শিবপুর থেকে মুঙ্গের, শতাব্দীপ্রাচীন একেকটি বটগাছ যেন আস্ত বাস্তুতন্ত্র, বিপন্ন শত প্রাণের আশ্রয়!
একটি বটগাছ কেবল ছায়া দেয় না, শত শত প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখে। বিহারের ৭০০ বছরের প্রাচীন বট থেকে কলকাতার গ্রেট ব্যানিয়ন— গবেষণা বলছে বটগাছ মানেই আস্ত এক বাস্তুতন্ত্র।
খালি চোখে আমরা কী দেখি, একটি গাছ মানে একটি জীব। কিন্তু ভারতের প্রাচীন বটগাছগুলিকে ঘিরে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, একটি বটগাছ আসলে গোটা একটি বাস্তুতন্ত্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছ শুধু ছায়া দেয় না, আশ্রয়, খাদ্য এবং নতুন অরণ্য তৈরির ভিত্তিও গড়ে তোলে। বিহারের ৭০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ থেকে শুরু করে কলকাতার গ্রেট ব্যানিয়ন ট্রি, বেঙ্গালুরুর ডোড্ডা আলাদা মারা কিংবা তেলঙ্গানার কানহা শান্তি বনম, সব ক্ষেত্রেই একই ছবি উঠে এসেছে। একটি বটগাছকে কেন্দ্র করে টিকে রয়েছে অসংখ্য পাখি, বাদুড়, কীটপতঙ্গ, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং আরও বহু উদ্ভিদ।
এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বিহারের মুঙ্গের জেলার একটি বটগাছের বয়স উচ্চ-নির্ভুল রেডিওকার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ৭০০ বছর বলে নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটিই এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত বিশ্বের প্রাচীনতম বটগাছ বলে দাবি করা হচ্ছে। এতদিন বটগাছের বয়স নিয়ে মূলত লোককথা বা ঐতিহাসিক নথির উপর নির্ভর করা হলেও, এই গবেষণা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, এমন গাছ শুধু প্রকৃতির ইতিহাসই বহন করে না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বন্যপ্রাণেরও আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
এই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে তেলঙ্গানার কানহা শান্তি বনমে হওয়া একটি গবেষণা। সেখানে ছয়টি পরিণত বটগাছ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে ফল ধরার সময়ে গাছগুলি কার্যত বন্যপ্রাণের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। শালিক, বুলবুল, কোকিল, বারবেট, হর্নবিল, ওরিওল, ট্রিপাইয়ের মতো বহু পাখি সেখানে খাদ্যের সন্ধানে আসে। সন্ধ্যার পর সেই জায়গা দখল করে ভারতীয় ফ্লাইং ফক্স বাদুড়, দিনের বেলায় দেখা যায় কাঠবিড়ালি। আর ছোট খাটো পিঁপড়ের মতো কীটপতঙ্গ তো রয়েছেই।
গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বীজ বিস্তার। পাখি ও বাদুড়ের মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসা বীজ মাটিতে পড়ে থাকা ফলের তুলনায় অনেক বেশি সফলভাবে অঙ্কুরিত হয়েছে। অর্থাৎ ফল খাওয়ার পাশাপাশি এই প্রাণীরাই নতুন বন তৈরির কাজও করে চলেছে। বট, অশ্বত্থ-সহ বিভিন্ন ফাইকাস প্রজাতির চারা স্বাভাবিকভাবেই গজাতে দেখা গিয়েছে গবেষণাক্ষেত্রে।
ভারতের সবচেয়ে পরিচিত বটগাছগুলির মধ্যে অন্যতম কলকাতার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে থাকা গ্রেট ব্যানিয়ান ট্রি। প্রায় ৪.৭ একর এলাকা ড়ে বিস্তৃত এই গাছের মূল কাণ্ড বহু বছর আগে নষ্ট হয়ে গেলেও ৩,৭০০-র বেশি ঝুরি-মূল তাকে এখনও জীবিত রেখেছে। একক গাছের বদলে এটি যেন একটি জীবন্ত অরণ্য। তার ডালে বাসা বাঁধে অসংখ্য পাখি, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, সরীসৃপ, মস, অর্কিড ও লাইকেন।
একই ছবি দেখা যায় বেঙ্গালুরুর প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো ডোড্ডা আলাদা মারাতেও। বিশাল ছাউনির নীচে সারা বছরই ভিড় জমায় নানা প্রজাতির পাখি ও বাদুড়। গুজরাতের কবীরবট বা অন্ধ্রপ্রদেশের থিম্মাম্মা মারিমানুর মতো প্রাচীন বটগাছও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের প্রধান ভরসা। ফলে গবেষকদের এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্নের তেমন জায়গা নেই।
তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে ১১৫টি নথিভুক্ত ফাইকাস ট্যাক্সা রয়েছে, যার মধ্যে ৮৯টি স্বীকৃত প্রজাতি। গবেষকদের মতে, এই বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে শুধু নতুন গাছ লাগালে হবে না, শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছগুলিকেও সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ, একটি পুরনো বটগাছ হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বহু প্রজাতির খাদ্য, আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের অরণ্য তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও। আর এই ধরনের গাছ কাটাও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।
গবেষণায় এই ফল পাওয়ার পর অনেকেই বলছে, বট-অশথ্বের মতো বড় গাছ যেভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে কংক্রিটের ভিড়, উঠছে বহুতল, তা বন্ধ হওয়া উচিত। এই নিয়ে সচেতনতা বাড়লে বহু জীব রক্ষা পেতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)