক সেবনের বয়ান নিয়েও প্রশ্ন আছে। ইয়াবা সেবনের জন্য আগুনের প্রয়োজন হয়—তাই খোলা ছাদ আদৌ কতটা উপযুক্ত জায়গা, সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
হত্যার ধরন নিয়েও রয়েছে অসঙ্গতি। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে গণপতিকে খুন করা হয়। তাঁর স্ত্রীকে গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। মেয়েকে শ্বাসরোধ করতে ব্যবহার করা হয় রশিও। প্রশ্ন উঠছে, রশিটি এল কোথা থেকে? শুধু মেয়ের ক্ষেত্রেই কেন রশির প্রয়োজন হল? গলায় রশি পেঁচানোর ফলে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার মতো কথাও ছড়িয়েছে। কিন্তু রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে চোয়াল ভাঙার কোনো লক্ষণ তাঁরা পাননি। অথচ তার আগে পুলিশ কমিশনারের ব্রিফিংয়ে চোয়াল ভাঙার কথা বলা হয়েছিল। তদন্তে এই ধরনের তথ্যের অসঙ্গতি অবশ্যই পরিষ্কার হওয়া দরকার।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এক জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও তাঁর স্ত্রী কি হত্যাকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেননি? চার জনকে একে একে খুন করা হল, অথচ তাঁদের কারও প্রতিরোধের চিহ্ন কি ছিল না? কেউ চিৎকার করেননি? অভিযুক্তদের শরীরে কোনো আঁচড় বা আঘাতের চিহ্ন নেই? থাকলে তার ফরেন্সিক প্রমাণ কোথায়? ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে যে মর্গটিতে ময়না তদন্ত হয়েছিল সেই মর্গের ডোম যতীন রায় গণপতি বাবুর স্ত্রী ও কন্যার দেহে ভয়ানক নির্যাতনের চিহ্ন পেয়েছিলেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জানানো হলে তিনি প্রথমে নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দিলেও এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে বলেন। ছোট্ট আয়ুশ যদি ঘুমিয়েই থাকে, তা হলে তাকে হত্যা করার প্রয়োজন কেন হল? পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে হত্যার সিদ্ধান্তের পেছনে ঠিক কী কারণ ছিল, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
অভিযুক্ত দুই তরুণের মাদকাসক্তি নিয়েও স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। সিদ্ধার্থের বাবা-মায়ের দাবি, তাঁদের ছেলে মাদকাসক্ত নন। যদি তা সত্যি হয়, তা হলে পুলিশের বর্ণিত মোটিভ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। পুলিশ চাইলে খুব সহজেই মাদক পরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। একই সঙ্গে, নিয়মিত ইয়াবা সেবনকারী একজন ব্যক্তি কী ভাবে নিয়মিত স্বর্ণালঙ্কারের দোকান বা মাছের আড়তে কাজ করতেন, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় দাবি করা হয়েছে, গ্রেফতারের সময় সিদ্ধার্থ যে-শার্টটি পরেছিলেন, উদ্ধার অভিযানের সময় স্থানীয় এক পুলিশ আধিকারিকের গায়েও একই ধরনের শার্ট ছিল। দু-জনের পোশাক এক হওয়া অবশ্যই অপরাধের প্রমাণ নয়। রংপুরের ডিবি-র ডিসি সনাতন চক্রবর্তীও বিষয়টিকে কাকতালীয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একই ডিজাইনের ওই পোশাক রংপুরে আরও অনেকের থাকতে পারে। পুলিশ কিন্তু চাইলেই জানতে পারে, ওই দু-টি শার্ট কোথা থেকে কেনা হয়েছিল। ফলে শার্ট দু-টর মিল প্রকৃতই কাকতালীয় কি না, তা যাচাই করে নেওয়া সম্ভব।
আরও একটি কথা জরুরি। সম্ভাব্য মোটিভকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত এগোনো যায় না। বরং ময়নাতদন্ত, ফরেন্সিক পরীক্ষা, ঘটনাস্থলের নমুনা, অভিযুক্তদের শরীর ও পোশাক, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ—সব কিছুকে পাশাপাশি রেখে একটি নির্ভরযোগ্য টাইমলাইন তৈরি করা দরকার।
এতগুলো প্রশ্ন উঠছে তার কারণ বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। এরই প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হিন্দুরা আজ ওই দেশে সংখ্যার হিসেবে মাত্র সাত শতাংশ। ২০২৪ সালের ৫ অগস্টের পর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বহু অভিযোগ সামনে এসেছে। রংপুরেই গত বছর দুই হিন্দু ভায়রা ভাইকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহে দীপু দাসকে পিটিয়ে এবং পরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনাটিও বেশিদিন আগের নয়। কাজেই গণপতি-পরিবারের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সম্পত্তি দখল বা সংখ্যালঘু পরিবারকে উচ্ছেদের অপইচ্ছার কোনো যোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। এর অর্থ এই নয় যে গণপতি পরিবারের হত্যাকে এখনই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর ঘটনা বলে চিহ্নিত করতে হবে। বরং ঠিক উল্টোটা। কোনও সম্ভাবনাকেই আগেভাগে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না—মাদক, চাঁদাবাজি, সম্পত্তি দখল, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ—সব সম্ভাবনাই প্রমাণের নিরিখে যাচাই করতে হবে।
