সেপ্টেম্বরে শিলান্যাস, আসছেন গৌতম আদানি, নিউটাউনে আদানির হাসপাতাল প্রকল্পে রাজ্যের কী প্রাপ্তি?
কলকাতার নিউ টাউনে আদানি শিল্প গোষ্ঠী যে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরি করতে চলেছে, সেই প্রতিবেদন সবার আগে লেখা হয়েছিল দ্য ওয়ালে। শেষ পর্যন্ত কোনও পরিবর্তন না ঘটলে আগামী মাসেই সেই হাসপাতাল তথা আদানি আরোগ্য নিকেতনের (Adani Arogya Niketan New Town) শিলান্যাস করতে পারেন আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি।
কলকাতার নিউ টাউনে আদানি শিল্প গোষ্ঠী যে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরি করতে চলেছে, সেই প্রতিবেদন সবার আগে লেখা হয়েছিল NBT ওয়ালে। শেষ পর্যন্ত কোনও পরিবর্তন না ঘটলে আগামী মাসেই সেই হাসপাতাল তথা আদানি আরোগ্য নিকেতনের (Adani Arogya Niketan New Town) শিলান্যাস করতে পারেন আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। তবে বড় প্রশ্ন হল, নিউটাউনে এই হাসপাতাল তৈরি হলে রাজ্যের কী আর্থিক সুবিধা হতে পারে?
সূত্রের দাবি, এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সচিবালয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা পড়েছে। নিউটাউনে ওই জমির আয়তন ৫১.৭৫ একর। জমির চরিত্র বদল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ছাড় বাবদ আদানি শিল্পগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ১৯৬৭ কোটি টাকা রাজস্ব ছেড়ে দিচ্ছে সরকার। তবে একই সঙ্গে নবান্নর দাবি, প্রকল্পটি চালু হলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক এবং সামাজিক সুফল এই অঙ্কের তুলনায় ঢের বেশি হতে পারে।
আদানি আরোগ্য নিকতনের (Adani Arogya Niketan) প্রকল্পটিতে মূলধন খাতে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১,২০০ কোটি টাকা। নির্মাণ পর্বে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক উৎপাদনের মূল্যায়ন করা হয়েছে আরও ১,৮০০ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে হাসপাতাল চালু হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদে।
রিপোর্টের হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতাল ও তার সঙ্গে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও গবেষণা, চিকিৎসা-ভ্রমণ এবং রাজস্ব বৃদ্ধির মিলিত বার্ষিক আর্থিক সুবিধা তথা মানিটাইজড বেনিফিট (monetised benefit) হতে পারে প্রায় ৪,০৮৫ কোটি টাকা।
কোথা থেকে আসবে এই ৪০৮৫ কোটি?
প্রকল্পের মূল্যায়নে সম্ভাব্য বার্ষিক সুবিধাগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আদানি গোষ্ঠীর প্রস্তাব হল, তারা ১০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করবে। এর মধ্যে ৫০০ বেডে রাজ্য সরকার বিনামূল্যে পরিষেবা দিতে পারবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানকে প্রস্তাব দিয়েছেন, বেড সংখ্যা বাড়িয়ে ২ হাজার করা হোক। তবে ১ হাজার বেডের হাসপাতাল হলেও স্বাস্থ্য পরিষেবা ও রোগী কল্যাণ ৮১৭ কোটি টাকার সুবিধা পেতে পারে রাজ্য।
এই ৮১৭ কোটি টাকা হাওয়ায় ভাসমান কোনও পরিসংখ্যান নয়। মোটামুটি ভাবে ধরা হয়েছে, সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য যে ৫০০ বেড পাবে তাতে অকুপেন্সি রেট থাকবে ৮০ শতাংশ। প্রতি রোগী গড়ে ৫ দিন ভর্তি থাকবেন। তাঁদের চিকিৎসার জন্য গড়ে খরচ হবে আড়াই লক্ষ টাকা। সে ক্ষেত্রে বার্ষিক মূল্য দাঁড়াবে ৭৩০ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে ফ্রি ওপিডি বাবদ আরও ৬২ কোটি টাকার সুবিধা বছরে পাবে রাজ্য। আর এই রোগীদের রোগ নির্ণয় তথা ডায়গোনেস্টিক ফেসিলিটি বাবদ রাজ্য বছরে আর্থিক সুবিধা পাবে ২৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বছরে মোট ৮১৭ কোটি টাকা।
এত বড় একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে বছরে যে কর্মসংস্থান হবে এবং কর্মীদের যে আয় বা রোজগার হবে তার সামগ্রিক মূল্য দাঁড়াতে পারে ৫৬০ কোটি টাকা। চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বার্ষিক ৩২২ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পেতে পারে রাজ্য।
কলকাতা এমনিতেই ক্রমশ মেডিকেল ট্যুরিজমের হাব হয়ে উঠছে। আমেরিকার মেয়ো ক্লিনিকের থেকে প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসার সাহায্য নিয়ে কলকাতায় এত বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে মেডিকেল ট্যুরিজম গতি পেতে পারে। তাতেও ১,১৫৬ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা রাজ্য পেতে পারে।
আবার অন্য একটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ বা নেপাল ও ভূটান থেকে যেমন বহু রোগী চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তেমনই বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী এখনও চিকিৎসার জন্য দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে যান। তা ঠেকাতে পারলে অন্তত ১,০০০ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এ রাজ্যেই ঘটতে পারে। অর্থাৎ ওই টাকা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির মধ্যে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাক থাকবে। সর্বোপরি রাজ্যের অতিরিক্ত GST আয় হতে পারে ২৩০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, শুধু হাসপাতাল তৈরি করে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়াই নয়, প্রকল্পটিকে ঘিরে একটি বড় হেল্থকেয়ার ইকোসিস্টেম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে।
