রাজস্থানে রয়েছে ভারতের ‘গ্রেট ওয়াল’,পাহাড়ের গা বেয়ে ৩৬ কিলোমিটারের প্রাচীরে ছত্রে ছত্রে রহস্য

রাজস্থানের আরাবল্লি পাহাড়ে ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর ঘিরে আজও রয়েছে রহস্য। রানা কুম্ভর আমলে তৈরি ‘ভারতের গ্রেট ওয়াল’ কুম্ভলগড় দুর্গ।

Sep 19, 2026 - 15:56
0 0

দূর থেকে দেখলে মনে হবে, পাহাড়ের গায়ে কেউ হয়তো পাথর দিয়ে বিশাল একটা সাপ এঁকে দিয়েছে। যত কাছে যাবেন, ততই বোঝা যাবে—এটা কোনও সাধারণ প্রাচীর নয়। পাহাড়ের বাঁক যেখানে যেমন, দেওয়ালও সেখানে তেমন। কোথাও উঠে গিয়েছে, কোথাও নেমেছে, আবার কোথাও পাহাড়কে পাক খেয়ে চলে গিয়েছে অনেক দূর।

রাজস্থানের খরখরে আরাবল্লি পাহাড়ের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে এদেশের অন্যকম বিস্ময় কুম্ভলগড় দুর্গ। ইতিহাসের পাতায় যার পরিচিতি যুদ্ধ আর রাজাদের দুর্গ হিসেবে। তবে ইতিহাসের সাক্ষী থাকতে কেউ এখানে সেভাবে যায় না। যায় অন্য একটি কারণে। প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ তার বিশাল প্রাচীর দেখতে।

এই দেওয়ালই কুম্ভলগড়কে দিয়েছে এক বিশেষ পরিচয় ‘ভারতের গ্রেট ওয়াল’। চিনের মহাপ্রাচীরের সঙ্গে তুলনা অবশ্য সরাসরি কোনও ঐতিহাসিক যোগের কারণে নয়। আকার, প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্য এবং পাহাড়জুড়ে বিস্তৃতির কারণে এই নাম।

রাজস্থান পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, একই সঙ্গে প্রায় আটটি ঘোড়া পাশাপাশি চলতে পারে এই প্রাচীরে উপর দিয়ে। আরও চমক রয়েছে অন্য জায়গায়। দেওয়ালটি পাহাড় কেটে সোজা করে বসানো হয়নি। আরাবল্লির স্বাভাবিক ঢাল, বাঁক এবং উচ্চতাকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে দূর থেকে দুর্গটিকে পাহাড়েরই অংশ বলে মনে হয়।

কবে তৈরি হয়েছিল এই কুম্ভলগড় দুর্গ?

কুম্ভলগড় তৈরি হয়েছিল পঞ্চদশ শতকে, রানা কুম্ভের আমলে। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৪৪৩ থেকে ১৪৫৮ সালের মধ্যে দুর্গের নির্মাণকাজ চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১০০ মিটার উচ্চতায় থাকা এই দুর্গে পৌঁছনো তখনই সহজ ছিল না। পাথুরে পাহাড় পেরিয়ে দুর্গের কাছে পৌঁছনোর পরেও সামনে থাকত একের পর এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

প্রধান প্রবেশপথের আগে ছিল সাতটি বড় ফটক। ভিতরে শুধু সৈন্যদের থাকার জায়গা ছিল না। প্রাসাদ, মন্দির, আস্তাবল-সহ দীর্ঘদিন বসবাসের মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোও ছিল। দুর্গের নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রানা কুম্ভের সভার স্থপতি মণ্ডন। রাজস্থানের অন্যান্য পাহাড়ি দুর্গের তুলনায় এই তথ্যও বেশ বিরল—এখানে স্থপতির পরিচয় জানা যায়।

তবে এত শক্তিশালী দুর্গ একেবারে অজেয় ছিল না। ইতিহাসে কুম্ভলগড় দখলের সফল নজির একটিই পাওয়া যায়। ১৫৭৮ সালে আকবরের এক সেনাপতি সাময়িকভাবে দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেন। কারণ, তত দিনে দুর্গের ভিতরে পানীয় জলের মজুত ফুরিয়ে এসেছিল।

আজ যুদ্ধ নেই, কামানের গোলাও নেই। আছে পাহাড়, পাথর আর সেই দীর্ঘ প্রাচীর। দুর্গের ভিতর দিয়ে হাঁটলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে একটি বিষয়ই—কুম্ভলগড়কে পাহাড়ের উপর বসানো হয়নি, পাহাড়কেই যেন দুর্গের অংশ বানানো হয়েছিল।

সম্ভবত সেই কারণেই পাঁচশো বছরের বেশি সময় পরেও এই দুর্গ শুধু ইতিহাস নয়, চোখে দেখার মতো এক স্থাপত্য-রহস্য হয়ে আছে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User