পাটুলি দিয়ে যেতে-আসতে এই পেল্লায় ম্যুরাল নিশ্চয় দেখেছেন! দেয়ালচিত্রের শিল্পীকে চেনেন?

পাটুলি দিয়ে যাওয়ার সময় সিইএসসি সাবস্টেশনের গায়ে বিশাল ম্যুরালটি নিশ্চয়ই দেখেছেন! শহরের সবচেয়ে উঁচু এই শিল্পকর্মের নেপথ্যের কারিগরকে চেনেন? পড়ুন সেই গল্প।

Aug 05, 2026 - 18:20
0 0

ইএম বাইপাস দিয়ে পাটুলির দিকে যাচ্ছেন। হঠাৎ চোখ আটকে গেল রাস্তার ধারের একটি বহুতলে। সিইএসসি (CESC)-র সাবস্টেশন। তার গায়েই এক সুবিশাল দেওয়ালচিত্র। তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পীদের অবয়ব। ৭৫ ফুট উঁচু এই শিল্পকর্মটি কলকাতার সবচেয়ে বড় ম্যুরাল (Kolkata Street Art)। গত কয়েক বছর ধরে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার সময় থমকে দাঁড়ান। ছবিটি দেখেন। কিন্তু শহরের এই বিখ্যাত ল্যান্ডমার্কটির নেপথ্যে থাকা শিল্পীকে চেনন না অনেকেই৷

দেওয়াল খোঁজার অভিযান

এই চোখধাঁধানো সৃষ্টির কারিগর পুণের শিল্পী আফজান পীরজাদে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। 'স্ট্রিট আর্ট ইন্ডিয়া' (St+art India) এবং এশিয়ান পেইন্টস যৌথভাবে একটি প্রোজেক্ট হাতে নেয়। লক্ষ্য, শহরের ফাঁকা দেওয়ালগুলোকে শিল্পের মোড়কে সাজানো। অনলাইনে প্রচার চলে। বহু মানুষ বিভিন্ন দেওয়ালের প্রস্তাব দেন। অবশেষে বেছে নেওয়া হয় পাটুলির ওই সাবস্টেশনটিকে। ডাক পড়ে আফজানের।

আলো থেকে কুমোরটুলি

ভবনটি যেহেতু বিদ্যুৎ বন্টন সংস্থার, তাই প্রথমে আলো সংক্রান্ত কিছু আঁকার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে আফজান চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে, যা কলকাতাবাসীর মনে গর্বের সঞ্চার করবে (Public Art Project)। ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটির সময় তিনি কুমোরটুলির সন্ধান পান। চার বছর আগে 'দ্য টেলিগ্রাফে' প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি আগে কখনও এমন কিছু শুনিনি বা দেখিনি। কলকাতার বাইরে আমরা দুর্গাপুজোর প্রশংসা করি ঠিকই। কিন্তু যাঁরা এই প্রতিমা তৈরি করেন, তাঁদের সম্পর্কে কিছুই জানতে পারি না।'

কারিগরদের জীবনপাঠ

কলকাতায় পা রেখেই আফজান সোজা চলে যান কুমোরটুলিতে (Kumartuli Artisans)। আফজানের কথায়, 'আমি কারিগরদের জীবন, তাঁদের সম্প্রদায় ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নিই। ওদের কাজের পদ্ধতি আমায় মুগ্ধ করেছিল। আর্ট স্কুলে যা শেখানো হয়, এটার সঙ্গে তার দারুণ মিল। বাবাদের কাছ থেকে ছেলেরা কাজ শিখছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্পের ধারা বয়ে চলেছে। আমি তখনই ঠিক করি, ম্যুরালের জন্য এর চেয়ে ভালো বিষয় আর কিছু হতে পারে না।'

১৭ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম

দেওয়াল প্রস্তুত হচ্ছিল। এদিকে আফজান নিজের হোটেলের ঘরে বসেই নকশা চূড়ান্ত করছিলেন। কুমোরটুলির কাদামাটি এবং সাবেকি রঙের ছোঁয়ায় সেজে ওঠে ব্লুপ্রিন্ট। শুরু হয় কাজ। মাঝে তিনদিন বৃষ্টির ভ্রুকুটি। তা সত্ত্বেও মাত্র ১৭ দিনে গোটা ছবির পর্ব সম্পূর্ণ হয় (Tallest Mural in Kolkata)। দিল্লি থেকে আসা শিল্পী রোহমা এবং কলকাতার রাহুল চক্রবর্তী তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছিলেন। রাহুল আবার এই প্রোজেক্টের ম্যানেজার হিসেবেও কাজ সামলান।

ম্যুরাল দর্শনে পথ-দুর্ঘটনা!

শিল্প অনেক সময় মানুষকে কাছে টানে। আবার কখনও কখনও আক্ষরিক অর্থেই একে অপরের সংঘাত বাধায়! কাজ করার সময় এমনই এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী আফজান। একগাল হেসে বলেন, 'একদিন ম্যুরালের একদম উপরের দিকে কাজ করছিলাম। হঠাৎ নিচে একটা হট্টগোল শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখি, দু'জন পথচারী ঝগড়া করছেন। রাহুল পরে আমাকে জানায়, উল্টোদিক থেকে আসা ওই দু'জন দেওয়ালের ছবিটার দিকে এতটাই মগ্ন হয়ে তাকিয়েছিলেন, যে একে অপরের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা মেরে বসেন। এটাকে আমার প্রশংসা হিসেবে নেওয়া উচিত কি না, তা আজও বুঝতে পারিনি।'

শহরের বুকে নতুন আর্ট কলোনি

কলকাতার শিল্পবোধ ও সম্ভাবনা নিয়ে ভীষণ আশাবাদী পুণের এই শিল্পী। তাঁর মতে, শহরের মূল অংশের ভেতরেই একটি আর্ট কলোনি তৈরি হওয়া উচিত। আফজানের কথায়, 'দেওয়ালগুলোর নিজস্ব একটা চরিত্র থাকা দরকার। এটি শুধুমাত্র পর্যটনেই সাহায্য করবে না, শহরের বাসিন্দাদের মনেও গর্ব জাগিয়ে তুলবে।'

তাঁর একটি বড় স্বপ্ন রয়েছে। শহরের সবচেয়ে উঁচু বহুতল 'দ্য ৪২'-এর গায়ে ছবি আঁকতে চান তিনি। আফজান বলেন, 'সত্যিই চাই, কলকাতার এই সমৃদ্ধ শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে শহরের বুকে আরও ম্যুরাল তৈরির সুযোগ যেন আমার কপালে জোটে!'

চার বছর আগে জাহির করা ইচ্ছে এখনও পূরণ হয়নি। নতুন সরকারের বদান্যতায় কি আফজানের আশ মিটবে? 

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User