প্রকল্পটির আর একটি সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব হল চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণা। রিপোর্টে বছরে ৩২২ কোটি টাকার শিক্ষা ও গবেষণা-সংক্রান্ত সুবিধা হবে অনুমান করা হয়েছে।
এর অর্থ, হাসপাতালটি কেবল রোগীর চিকিৎসার জায়গা হিসেবে নয়, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে কলকাতায় স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
কর্মসংস্থানেও বড় প্রভাবের দাবি
হাসপাতালকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। রিপোর্টে এর বার্ষিক এমপ্লয়মেন্ট ইনকাম বেনিফিট (employment-income benefit) ৫৬০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রশাসনিক কর্মী থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, খাদ্য, পরিবহণ এবং অন্যান্য পরিষেবা—বিভিন্ন স্তরে কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ফলে প্রকল্পটির প্রভাব হাসপাতাল চত্বরের বাইরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান বাবদ রাজ্যের অর্থনীতিতে যোগ হবে ৩২০ কোটি টাকা। তা ছাড়া ১০ হাজার জনের পরোক্ষ কর্মসংস্থান হতে পারে। তাঁরা মাসে যদি ২০ হাজার টাকা রোজগার করে, তাহলেও রাজ্যের অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে ২৪০ কোটি টাকা।
এখানেই প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যুক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সরকার জমি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার ক্ষেত্রে প্রায় ১৯৭৬ কোটি টাকার সুবিধা দিচ্ছে বলে প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। যাকে বলা হচ্ছে, ওয়ান টাইম আইডেনটিফাইয়েবল স্টেট ফিসকাল কস্ট (One-time identifiable State fiscal cost)। অন্যদিকে, মূল্যায়ন রিপোর্টে প্রকল্পটি থেকে বার্ষিক মোট মানিটাইজড বেনিফিট ৪,০৮৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
২৭:১ Cost-Benefit Ratio
মূল্যায়ন রিপোর্টে প্রকল্পটির কস্ট বেনিফিট রেশিও দেখা হয়েছে (Illustrative Cost Benefit Ratio-BCR) 27:1। অর্থাৎ রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পে রাজ্যের যে পরিমাণ এককালীন আর্থিক ব্যয় বা fiscal cost চিহ্নিত করা হয়েছে, তার তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি।
আরও বড় অঙ্কটি হল নেট সোশাল প্রেজেন্ট ভ্যালু (Net Social Present Value -NSPV)। রিপোর্টে এটি ৫৩,৮৬০.১০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
হিসাবে ৮ শতাংশ রিয়েল ডিসকাউন্ট রেট এবং ২ শতাংশ বার্ষিক সুবিধা বৃদ্ধির দর ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রকল্প থেকে পাওয়া সুবিধাগুলিকে বর্তমান মূল্যে হিসাব করেও প্রকল্পটির সামাজিক আর্থিক মূল্য যথেষ্ট বেশি বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
এখানে সতর্কতার জায়গাও রয়েছে। রিপোর্ট নিজেই এই হিসাবকে আনুমানিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ ৪,০৮৫ কোটি টাকা বার্ষিক সুবিধা, ৫৩,৮৬০.১০ কোটি টাকার NSPV বা ২৭:১ BCR—এগুলি প্রকল্পের বিভিন্ন অনুমানের ভিত্তিতে করা অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ রাজস্ব নয়।
রিপোর্টের সুপারিশেও বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত মূলধন খাতে বিনিয়োগ যাচাই করা, আর্থিক ছাড়ের শংসাপত্র, বিনামূল্যে যে ৫০০টি বেডের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হবে তার শর্ত মেনে চলা, নিয়মিত সরকারি নজরদারি ইত্যাদি।
অর্থাৎ, রাজ্যের সুবিধা নিশ্চিত করতে শুধু হাসপাতাল তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রকল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় একটি বড় সমস্যা হল উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের রাজ্যের বাইরে চলে যাওয়া। ফলে শুধু রোগী নয়, বিপুল পরিমাণ অর্থও রাজ্যের বাইরে চলে যায়। নিউটনে আন্তর্জাতিক মানের এই হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেই প্রবণতা কিছুটা বদলানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতাকে পূর্ব ভারতের একটি মেডিকেল হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়েই—রিপোর্টে অনুমান করা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাগুলি বাস্তবে কতটা অর্জিত হয় এবং সরকারের দেওয়া শর্তগুলি কতটা কঠোরভাবে কার্যকর করা যায় তার উপর।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)