পিএনবি-র কারেন্সি চেস্টে ১৭.২৯ কোটির জাল নোট, ম্যানেজার গ্রেফতার, নেপাল-যোগ খতিয়ে দেখছে এনআইএ
কোনও পাচারকারীর ব্যাগ বা সীমান্তের গোপন ডেরা নয়—বিপুল অঙ্কের জাল নোট মিলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সুরক্ষিত কারেন্সি চেস্টে। সেখান থেকে ওই নোট ব্যাঙ্কের শাখা কিংবা এটিএমের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের (PNB Fake note) কারেন্সি চেস্টে ১৭ কোটি ২৯ লক্ষ টাকার জাল নোট পৌঁছল কীভাবে? ব্যাঙ্কের সুরক্ষিত অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থার কোন স্তরে এই বিপুল পরিমাণ জাল নোট ঢুকেছিল? তার কতটা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন শাখা ও এটিএমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গিয়েছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্তে নেমেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ।
উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে পিএনবি-র সোফিয়া মার্কেট এলাকার কারেন্সি চেস্ট থেকে বিপুল অঙ্কের জাল (Fake Currency) ভারতীয় নোট উদ্ধারের ঘটনায় সোমবার জগাধরী কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার অমিত কুমারকে গ্রেফতার করেছে এনআইএ। মামলার এফআইআরে নাম থাকা গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্তদের অন্যতম তিনি।
তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এটি শুধু কয়েকজন ব্যাঙ্ককর্মীর বিচ্ছিন্ন কারসাজি না-ও হতে পারে। ব্যাঙ্কের আনুষ্ঠানিক নগদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে জাল নোট ছড়ানোর পিছনে কোনও বড় চক্র সক্রিয় ছিল কি না, এখন সেটাই তদন্তের কেন্দ্রে।
সাধারণত জাল নোট উদ্ধার হয় পাচারকারীর কাছ থেকে, সীমান্তবর্তী এলাকা, কোনও গোপন আস্তানা অথবা পরিবহণের সময়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জাল নোট মিলেছে ব্যাঙ্কের কারেন্সি চেস্টে—যেখানে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিপুল পরিমাণ নগদ রাখা এবং বিভিন্ন শাখায় পাঠানো হয়।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জাল নোট কীভাবে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার এই সুরক্ষিত স্তরে প্রবেশ করল? সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এনআইএ জানিয়েছে, পিএনবি-র কারেন্সি চেস্টে জাল নোট রাখার পিছনে থাকা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচন এবং জড়িত অন্য অভিযুক্তদের শনাক্ত করাই তদন্তের লক্ষ্য।
নজরে পিএনবি-র তিন আধিকারিক
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত পিএনবি-র তিন আধিকারিকের নাম সামনে এসেছে। তাঁরা হলেন সিনিয়র ডিভিশনাল ম্যানেজার রবি কুমার কানসে, সোফিয়া মার্কেট কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার সুশীল কুমার এবং জগাধরী কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার অমিত কুমার।
প্রাথমিক তদন্তে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনজনকেই সাসপেন্ড করেছে পিএনবি। তাঁরা দেশ ছেড়ে নেপালে পালিয়ে যেতে পারেন—এই আশঙ্কায় পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিসও জারি করেছিল।
বিশেষ তদন্তকারী দল এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চ তিন আধিকারিকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম ও নথি বাজেয়াপ্ত করেছে। তাঁদের ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে যোগাযোগের তালিকা, যাতায়াত এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
১১১ কোটি টাকার নোটের চালানেই কি লুকিয়ে রহস্য?
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই সাহারানপুর থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের জয়পুর দফতরে প্রায় ১১১ কোটি টাকার নোট পাঠানো হয়েছিল। সেই চালানে ৫০০ টাকার নোটের ১,৯০০টি বান্ডিল এবং ২০০ টাকার নোটের ৮০০টি বান্ডিল ছিল বলে জানা গিয়েছে।
এই বিপুল নগদ গোনা, প্যাকিং করা এবং পাঠানোর গোটা প্রক্রিয়া নতুন করে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ হল, ওই চালান প্রস্তুত এবং পাঠানোর দায়িত্ব নাকি এক অস্থায়ী হাউসকিপিং কর্মীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
কোন পর্যায়ে আসল নোটের মধ্যে জাল নোট মেশানো হয়েছিল, কারা প্যাকিংয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
এটিএম কিংবা ব্যাঙ্কের শাখায় পৌঁছেছে জাল নোট?
তদন্তের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, জাল নোটের কোনও অংশ কারেন্সি চেস্ট থেকে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ব্যাঙ্কের শাখা বা এটিএমে পাঠানো হয়েছিল কি না।
সাধারণত কারেন্সি চেস্ট থেকেই ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখা এবং এটিএমে নগদ সরবরাহ করা হয়। ফলে জাল নোট সেখানে ঢুকে থাকলে তা সাধারণ গ্রাহকের হাতে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে উদ্ধার হওয়া নোটের বাইরে কত টাকার জাল মুদ্রা বাজারে ছড়িয়েছে, আদৌ ছড়িয়েছে কি না—তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। নগদের গতিপথ পুনর্গঠন করে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে এনআইএ।
নেপাল-যোগের সম্ভাবনা কতটা?
তদন্তে সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত যোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের যোগাযোগ এবং গতিবিধি বিশ্লেষণ করে নেপাল সীমান্তের কাছে অথবা সীমান্তের ওপারে সক্রিয় কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাই করছে পুলিশ ও এনআইএ।
তিন অভিযুক্ত নেপালে পালিয়ে যেতে পারেন—এই আশঙ্কাও লুকআউট নোটিস জারির অন্যতম কারণ বলে জানা গিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত জাল নোটের এই চক্রের সঙ্গে নেপালের কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ প্রমাণিত হয়নি। তদন্তকারীরা বিষয়টিকে সম্ভাব্য সূত্র হিসেবেই দেখছেন।
গত ২৯ অগস্ট সাহারানপুরের সদর বাজার থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৭৮ ধারায় প্রথম এফআইআর দায়ের করা হয়। ঘটনার গুরুত্ব এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা বিবেচনা করে ৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি নিজেদের হাতে নিয়ে নতুন করে নথিভুক্ত করে এনআইএ।
কারেন্সি চেস্টের মতো সুরক্ষিত ব্যবস্থায় কীভাবে ১৭.২৯ কোটি টাকার জাল নোট ঢুকল, তা এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন। তদন্তে কোনও সংগঠিত আন্তঃরাজ্য বা আন্তর্জাতিক চক্রের সন্ধান মিললে এই মামলা দেশের অন্যতম বড় জাল নোট কাণ্ডে পরিণত হতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)