ধুলোয় লুণ্ঠিত তিন শিখা! যাদবপুরে পদদলিত নন্দলালের সৃষ্টি, তবে কি নিভে গেল স্পর্ধা?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটে ভাঙচুর। পদদলিত নন্দলাল বসুর তৈরি ঐতিহাসিক লোগো বা এমব্লেম। জানুন এই সৃষ্টির নেপথ্য ইতিহাস ও নান্দনিকতা।
'ট্রাফিকের বাতি যখন লাল হয়, তখন বেঙ্গল ল্যাম্পের ওপার থেকে এপারে আসার সময় পায়ের কদম কয়েক ইঞ্চি বেড়ে যায়। আরেকটু বুক চিতিয়ে পা ফেলতে ইচ্ছে করে। ঠিক কি না?' (Jadavpur University News)
গ্রিন জোনের সান্ধ্য আড্ডা শেষে মেসের চিলতে ঘরে ফেরার পথে চায়ের ভাঁড় হাতে এই প্রশ্নটাই তুলেছিল এক বন্ধু। আজ থেকে পাক্কা পনেরো বছর আগে৷ তারও দু'বছর আগে, ২০০৯-এ যখন আয়লায় লণ্ডভণ্ড শহরে কম্পিত মন আর একরাশ মফস্বলি ভীরুতা নিয়ে অনার্সের অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে এসেছিলাম, তখন অবশ্য ওপার থেকে এপারে আসার পদচালনায় এতখানি বীর্য, দম্ভ আর আত্মবিশ্বাস মিশে ছিল না। জড়তায় আরও নুয়ে পড়ি টেস্টে বসার সময়৷ (Jadavpur News)
তারপর আর কী! খানিক দুরুদুরু বুকে প্রশ্নপত্র হাতে তুলে নেওয়া। বারদুয়েক চোখ বোলানো৷ অত:পর পারিবারিক বলপ্রয়োগে সায়েন্স নিয়ে পড়তে বাধ্য এক বিদ্রোহী আত্মার অবসাদ-নির্গমনে 'তুমি কেন বাংলা নিয়ে পড়তে চাও' প্রবন্ধটি লিখে হাসিমুখে বেরিয়ে আসা।
যাদবপুরের প্রশ্নপত্র যদি সেদিন 'দক্ষিণ খোলা জানালা' হয়ে থাকে, ওই একই দিনে আমার এই স্বভাবভীরু কুণ্ঠিত মনকে বেমক্কা দুটো আস্ত ডানা উপহার দিয়েছিল চার নম্বর গেটের সিংহদুয়ার! তখনই সেই দরজা এখনকার মতো শক্তপোক্ত হয়নি৷ খানিক নড়বড়েই ছিল৷ কিন্তু বেরনোর আগে আমার নজর টেনেছিল প্রদীপ্ত, উজ্জ্বল, ভাস্বর একটি ফলক। প্রচণ্ড উদ্দীপ্ত এক নকশা। মিনিমাল৷ কিন্তু তীক্ষ্মভেদী৷ যেন অনেক কিছুকে ধারণ করে রেখেছে৷ একটা শিখার মোটিফ৷ কিন্তু কেন্দ্রে নিহিত আবেগের বারুদ। ধ্বংসের রসদ নয়৷ বরং, সংহত ও সুমহান ঐতিহ্যে তা মুকলিত হয়ে উঠেছে।
এমনই অব্যক্ত, অকথিত একরাশ অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম সেদিন৷ জানতাম পরীক্ষা ভাল হয়েছে৷ চান্স পেয়ে যাব৷ বুঝেছিলাম, এই ফলকের সঙ্গে মোলাকাত, তাকে বুঝে নেওয়ার পর্ব এখানই ফুরোচ্ছে না৷ এর নীরব ভাষ্য, যা সেদিন জানা হয়নি, তাকে উপলব্ধির যথেচ্ছ সুযোগ আমি পাব৷
নন্দলাল বসুর অলঙ্করণে বাঙ্ময় যে সৃষ্টি, আজ পদদলিত হল, এই নৈরাজ্যের ঠিক-ভুল সময়ের আদালতে বিচার হবে। আন্দোলনের নামে তাণ্ডবের এই কুশ্রী চেহারা জাতির সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতার অদৃষ্টলিপি কি না, কালের হেফাজতে তা তোলা থাক! আপাতত, যাঁরা সুদৃশ্য ফলকটির গরিমা বিষয়ে অবগত নন, কিন্তু অবগত হতে ইচ্ছুক, কালের বিচারের আগে নিজেদের যুক্তিশলাকাকেও কিঞ্চিৎ শান দিতে চান, তাঁদের জন্য জরুরি কিছু তথ্য নীচে লেখা রইল৷
স্বদেশি আন্দোলনের স্পর্ধা
শেকড় ছড়িয়ে ১৯০৬ সালে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের (Swadeshi Movement) উত্তাল সময়। জন্ম নিল ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন বা এনসিই। ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত দেশজ বিদ্রোহ। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের নিখুঁত মেলবন্ধন।
১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর। ঠিক এই দিনই এনসিই থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হল যাদবপুর (Jadavpur University)। প্রয়োজন পড়ল এমন এক প্রতীকের, যা এই প্রতিষ্ঠানের বিদ্রোহী সত্তা ও শিক্ষাদর্শকে তুলে ধরবে। ডাক পড়ল শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ্যক্ষ নন্দলাল বসুর। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি যাঁর তুলিতে জীবন্ত। ভারতরত্ন সম্মান যাঁর নকশায় রূপায়িত। সেই 'জাতীয় শিল্পী' নিলেন যাদবপুরের লোগো তৈরির গুরুভার।
নান্দনিকতা ও প্রতীকী ব্যঞ্জনা
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতো ভারী, জটিল এবং ঔপনিবেশিক অহঙ্কারে মোড়া ঢাল বা মুকুটের নকশা সেদিন হেলায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নন্দলাল (Nandalal Bose)। বেছে নেন বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টের অকৃত্রিম, পরিচ্ছন্ন ও আধ্যাত্মিক এক রূপরেখা। কী ছিল সেই নকশায়?
