ঘাটতি পেছনে ফেলে নতুন রেকর্ড! কেন্দ্রীয় সংস্থা NTPC-কে কয়লা বিক্রি করছে রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম
একসময় কয়লার মারাত্মক ঘাটতি ও কোল ইন্ডিয়ার ওপর ৮৫ শতাংশ নির্ভরতা থাকলেও, ক্যাপটিভ (Captive) খনি থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৪-২৫ সালে ইতিহাস গড়েছে WBPDCL। বর্তমানে নিজস্ব খনি থেকেই মেটানো হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির শতভাগ কয়লার চাহিদা। চাহিদা মিটিয়ে এবার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা NTPC-কে ০.৫ মিলিয়ন টন উদ্বৃত্ত কয়লা যোগান দেওয়া শুরু করেছে নিগম। ২০২৭ সালের মধ্যে মোট ৩.৫ মিলিয়ন টন কয়লা খোলা বাজারে বিক্রির মেগা প্ল্যান রাজ্য সরকারের।
একসময় কয়লার জন্য কোল ইন্ডিয়ার ওপর ভরসা করে থাকতে হতো। ঘাটতির কারণে ব্যাহত হতো উৎপাদন। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ছবিটা পুরোপুরি বদলে গেল। কয়লা সরবরাহে পুরোপুরি স্বনির্ভর হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম (ডব্লিউবিপিডিসিএল)। শুধু স্বনির্ভর হওয়াই নয়, নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত কয়লা এবার বিক্রি করা শুরু করল এই রাজ্য সরকারি সংস্থা। আর সেই যাত্রার প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসি-কে (NTPC) কয়লা সরবরাহ শুরু করল তারা।
কোল ইন্ডিয়া থেকে নিজস্ব খনি: রূপান্তরের ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডব্লিউবিপিডিসিএল-এর আওতায় রয়েছে পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এগুলির মধ্যে প্রাচীনতম ইউনিটটি ছয়ের দশক থেকে চলছে। আগে ‘ফুয়েল সাপ্লাই এগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড (সিআইএল) থেকে কয়লা কিনতে হতো। ফলে কয়লার জোগানের জন্য প্রায় ৮৫ শতাংশ নির্ভর করে থাকতে হতো বাইরের ওপর।
তবে ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে ডব্লিউবিপিডিসিএল-কে নিজস্ব ক্যাপটিভ কয়লা ব্লক বণ্টন করা হয়। এর পর থেকেই শুরু হয় নিজস্ব খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের কাজ। সংস্থার বার্ষিক রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে সিআইএল থেকে ১২.৫৭ মিলিয়ন টন কয়লা নেওয়া হলেও ক্যাপটিভ খনি থেকে পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ১.৯২ মিলিয়ন টন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব খনির উৎপাদন দ্রত বাড়তে থাকে।
২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে এসে বড় সাফল্য পায় নিগম। কোল ইন্ডিয়া থেকে কয়লা নেওয়া এক ধাক্কায় শূন্যে নেমে আসে। অর্থাৎ, চাহিদার ১০০ শতাংশ কয়লাই নিজেদের খনি থেকে তুলতে শুরু করে ডব্লিউবিপিডিসিএল। বর্তমানে নিগমের দৈনিক কয়লার গড় ব্যবহার প্রায় ৬০ হাজার টন। আর তাদের দৈনিক উৎপাদন তার চেয়েও অনেক বেশি।
উদ্বৃত্ত কয়লা বিক্রির সিদ্ধান্ত ও এনটিপিসি-র সঙ্গে চুক্তি
কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের ‘এমএমডিআর আইন ২০২১’ অনুযায়ী, নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজন মেটানোর পর যেকোনও সংস্থা তার বার্ষিক অতিরিক্ত উৎপাদনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারে। ডব্লিউবিপিডিসিএল-এর কাছে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত কয়লা থাকায় কেন্দ্র সরকারের সেই আইন মেনেই রাজস্ব বাড়াতে বাণিজ্যিক বিক্রির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
দেশের অন্যতম বড় ‘মহারত্ন’ সংস্থা এনটিপিসি-র সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে ডব্লিউবিপিডিসিএল। এই চুক্তি অনুযায়ী এনটিপিসি-র বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে মোট ০.৫ মিলিয়ন টন কয়লা সরবরাহ করা হবে। সমস্ত আইনি ও কর সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি এই কয়লা পাঠানোর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
এটি রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে এখানেই থেমে থাকছে না নিগম। ডব্লিউবিপিডিসিএল-এর পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে খোলা বাজারে মোট ৩.৫ মিলিয়ন টন উদ্বৃত্ত কয়লা বিক্রি করার। একসময় যারা ছিল কয়লা-নির্ভর, আজ তারা অন্য সংস্থাকে কয়লা বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছে। রাজ্য বিদ্যুৎ নিগমের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিঃসন্দেহে ভারতীয় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)