বন্দে মাতরম না গাইলে তা ফৌজদারি অপরাধ নয়, শুনানিতে বড় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

বন্দে মাতরমের সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া বাধ্যতামূলক করার এবং ২০২৬ সালের আইন সংশোধনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণা। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে নির্দেশ দেয় যে, ধর্মীয় বা বিবেকগত কারণে কেউ গানটি না গাইলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি পদক্ষেপ করা যাবে না। একইসঙ্গে কেন্দ্র সরকারের কাছে এই বিষয়ে জবাব তলব করা হয়েছে।

Sep 23, 2026 - 11:01
0 0

‘ন্যাশনাল সং’ বা জাতীয় গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া বাধ্যতামূলক করার এবং এই সংক্রান্ত ২০২৬ সালের আইন সংশোধনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। প্রখ্যাত কর্নাটকী সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণা এই রিট পিটিশন জমা করেছেন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি পি মোহনরাজের বেঞ্চ এই মামলার শুনানি গ্রহণ করে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ

শুনানি চলাকালীন বেঞ্চের পক্ষ থেকে স্পষ্ট মৌখিক পর্যবেক্ষণ জানানো হয় যে, কোনটি জাতীয় গান আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণ করা আদালতের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তবে আদালত জানিয়েছে, ‘বিজয়ে ইমানুয়েল’ মামলার রায়ে যেমন বিবেকগত কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া থেকে বিরত থাকার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল, এক্ষেত্রেও সেই অধিকার সুরক্ষিত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

আদালত আশা প্রকাশ করেছে যে, ‘বিজয়ে ইমানুয়েল’ মামলার নজির মেনেই চলা হবে এবং ধর্মীয় বা বিবেকগত কারণে যারা এই গান গাইবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের ফৌজদারি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে না। একই সঙ্গে সলিসিটর জেনারেলের কাছে এই বিষয়ে কেন্দ্রের জবাব তলব করা হয়েছে।

আবেদনকারীর মূল আপত্তি ও যুক্তি

পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের সংশোধনী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) নির্দেশিকা অনুযায়ী বন্দে মাতরমের ছয়টি স্তবকই গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবেদনকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী ড. এস মুরলীধর আদালতে সওয়াল করেন যে, এই সংশোধনীতে জাতীয় গান আসলে কোনটি, তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এর ফলে চরম অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁর প্রধান যুক্তি, বন্দে মাতরমের শেষের চারটি স্তবকে দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর মতো হিন্দু দেব-দেবীর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ফলে নাগরিকদের এটি গাইতে বাধ্য করা হলে তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী এবং মতাদর্শগত বা ধর্মীয় ভাবাবেগ জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার সমান।

সলিসিটর জেনারেল বনাম আইনজীবীর তুমুল তর্কযুদ্ধ

শুনানি চলাকালীন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এত সংকীর্ণ হতে পারে না। অন্যদিকে, আইন প্রণয়নের পদ্ধতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তির গেজেট প্রকাশ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ড. মুরলীধর।

তর্কযুদ্ধ চলাকালীন সলিসিটর জেনারেল মন্তব্য করেন যে, আইন তৈরির প্রক্রিয়া ‘নকশালপন্থী’দের মতো হতে পারে না। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান প্রবীণ আইনজীবী ড. মুরলীধর। তিনি এটিকে একজন আইনজিবীর পক্ষে অত্যন্ত বেমানান বলে উল্লেখ করেন এবং মন্তব্যটি প্রত্যাহার করার দাবি জানান। সলিসিটর জেনারেল নিজের বক্তব্যে অনড় থেকে জানান, তিনি কোনও ক্ষমা চাইবেন না এবং আইন মেনেই দেশ চলবে, নকশালদের ইচ্ছায় নয়। এই বাকবিতণ্ডার পর বেঞ্চ হস্তক্ষেপ করে জানায় যে তারা এই মন্তব্যগুলিকে নথিবদ্ধ করছে না।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই

আবেদনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস মুসলিম সদস্যদের আপত্তির কারণে জাতীয় সমাবেশে বন্দে মাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু এবং রাজেন্দ্র প্রসাদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরও এই বন্দোবস্তকে সমর্থন করেন। কিন্তু বর্তমান সংশোধনীতে এই ঐতিহাসিক বোঝাপড়াকে উল্টে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঠিক করবে জাতীয় গান কী হবে, তবে সংবিধানের ২৫ ও ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনও বিবেকগত বা ধর্মীয় কারণে প্রতিবাদকারীকে ফৌজদারি অপরাধের মুখে পড়তে হবে না। আগামী দিনে এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে আরও আইনি যুক্তি পেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User