ধ্বংসস্তূপে রুপোলি পর্দা! যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার একদল শিশু মিলে দেখল 'দ্য লায়ন কিং', আড়ালে কোন সংগঠন?
ধ্বংসস্তূপে একচিলতে রুপোলি পর্দা। গাজায় দ্য লায়ন কিং দেখছে ঘরছাড়া শিশুরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল চিত্রগ্রাহক ওমর আশতাউইয়ের তোলা ছবি।
চারদিকে কংক্রিটের ভগ্নস্তূপ। বোমায় উড়ে যাওয়া ইমারতের কঙ্কাল। ধূসর আর প্রাণহীন এক প্রান্তর। আর ঠিক সেখানেই টাঙানো একচিলতে রুপোলি পর্দা। অস্থায়ী স্ক্রিন থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। আর সেই আলোয় উদ্ভাসিত একঝাঁক শিশুর মুখ। পর্দার দিকে তাদের চোখ একেবারে স্থির। পিনপতন নিস্তব্ধতা। কী দেখছে তারা? ডিজনি-র বিখ্যাত অ্যানিমেশন ছবি 'দ্য লায়ন কিং' (The Lion King)!
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার (Gaza Strip) ঠিক এমনই এক ছবি সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে নেটদুনিয়ায়। প্যালেস্তিনীয় চিত্রগ্রাহক ওমর আশতাউইয়ের তোলা এই ছবি মুহূর্তে ছুঁয়ে গিয়েছে হৃদয়। ইন্টারনেটে যার নাম দেওয়া হয়েছে 'লায়ন কিং গাজা' (Lion King Gaza)।
ধ্বংসস্তূপে ভ্রাম্যমাণ সিনেমা
ধ্বংস, মৃত্যু আর বারুদের গন্ধ—এটাই এখন গাজার প্রাত্যহিক রোজনামচা। মাথার ওপর চক্কর কাটছে যুদ্ধবিমান। বিকট শব্দ আর ঘরছাড়া হওয়ার যন্ত্রণা থেকে শিশুদের মনকে একটু স্বস্তি দিতেই এহেন উদ্যোগ। নেপথ্যে 'মাশারাউই ফাউন্ডেশন' (Masharawi Foundation)। মানসিক আঘাত থেকে কচিকাঁচাদের বাঁচাতে তারা শুরু করেছে ভ্রাম্যমাণ সিনেমা বা মোবাইল সিনেমা। সাময়িক ত্রাণশিবির আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া পাড়াগুলোতে তারা নিয়ে যাচ্ছে প্রজেক্টর, সাদা পর্দা আর সাউন্ড সিস্টেম। উদ্দেশ্য একটাই। এই ভয়াবহতার মাঝেও শিশুদের শৈশবটুকু বাঁচিয়ে রাখা। অন্তত দেড় ঘণ্টার জন্য হলেও যুদ্ধ ভুলে তারা ডুব দিচ্ছে আফ্রিকার জঙ্গলে।
সিম্বার লড়াই আর গাজার বাস্তব
সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) ছবিটি ভাইরাল হতেই শুরু হয়েছে চর্চা। অনেকেই সিনেমার গল্পের সঙ্গে এই শিশুদের বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। 'দ্য লায়ন কিং'-এর মূল চরিত্র সিম্বা। এক ছোট্ট সিংহশাবক। যে নিজের বাড়ি হারিয়েছে। সহ্য করেছে চরম শোক আর বাস্তুচ্যুত হওয়ার অপরিসীম যন্ত্রণা। কিন্তু শেষে সমস্ত বাধা পেরিয়ে সে ফিরে পেয়েছে নিজের অধিকার। গাজার এই ঘরছাড়া শিশুদের জীবনের সঙ্গে সিম্বার লড়াই যেন মিলেমিশে একাকার। অনেকের চোখে এই ছবির নির্বাচন তাই এক গভীর রূপক। বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই শিশুরা যেন নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি পর্দায় দেখছে!
এক ছবি, ভিন্ন রাজনীতি
তবে গাজার মাটিতে 'লায়ন কিং'-এর ইতিহাস শুধুই এমন নিষ্পাপ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অন্ধকার রাজনৈতিক অতীতও।
২০০৭ সাল। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস (Hamas)। সেই সময় হামাসের 'আল-আকসা টিভি' একটি অ্যানিমেশন ভিডিও সম্প্রচার করে। সেখানে 'দ্য লায়ন কিং'-এর ছবি আর চরিত্রগুলোকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা হয়। ভিডিওর মোদ্দা প্রতিপাদ্য, একটি গর্বিত ও শক্তিশালী সিংহ (যা হামাসের প্রতীক) একদল ইঁদুরকে (ফাতাহ গোষ্ঠী) তাড়িয়ে দিয়ে শাসন কায়েম করছে। অর্থাৎ, সংঘাতের আবহে এই একই মাধ্যম কখনও ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার, আবার কখনও বা মানসিক মুক্তির পথ হিসেবে!
বেঁচে থাকার রসদ
যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু খাবার বা ওষুধই শেষ কথা নয়। মানসিক চিকিৎসাও সমান জরুরি। ওমর আশতাউইয়ের (Omar Ashtawy) তোলা এই ছবিটি সেই চরম সত্যটাকেই আবার প্রমাণ করল। ধ্বংস আর মৃত্যুর মধ্যেও এই ছবি এক টুকরো জীবনের কথা বলে। চারপাশের মৃত্যুপুরীতেও যে আশা বেঁচে থাকে, এই শিশুদের উজ্জ্বল মুখগুলোই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আগামী দিনে প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল (Palestine-Israel Conflict) সংঘাতের অন্যতম আইকনিক ছবি হিসেবেই হয়তো ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে গাজার এই 'লায়ন কিং'।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)