একসঙ্গে ৫টা কাজ সারতে ভীষণ দক্ষ? সাবধান! বদলে যাচ্ছে আপনার মেটাবলিজম, বাড়ছে ‘কর্টিসল বেলি’র ঝুঁকি

মহিলারা ঘর ও অফিস একসাথে সামলাতে গিয়ে মারাত্মক ‘টাইম পভার্টি’ বা সময়ের অভাবে ভুগছেন। সিনিয়র এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডঃ অঞ্জলি মালহোত্রার মতে, এই ক্রনিক স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা মেটাবলিক রেট কমিয়ে পেটে জেদি চর্বি বা ‘কর্টিসল বেলি’ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে।

Jul 02, 2026 - 13:39
0 0
একসঙ্গে ৫টা কাজ সারতে ভীষণ দক্ষ? সাবধান! বদলে যাচ্ছে আপনার মেটাবলিজম, বাড়ছে ‘কর্টিসল বেলি’র ঝুঁকি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আধুনিক ভারতীয় নারীর একটি চেনা ছবি আমাদের সমাজ প্রায়ই খুব গর্বের সাথে তুলে ধরে—যিনি একহাতে অফিসের কর্পোরেট ডেডলাইন সামলাচ্ছেন, অন্যহাতে সামলাচ্ছেন ঘরকন্না, সন্তানপালন এবং পরিবারের সদস্যদের যত্নআত্তি। এই সার্বক্ষণিক ‘মাল্টি-টাস্কিং’ (Multitasking) বা একই সঙ্গে একাধিক কাজ করার দক্ষতাকে একটি অতিমানবীয় ক্ষমতা বা ‘সুপারপাওয়ার’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রশংসার আড়ালে নারীদের শরীরে দানা বাঁধছে এক নীরব জৈবিক বিপর্যয়।

চিকিৎসা ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টাইম পভার্টি’ (Time Poverty) বা সময়ের চরম দারিদ্র্য। এর অর্থ হল —নিজের বিশ্রাম, ঘুম, বিনোদন এবং ন্যূনতম আত্মপরিচর্যার (Self-care) জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের তীব্র ঘাটতি। 

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বা টাইম ইউজ সার্ভে (TUS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে একজন মহিলা প্রতিদিন গড়ে ২৯৯ মিনিট অবৈতনিক ঘরোয়া কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষেরা করেন মাত্র ৯৭ মিনিট। এই ৩:১ অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

গুরুগ্রামের সিনিয়র এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডঃ অঞ্জলি মালহোত্রা (Dr. Anjali Malhotra) জানান, এই দীর্ঘমেয়াদী সময়ের অভাব কোনও সাধারণ ক্লান্তি নয়; এটি সরাসরি ভারতীয় নারীদের মেটাবলিজম বা বিপাক হারকে (Metabolic Rate) বদলে দিচ্ছে এবং জন্ম দিচ্ছে নানা ক্রনিক রোগের।

‘টাইম পভার্টি’ কীভাবে মেয়েদের মেটাবলিজমকে রিপ্রোগ্রাম করে?

যখন একজন নারী পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় পান না এবং সারাদিন কাজের মধ্যে ছোটেন, তখন তাঁর মস্তিষ্ক এই পরিস্থিতিকে একটি স্থায়ী পরিবেশগত হুমকি বা ‘ক্রনিক থ্রেট’ হিসেবে ধরে নেয়। এর ফলে শরীরের HPA Axis (Hypothalamic-Pituitary-Adrenal Axis) অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীর সর্বদা ‘ফাইট-অর-ফ্লাই’ (Fight-or-flight) মোডে চলে যায়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শরীরের হরমোন স্তরে:

কর্টিসলের আধিক্য: শরীরকে সচল রাখতে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে অনবরত ‘কর্টিসল’ (Cortisol) বা স্ট্রেস হরমোন নির্গত হতে থাকে।

পেশী ক্ষয় ও মেটাবলিক রেট হ্রাস: অতিরিক্ত কর্টিসল রক্তের শর্করার মাত্রা বাড়াতে শরীরের চর্বিহীন সুস্থ পেশী বা লিন মাসল মাস (Lean muscle mass) ভেঙে ফেলে। পেশী কমে যাওয়ার কারণে নারীদের ব্যাসাল মেটাবলিক রেট (BMR) মারাত্মকভাবে কমে যায়। মেটাবলিজম কমে গেলে শরীর বিশ্রামের সময় খুব কম ক্যালোরি পোড়ায়, ফলে ডায়েট নিয়ন্ত্রণ করেও ওজন কমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কর্টিসল ট্র্যাপ: ‘কর্টিসল বেলি’ ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স

হরমোনের এই ভারসাম্যহীনতা কেবল মেটাবলিজম কমায় না, বরং শরীরে ফ্যাট বা চর্বি জমার স্থানকেও পুরোপুরি বদলে দেয়। চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা PMC Public Health-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সময়ের অভাবে ভোগা নারীদের শরীর একটি বিশেষ চক্রে আটকে পড়ে:

১. কর্টিসল বেলি (Cortisol Belly) বা ভিসেরাল ফ্যাট

উচ্চমাত্রার কর্টিসল হরমোন শরীরকে সিগন্যাল দেয় ফ্যাট জমিয়ে রাখার জন্য। এই ফ্যাট মূলত জমে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চারপাশে (ভিসেরাল ফ্যাট) এবং তলপেটে। এর ফলে অনেক নারীর হাত-পা স্বাভাবিক বা রোগা হলেও পেটের চারপাশে এক ধরণের জেদি চর্বি জমে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে অনেকেই ‘কর্টিসল বেলি’ বলে থাকেন।

২. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (Insulin Resistance)

স্ট্রেসের কারণে রক্তে অনবরত গ্লুকোজ নির্গত হওয়ায় প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কার্যক্ষমতা হারায়।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের প্রধান লক্ষণ

  • মিষ্টি, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট (যেমন বিস্কুট, চিপস) বা প্রক্রিয়াজাত চিনি খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা (Cravings)।
  • ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই প্রচণ্ড ক্লান্তি এবং এনার্জি কমে যাওয়া।
  • ক্যালোরি ডেফিসিট বা কম খেয়েও ওজন কমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়া।
  • পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দ্রুত বিস্তার।

চিকিৎসকের পরামর্শ: সারভাইভাল মোডে থাকা শরীরকে সুস্থ করা যায় না

ডঃ অঞ্জলি মালহোত্রা বলেন, "আমার চেম্বারে অনেক মহিলা আসেন যাঁরা ডায়েট থেকে শুরু করে সবকিছুই ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছেন, তবুও তীব্র ক্লান্তি এবং ওজন বৃদ্ধির সমস্যায় ভুগছেন। তাঁরা ভাবেন এটি তাঁদের ইচ্ছাশক্তির অভাব বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলেই বোঝা যায়, তাঁরা তীব্র সময়ের অভাবে (Temporal deprivation) ভুগছেন। শরীর যখন অনবরত শুধু বেঁচে থাকার লড়াই বা ‘সারভাইভাল মোডে’ চলে, তখন কোনও ওষুধ বা ডায়েট মেটাবলিজমকে সুস্থ করতে পারে না।"

সময়ের অভাব ও মেটাবলিক ক্রাইসিস কাটানোর ঘরোয়া উপায়

মহিলাদের মেটাবলিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে কেবল ডায়েট চার্ট দেওয়াই যথেষ্ট নয়, জীবনযাত্রার ধরনে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা জরুরি:

পারিবারিক কাজের বণ্টন: ঘরের প্রতিদিনের অবৈতনিক কাজ (রান্না, পরিষ্কার করা, পরিচ্ছন্নতা) এবং যত্ন নেওয়ার দায়িত্বগুলো পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে সমবণ্টন করতে হবে, যাতে নারীরা নিজেদের জন্য কিছুটা সময় (Downtime) পান।

ব্যায়ামের ধরন বদলানো: সময়ের অভাব থাকলে এবং শরীর অলরেডি ক্লান্ত থাকলে তীব্র হাই-ইনটেনসিটি (HIIT) বা ভারী কার্ডিও ওয়ার্কআউট এড়িয়ে চলুন। এগুলো কর্টিসল আরও বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে ২০ মিনিটের ওয়েট বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং (Resistance training) এবং সাধারণ হাঁটার অভ্যাস করুন, যা কর্টিসল না বাড়িয়ে পেশী গঠন করবে।

ঘুমের সাথে আপস নয়: প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। ঘুমের মধ্যেই শরীর কর্টিসলের মাত্রা রিসেট করে এবং মেটাবলিক ফাংশন মেরামত (Repair) করে।

এক নজরে সুস্থ বনাম অসুস্থ মেটাবলিজমের লাইফস্টাইল

metabolism

ডিসক্লেমার: এই প্রতিবেদনটি এন্ডোক্রিনোলজিস্টের মতামত এবং হরমোনাল ও মেটাবলিক হেলথ গাইডের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ সচেতনতার উদ্দেশে রচিত। আপনার যদি তলপেটে অতিরিক্ত চর্বি বৃদ্ধি, থাইরয়েড, অনিয়মিত পিরিয়ডস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ থাকে, তবে কোনও ঘরোয়া প্রতিকার বা কঠোর ডায়েট শুরুর আগে একজন নিবন্ধিত এন্ডোক্রিনোলজিস্টের (Endocrinologist) পরামর্শ নিন।
Disclaimer: The neuro-endocrine and metabolic pathways delineating the activation of the hypothalamic-pituitary-adrenal (HPA) axis under temporal scarcity—specifically concerning chronic hypercortisolemia, visceral adiposity, and down-regulation of the basal metabolic rate (BMR)—are constructed for clinical and metabolic health literacy. Patients demonstrating advanced manifestations of insulin resistance or reproductive axis disruption (PCOS) should consult an endocrinologist for targeted diagnostic and therapeutic management.

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User