প্রতিবেশী দেশে কিছু ঘটে গেলে আমাদের দেশে তার প্রতিক্রিয়া হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক, বিশেষ করে সেই দেশটি যদি একসময় আমাদের দেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়। কাজেই, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ড যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বিচলিত করবে, তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্রে রেখে যেভাবে আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সমাজ মাধ্যমে আক্রমণ করা হচ্ছে সেটিও কি কাঙ্ক্ষিত? আমাদের দেশেও কি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয় না? আক্রমণের চরিত্র অনেক সময় এলাকাভিত্তিক। যে-এলাকায় যে-সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু তাদের হাতেই ওই অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টি মাঝেমাঝেই আক্রান্ত হয়।
আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। অতীত নিশ্চয়ই একক মানুষ, সমষ্টি এবং দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অতীত কেবলই প্রতিহিংসাকে লালন করার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যাতে অতীতের ভুলগুলির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এই প্রশ্নও করা উচিত যে, যে-দেশে গৌতম বুদ্ধ আর শ্রীচৈতন্যর জন্ম, সেই দেশের মানুষ হিসেবে আমরা কি ক্ষমা করতে ভুলেই যাব? প্রশ্নটা কিন্তু দুই বাংলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এখানে আরও একটি কথা বলার রয়েছে। ক্ষমাকে তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেখেছেন যাঁরা তাঁদের একজন হলেন হানা আরেন্ট, আরেকজন জাক দেরিদা। দু-জনেই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন সভ্যতার অগ্রগতিতে ক্ষমা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমার কথা বলেছিলেন যে হানা আরেন্ট, তিনি ছিলেন একজন ইহুদি। ১৯৩৩ সালে ইহুদি বিদ্বেষ নিয়ে ‘অবৈধ’ গবেষণা করার জন্য গেস্টাপো তাঁকে কিছুদিন কারারুদ্ধও রেখেছিলেন। হিটলারের ইহুদি নিধনকে প্রত্যক্ষ করা এই ইহুদি বিদুষী কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমার পক্ষেই কলম ধরেছিলেন। প্রায় একই অবস্থান ছিল জাক দেরিদারও। ক্ষমার পক্ষ নিয়েই দেরিদা বলেছিলেন ক্ষমাকে হতে হয় নিঃশর্ত। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ক্ষমা করা মানে তাহলে কি অতীতকে ভুলে যাওয়া? তা কিন্তু নয়। আরেন্ট স্পষ্ট করেছিলেন যে ক্ষমা করা মানে ভুলে যাওয়া নয়। কিন্তু, ক্ষমা না করতে পারলে অতীতের একটি ঘটনার ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই ব্যক্তি বা জাতি আটকে পড়ে। নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব হয় না।
আরেন্ট অবশ্যই সমস্ত ধরনের অপরাধকে নিঃশর্তে ক্ষমা করার কথা বলেননি। বলেছিলেন কিছু কিছু অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। যেমন, পাকিস্তান ভারতের অন্তর্ভুক্ত কাশ্মীরকে দখল করতে চেয়ে যদি অভিযান চালায়, জঙ্গিরা যদি আমাদের দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, তাহলে এই অপরাধগুলিকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে। কিন্তু, প্রশ্ন হলো দেশভাগকে কেন্দ্রে রেখে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলিকে আমরা, এই উপমহাদেশের মানুষরা, কি ক্ষমার যোগ্য অপরাধ বলে বিবেচনা করতে পারি না? এক্ষেত্রে ভারতীয়দের অবশ্যই দায় একটু বেশিই। ভারত বিশ্বগুরু হতে চায়। ২০৪৭ সালে ভারত নিজেকে বিকশিত ভারত হিসেবে বিশ্বের দরবারে পেশ করতে চায়। অতীত তাকে যদি অনবরত পেছনদিকে টানতে থাকে, তাহলে সে সামনে এগিয়ে যাবে কীভাবে?
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)