আরশদের পতন একটা আয়না মাত্র! পাকিস্তানের গোটা ক্রীড়া পরিকাঠামোই ভেন্টিলেশনে ধুঁকছে
প্যারিসে অলিম্পিক্স সোনা জয়ের দু'বছর পর গ্লাসগোয় চূড়ান্ত ব্যর্থ আরশদ নাদিম। তাঁর এই পতন আসলে পাকিস্তানের সামগ্রিক ক্রীড়া পরিকাঠামোরই বেহাল দশার প্রতিচ্ছবি। পড়ুন বিস্তারিত।
ঠিক দু'বছর আগের কথা। অগস্টে প্যারিস অলিম্পিক্সের মঞ্চে বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সকে রীতিমতো চমকে দেন এক পাকিস্তানি তরুণ। ছ'টি থ্রোয়ের মধ্যে তাঁর ছোড়া বর্শা দু'বার ৯০ মিটারের গণ্ডি পেরিয়ে উড়ে গিয়েছিল। ভারতের 'সোনার ছেলে' নীরজ চোপড়া (Neeraj Chopra) সে বার রুপোতেই সন্তুষ্ট থাকেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানের ক্রীড়া ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় এবং উজ্জ্বল মুহূর্তটি উপহার দিয়ে সোনার পদক ছিনিয়ে নেন আরশদ নাদিম (Arshad Nadeem)।
মাত্র দু'বছর পেরোতে না পেরোতেই ছবিটা সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছে। ফর্ম হাতড়ে বেড়াচ্ছেন আরশদ। প্যারিসে জ্বলে ওঠা সেই অদম্য অ্যাথলিট এখন যেন অতীতের ছায়ামাত্র। গ্লাসগোর মঞ্চেও চূড়ান্ত ব্যর্থ তিনি। নিজের হারানো ছন্দ ফিরে পেতে মরিয়া লড়াই চালাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরশদের এই পতন আসলে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন ক্রীড়া বিশ্লেষকের চোখে দেখলে বোঝা যায়, এটি পাকিস্তানের সামগ্রিক ক্রীড়া জগতের এক গভীর সংকটেরই সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। যা এখন কার্যত সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে।
'আমি আরশদ নাদিম...'
দিনকয়েক আগের ঘটনা। জ্যাভলিন কোয়ালিফায়ারের দিন মিক্সড জোনে আরশদকে প্রশ্ন করতে এগিয়ে আসেন এক পাকিস্তানি সাংবাদিক। আর প্রথমেই তাঁকে বলা হয় দর্শকদের কাছে নিজের পরিচয় দিতে!
একবার ভাবুন তো, কোনও ভারতীয় সাংবাদিক কি নীরজকে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করতে পারেন? আরশদ তর্কাতীতভাবে পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা অ্যাথলিট। খোদ অলিম্পিক্স চ্যাম্পিয়ন। অথচ কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁকে যদি নিজের দেশের সংবাদমাধ্যমের কাছেই পরিচয় দিতে হয়, তবে বুঝতে হবে সেই দেশের ক্রীড়া পরিকাঠামোয় (Sports Ecosystem) বড়সড় ঘুণ ধরেছে৷ প্যারিসে সোনা জেতার পর যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, সেটাকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রতিভা তুলে আনার কোনও চেষ্টাই করেনি সে দেশের প্রশাসন।
ধারাবাহিকতার অভাব ও নীরজের উত্থান
প্যারিসে আরশদের সেই ৯৩ মিটারের বেশি থ্রো এককথায় অসাধারণ। পারফরম্যান্সের বিচারে গেমসের অন্যতম সেরা। কিন্তু তারপর থেকেই শুরু ধারাবাহিক পতন। আর এখানেই নীরজ চোপড়ার সঙ্গে তাঁর মূল ফারাক।
আসলে ভারতীয় তারকাকে অনন্য করে তুলেছে তাঁর ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব। গত সাত-আট বছর ধরে তিনি শীর্ষস্তরে দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। ২০২৫ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়া প্রায় প্রতিটি টুর্নামেন্টেই পোডিয়াম ফিনিশ। এটাই হল আসল সাফল্য। গ্লাসগোতেও নীরজ কামব্যাক করে পদক জিতেছেন। আর আরশদ প্রথম আটজনের মধ্যেও জায়গা ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ। একটা বড় সাফল্যের পর নিজেকে সেই উচ্চতায় ধরে রাখার যে মানসিক কাঠিন্য প্রয়োজন, সেখানেই চূড়ান্ত অসফল পাক জ্যাভলিন থ্রোয়ার।
ক্রিকেট মাঠেও ফিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী
শুধু অ্যাথলেটিক্স নয়। পাকিস্তানের পুরুষ ও মহিলা ক্রিকেট দলও এখন নিজেদের সোনালি অতীতের কঙ্কাল মাত্র। ক্রিকেট বোর্ডের অন্দরে ডামাডোল, ঘনঘন অধিনায়ক ও কোচ পরিবর্তন—এসবই আসলে কাঠামোগত পচনের স্পষ্ট লক্ষণ। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে আমরা যতই উন্মাদনা তৈরি করি না কেন, বাস্তবটা সবাই জানি। এখন ১০০টা ম্যাচ হলে ভারত হয়তো ৯৫টাতেই অনায়াসে জিতবে (Pakistan Cricket)। সেই পুরনো রেষারেষি আর লড়াইয়ের ঝাঁজ এখন উধাও। বিশ্বক্রিকেটের জন্য এটা মোটেও ভাল লক্ষণ নয়।
মেয়েদের ময়দানের অবস্থাও তথৈবচ। ফতিমা সানা নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের। মুনিবা আলিও প্রতিশ্রুতিমান। কিন্তু এঁদের বাদ দিলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শীর্ষ দলগুলোকে ধারাবাহিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো আর কোনও অস্ত্রই তাদের হাতে নেই। পরিকাঠামোর অভাবে নতুন প্রতিভাও উঠে আসছে না।
হকিতে চূড়ান্ত হতাশা ও অশনিসংকেত
একসময় বিশ্ব হকিতে দাপট দেখাত পাকিস্তান। অলিম্পিক্স আর বিশ্বকাপে তাদের ত্রিসীমানায় কেউ ঘেঁষতে পারত না। এখন সেই জৌলুস পুরোপুরি উধাও। প্রো লিগে (Pro League) চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে কার্যত উড়ে গিয়েছে তারা। এই রূঢ় বাস্তবটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। আরশদের ব্যর্থতার পাশাপাশি হকির এই পতন প্রমাণ করে, পাকিস্তানে সাফল্য উদ্যাপন করার মতো আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই। গোটা ক্রীড়ামহল যেন ভেন্টিলেশনে ধুঁকছে।
আর ঠিক এক মাস পরেই শুরু হবে এশিয়ান গেমস (Asian Games)। এখনই যদি পাকিস্তানের ক্রীড়ামহল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্লেষণ না করে, তবে আগামী দিনেও এই একই হতাশার গল্প লেখা হবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)