Raja Sen Death: প্রয়াত পরিচালক রাজা সেন, শেষ হল বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র অধ্যায়

১৯৫৫ সালে কলকাতায় জন্ম রাজা সেনের। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল তাঁর। টেলিভিশনের জন্য একের পর এক সাহিত্যনির্ভর কাজ তৈরি করে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

Aug 16, 2026 - 11:43
0 0
Raja Sen Death: প্রয়াত পরিচালক রাজা সেন, শেষ হল বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র অধ্যায়

প্রয়াত পরিচালক রাজা সেন (Raja Sen passes away)। বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন এবং তথ্যচিত্রের জগতে দীর্ঘ কয়েক দশকের উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান হল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গত কয়েক বছর ধরেই বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যা এবং একাধিক জটিলতায় ভুগছিলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই পরিচালক (Veteran Bengali director Raja Sen death)। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হওয়ায় কলকাতার SSKM হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল পরিচালককে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণেও ছিলেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই বর্ষীয়ান পরিচালক।

রাজা সেন শুধু একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং শিল্পজগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেছিলেন তিনি। কাহিনিচিত্রের পাশাপাশি তথ্যচিত্র এবং টেলিভিশনে তাঁর কাজ তাঁকে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিল। বাংলা টেলিভিশনের সাহিত্যনির্ভর কাজকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৫৫ সালে কলকাতায় জন্ম রাজা সেনের। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল তাঁর। টেলিভিশনের জন্য একের পর এক সাহিত্যনির্ভর কাজ তৈরি করে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘সম্পর্ক’, ‘তারাশঙ্করের ছোটগল্প’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে নারী’-র মতো কাজ তাঁর পরিচালনার বৈচিত্র্যের পরিচয় দেয়। তাঁর নিজের website-এও এই টেলিভিশন কাজগুলির উল্লেখ রয়েছে।

তবে বড় পর্দায় রাজা সেনের সবচেয়ে বড় পরিচিতি আসে ‘দামু’ দিয়ে। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির কেন্দ্রে ছিল এক অনাথ শিশুর গল্প। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, শিশুমনের সরলতা এবং একটি অসম্ভব প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল ছবিটি। ‘দামু’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা শিশুচলচ্চিত্রের সম্মান পায়। ছবিটি এখনও রাজা সেনের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘দামু’-র আগে এবং পরেও জাতীয় পুরস্কারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রের জন্য National Award পেয়েছিলেন তিনি। পরে ‘দামু’-র জন্য সেরা শিশুচলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার এবং ‘আত্মীয় স্বজন’-এর জন্য সেরা পরিবারকল্যাণমূলক ছবির জাতীয় পুরস্কার পান। অর্থাৎ তাঁর ঝুলিতে ছিল মোট তিনটি জাতীয় পুরস্কার।

‘আত্মীয় স্বজন’ও ছিল তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি। পরিবারের সম্পর্ক, প্রজন্মের দূরত্ব এবং মানুষের আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছবি জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ভারতীয় প্যানোরামাতেও ছবিটি নির্বাচিত হয়েছিল।

রাজা সেনের ছবির তালিকায় রয়েছে ‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘তিনমূর্তি’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মায়া মৃদঙ্গ’-সহ একাধিক ছবি। তাঁর পরিচালিত ‘তিনমূর্তি’ ছবিটির সঙ্গে তপন সিংহের বিশেষ যোগ ছিল। তপন সিংহের পরিকল্পনা করা ছবিটির কাজ তাঁর মৃত্যুর পর রাজা সেনের হাতে আসে এবং তিনি সেটি সম্পূর্ণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকেও বড় পর্দায় নিয়ে এসেছিলেন রাজা সেন। তাঁর ‘ল্যাবরেটরি’ ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রাভিনা ট্যান্ডন, সব্যসাচী চক্রবর্তী, রঞ্জিত মল্লিক-সহ একাধিক শিল্পী। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল রবীন্দ্রনাথের গল্পের চলচ্চিত্ররূপ।

তবে রাজা সেনের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি ছিল তাঁর তথ্যচিত্র নির্মাণ। বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির বহু কিংবদন্তিকে তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর তথ্যচিত্রের বিষয় হয়েছেন। তাঁর নিজের website-এও এই কাজগুলির উল্লেখ রয়েছে।

সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তাঁর তথ্যচিত্রই তাঁকে এনে দিয়েছিল প্রথম জাতীয় পুরস্কার। শিল্প ও সংস্কৃতি বিভাগে সেরা তথ্যচিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল সেই কাজ। পরে তপন সিংহকে নিয়ে ‘Filmmaker for Freedom’ তথ্যচিত্রও তৈরি করেন তিনি।

শুধু বাংলা নয়, ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়েও কাজ করেছেন রাজা সেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরির কাজও করেছিলেন তিনি। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিত্বকে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল বরাবরই স্পষ্ট।

টেলিভিশনে তাঁর কাজের প্রভাবও কম নয়। বাংলা টেলিভিশনে সাহিত্যনির্ভর ধারাবাহিককে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মতো কাজ সেই সময়ের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এসেছিল একাধিক পুরস্কারের মাধ্যমে। ‘সুবর্ণলতা’-র জন্য টেলিভিশন প্রযোজনা এবং ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর জন্য পরিচালনায় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবেও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাজা সেন। কলকাতাভিত্তিক এই পরিচালক পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাজের মূল দর্শন ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের জয়কে তুলে ধরা।

২০১৬ সালে ‘মায়া মৃদঙ্গ’ ছবির জন্য Dada Saheb Phalke Film Festival-এ Best Director-এর Jury Award-ও পেয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষ পর্ব পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

রাজা সেনের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারাল এমন একজন নির্মাতাকে, যিনি একদিকে সাহিত্যকে পর্দায় এনেছেন, অন্যদিকে বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসকে ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন। ‘দামু’-র মতো শিশুতোষ ছবি থেকে ‘আত্মীয় স্বজন’-এর মতো পারিবারিক গল্প, রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাবরেটরি’ থেকে সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ কিংবা শম্ভু মিত্রকে নিয়ে তথ্যচিত্র, তাঁর কাজের পরিধি ছিল বিস্তৃত।

বাংলা সিনেমার মূল ধারার বাইরে থেকেও নিজের স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছিলেন রাজা সেন। তাঁর চলে যাওয়া তাই শুধু একজন পরিচালকের মৃত্যু নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়েরও অবসান।

রাজা সেন নেই। থেকে গেল তাঁর তৈরি ছবি, তাঁর তথ্যচিত্র, তাঁর টেলিভিশন কাজ এবং বাংলা সংস্কৃতিকে নথিবদ্ধ করে যাওয়ার দীর্ঘ উত্তরাধিকার।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User