লোগোর বাইরের বলয়ে প্রস্ফুটিত পদ্মের পাপড়ি। যা চারুকলা, দেশজ সংস্কৃতি ও পবিত্রতার প্রতীক। ঠিক কেন্দ্রে একটি মাটির প্রদীপ। অজ্ঞতার অন্ধকার মুছে সত্যের আলো ছড়ানোর নিরন্তর প্রয়াস। প্রদীপের তিনটি শিখা। তিনটি ভিন্ন দর্শনের ধারক।
বাম দিকের শিখাটি বৌদ্ধিক প্রশিক্ষণের রূপক (Intellectual Training)। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলার পাঠ।
মাঝের শিখা আবেগ ও কল্পনাবিকাশের কথা বলে। সহজ বাংলায়: শিল্প ও সহানুভূতির মেলবন্ধন।
আর ডান দিকের শিখাটি আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতীক। চরিত্র গঠন ও উচ্চতর নৈতিক উপলব্ধির চূড়ান্ত রূপ। আর এই প্রদীপের চারপাশে বিচ্ছুরিত সেই অমোঘ মন্ত্র—জাতম্ অস্তি বৃদ্ধি প্রাপ্নুয়াৎ। ইংরেজি তর্জমায়— 'To Know Is To Grow'।
অন্ধকারের আস্ফালন
২০ অগস্ট, ২০২৬। এই কালজয়ী নকশার গায়েই নেমে এল আঘাত। ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ইউনিয়ন মিটিং ঘিরে গত মধ্যরাতে চরম উত্তেজনা। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ক্যাম্পাসে হুড়মুড়িয়ে ঢুকল অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (ABVP) শয়ে শয়ে কর্মী। আর আজ চার নম্বর গেটের লোহার কাঠামো বেয়ে উঠল বিক্ষোভকারীরা। উপড়ে ফেলা হল সেই ঐতিহাসিক রেপ্লিকা। মাটিতে আছড়ে পড়ল ফলকের টুকরো। উন্মত্ত জনতার বুটের তলায় বারবার পদদলিত হল নন্দলালের সৃষ্টি। এসএফআইয়ের (SFI) মতো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি মানবশৃঙ্খল গড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালাল ঠিকই। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার, হয়ে গিয়েছে। অরবিন্দ ভবনের মতো ঐতিহ্যবাহী ভবনও রেহাই পায়নি তাণ্ডব থেকে।
প্রশ্ন উঠবে: আঘাতটা কি শুধু একটা লোহার কাঠামোয়? নাকি গোটা জাতির বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে? আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (ASI) মতে যা 'ন্যাশনাল আর্ট ট্রেজার', তাকেই পায়ে মাড়িয়ে দিল আধুনিক ছাত্র রাজনীতি! যে তিনটি শিখা শিল্প, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার কথা বলত, আজ তা ধুলোয় লুণ্ঠিত!
লুণ্ঠিত ঠিকই৷ তবে ধূলিসাৎ? হয়তো বলা যাবে না। যতদিন বেঙ্গল ল্যাম্পের ওপার থেকে এপার আসার সময় পা কয়েক ইঞ্চি বাড়তি কদম ফেলবে, ততদিন প্রদীপ্ত ফলকটির আয়ুরেখা একইরকম নিবিড়, একই রকম উজ্জ্বল, একই রকম ভাস্বর।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)