এক্সক্লুসিভ: মহাকরণ সংস্কারের দায়িত্ব নিতে চায় আদানি, রাইটার্স ঘুরে সমীক্ষা গোষ্ঠীর কর্তাদের

নিউটাউনে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর হাসপাতাল তৈরির পাশাপাশি বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান স্থাপত্য রাইটার্স বিল্ডিংস সংস্কারে আগ্রহী আদানি গোষ্ঠী(Adani Group)। পূর্ত দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই মহাকরণ সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। সব ঠিক থাকলে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এসে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারেন গৌতম আদানি (Gautam Adani)।

Sep 08, 2026 - 11:32
0 0
এক্সক্লুসিভ: মহাকরণ সংস্কারের দায়িত্ব নিতে চায় আদানি, রাইটার্স ঘুরে সমীক্ষা গোষ্ঠীর কর্তাদের

নিউটাউনে অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনার পর কলকাতার আরও একটি ঐতিহাসিক প্রকল্পে যুক্ত হতে চলেছে আদানি গোষ্ঠী। বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনের অন্যতম প্রতীক মহাকরণ তথা রাইটার্স বিল্ডিংস (Writers Building Kolkata) সংস্কারের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তারা।

আদানি গোষ্ঠীর (Adani Group) একটি প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই পূর্ত দফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং অন্য পদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিংসে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক ভবনটির বর্তমান অবস্থা, কাঠামোগত সমস্যা এবং সংস্কারের সম্ভাব্য পরিধি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের এই সমীক্ষার ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি হতে পারে।

তবে রাইটার্স বিল্ডিংস সাধারণ কোনও সরকারি ভবন নয়। এটি কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ স্থাপত্য। ফলে সংস্কারের নামে ভবনের ঐতিহাসিক চরিত্র, সম্মুখভাগ কিংবা মূল স্থাপত্যশৈলীতে কোনও পরিবর্তন করা যাবে না। প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজ করতে হবে। আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত গৃহীত হলে সেই হেরিটেজ বিধি মেনেই গোটা প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।

নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর হাসপাতাল ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ তৈরির খবরও সর্বপ্রথম প্রকাশ করেছিল ‘দ্য ওয়াল’। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় আসার কথা আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির (Gautam Adani)। ওই দিন তিনি নিউটাউনে প্রস্তাবিত হাসপাতালের ভূমিপুজো করতে পারেন। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিত থাকার কথা।

ওই সফরেই মহাকরণ সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারেন গৌতম আদানি। যদিও প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং কাজের সময়সীমা নিয়ে এখনও সরকারি স্তরে কিছু জানানো হয়নি। ফলে ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘোষণার দিকেই নজর থাকবে প্রশাসনিক ও শিল্পমহলের।

১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জুনিয়র কর্মচারী বা ‘রাইটারদের’ দফতর হিসেবে ভবনটির নির্মাণ (Writers Building History) শুরু হয়েছিল। স্থপতি টমাস লায়নের নকশায় তৈরি রাইটার্স ছিল কলকাতার প্রথম তিনতলা ভবন। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে তার আয়তন এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ—দুই পর্বেই বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায় এই লাল বাড়ি।

স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও মহাকরণের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ পুলিশকর্তা এনএস সিম্পসনকে হত্যা করতে রাইটার্স বিল্ডিংসে অভিযান চালিয়েছিলেন বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত। তাঁদের স্মৃতিতেই পরবর্তী সময়ে ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম হয় বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ বা বিবাদী বাগ।

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ কয়েক দশক রাইটার্স বিল্ডিংস থেকেই পরিচালিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন। প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ বর্গফুট আয়তনের এই ভবনে এক সময়ে ৩৪টি সরকারি দফতর এবং প্রায় ছ’হাজার কর্মীর জায়গা হয়েছিল। ২০১৩ সালে রাজ্য সচিবালয়ের অধিকাংশ দফতর নবান্নে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর মহাকরণের সংস্কার শুরু হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহ বাস্তবায়িত হলে ঐতিহাসিক ভবনটির সংরক্ষণে নতুন গতি আসতে পারে।

কলকাতার ঐতিহ্য সংরক্ষণে অবশ্য এর আগেও যুক্ত হয়েছে আদানি গোষ্ঠী। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুমারটুলি ঘাট ও সংলগ্ন নদীতীর সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকনমিক জোন। কুমারটুলি থেকে চাঁপাতলা পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মিটার নদীতীরকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মন্দির ও পুরনো কাঠামো সংরক্ষণের পাশাপাশি নদীর পাড় শক্তিশালী করা, হাঁটার পথ, আলোকসজ্জা এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে এই প্রকল্পে। স্থপতি অঞ্জন মিত্রের পরিকল্পনায় কাজটি হয়েছে।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সংস্কার হওয়া কুমারটুলি ঘাটেও গৌতম আদানির যাওয়ার কথা রয়েছে বলে সূত্রের খবর। একই দিনে হাসপাতালের ভূমিপুজো, কুমারটুলি ঘাট পরিদর্শন এবং মহাকরণ সংস্কার নিয়ে সম্ভাব্য ঘোষণা—সব মিলিয়ে তাঁর কলকাতা সফর তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।

পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ধরনের প্রকল্প নিছক কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদানি গোষ্ঠীর মূল ভিত্তি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে। ফলে বাংলায় বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি এখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকল্পে যুক্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে তারা।

এর আগে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনও কালীঘাট মন্দিরের গর্ভগৃহ, চূড়া এবং সোনার মুকুট-সহ গুরুত্বপূর্ণ অংশের সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছিল। ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে সেই কাজ করা হয়। এবার আদানি গোষ্ঠীর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কলকাতার নদীতীরের পর বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান স্মারকও কর্পোরেট সহযোগিতায় নতুন রূপ পেতে পারে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User