তৃণমূল নামও ‘ফ্রিজ’, মমতার দল কি হবে ‘তৃণমূল (ম)’? ঋতব্রত শিবির ভাবছে দুই নাম
তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ফ্রিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। মমতা শিবিরে ‘তৃণমূল (ম)’ নাম নিয়ে আলোচনা, ঋতব্রত শিবির ভাবছে দুই বিকল্প।
নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশে আপাতত ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি ব্যবহার করতে পারবে না বিবদমান কোনও শিবিরই। একই সঙ্গে ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীকও চলে গিয়েছে হিমঘরে। ফলে উপনির্বাচনের আগে শুধু নতুন প্রতীক নয়, নতুন নামও বেছে নিতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) শিবিরকে।
দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত কী নাম প্রস্তাব করবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে দলীয় সূত্রে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
সূত্রের দাবি, ঋতব্রত শিবির নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি প্রস্তাব করতে পারে। বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রথম নামটির মাধ্যমে পুরনো তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার চেষ্টা করা হতে পারে। দ্বিতীয় নামটি নিলে মমতা-পরবর্তী নতুন এবং তুলনামূলক ভাবে গণতান্ত্রিক দলীয় কাঠামোর দাবি সামনে আনার সুযোগ থাকবে ঋতব্রতদের।
অন্যদিকে, কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনায় রয়েছে ‘তৃণমূল (ম)’ নামটি। এখানে ‘ম’ অক্ষরটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় বহন করবে। ঠিক যেমন অতীতে ইন্দিরা গান্ধীর অনুগামীরা নাম দিয়েছিলেন কংগ্রেস (আই)।
তবে এই নামটিও এখনও চূড়ান্ত নয়। কমিশনের কাছে একাধিক বিকল্প নাম জমা দিতে হতে পারে। প্রস্তাবিত নাম অন্য কোনও নথিভুক্ত রাজনৈতিক দলের নামের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কি না, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার আশঙ্কা রয়েছে কি না—সব দিক বিবেচনা করেই অনুমোদন দেবে কমিশন।
মনে পড়ছে ১৯৬৯ সালের কংগ্রেস-ভাঙন
তৃণমূলের এই পরিস্থিতি অনেককেই ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক কংগ্রেস-বিভাজনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে সেই ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
১৯৬৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দলের তথাকথিত ‘সিন্ডিকেট’-এর সংঘাত চরমে ওঠে। কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় কংগ্রেস (আর) এবং কংগ্রেস (ও)। ‘আর’ বলতে বোঝানো হত Requisitionists বা Ruling গোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দিরা। ‘ও’ অর্থ Organisation—কামরাজ, মোরারজি দেশাই এবং এস নিজলিঙ্গাপ্পার মতো পুরনো নেতারা ছিলেন সেই শিবিরে।
সে সময় অবিভক্ত কংগ্রেসের প্রতীক ছিল জোয়াল-কাঁধে জোড়া বলদ। বিভাজনের পরে সংগঠন কংগ্রেস বা কংগ্রেস (ও) সেই প্রতীক রাখে। ইন্দিরার কংগ্রেস (আর) পায় ‘গাই ও বাছুর’ প্রতীক। ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই প্রতীক নিয়েই ‘গরিবি হটাও’ স্লোগানে বিপুল জয় পান ইন্দিরা। দল ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টও স্বীকৃতি দেয় ঐতিহাসিক সাদিক আলি মামলায়।
‘কংগ্রেস (আই)’ এসেছিল ১৯৭৮ সালে
ইন্দিরা কংগ্রেস নামেই পরিচিত কংগ্রেস (আই) অবশ্য ১৯৬৯ সালে তৈরি হয়নি। আরও একটি বিভাজনের পরে ১৯৭৮ সালে ইন্দিরা তাঁর শিবিরের নামের সঙ্গে ‘আই’ যুক্ত করেন। তখন গাই-বাছুর প্রতীকও ফ্রিজ হয়ে যায়। ইন্দিরা বেছে নেন বর্তমান কংগ্রেসের পরিচিত ‘হাত’ প্রতীক। সেই সময় হাতের পাশাপাশি হাতি ও সাইকেলের মতো প্রতীকও তাঁর সামনে বিকল্প হিসেবে ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে বর্তমান তৃণমূল-বিভাজনে ‘তৃণমূল (ম)’ নামটি উঠলে তার মধ্যে কংগ্রেস (আই)-এর ইতিহাসের ছায়া দেখা অস্বাভাবিক নয়। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু নামের পাশে একটি অক্ষর জুড়লেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত হয় না। ইন্দিরাকে ভোটের ময়দানে প্রমাণ করতে হয়েছিল, তাঁর শিবিরই মানুষের চোখে প্রকৃত কংগ্রেস।
মমতা এবং ঋতব্রত—দু’পক্ষের সামনেও এখন সেই একই পরীক্ষা। জোড়াফুল ছাড়া কে ভোটারদের কাছে ‘আসল তৃণমূল’ হয়ে উঠতে পারে, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘরে নয়, মিলবে ভোটের বাক্সে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)