কমিক্সের ‘অস্কারে’ বাঙালি! আইসনার ও হার্ভের দৌড়ে যাদবপুরের প্রাক্তনী চার্বাক দীপ্ত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী চার্বাক দীপ্তর মুকুটে নয়া পালক। তাঁর আঁকা গ্রাফিক নভেল 'লুবলুর পৃথিবী' পেল কমিক্স দুনিয়ার অস্কার আইসনার ও হার্ভে অ্যাওয়ার্ডের জোড়া মনোনয়ন।

Aug 05, 2026 - 19:41
0 0
কমিক্সের ‘অস্কারে’ বাঙালি! আইসনার ও হার্ভের দৌড়ে যাদবপুরের প্রাক্তনী চার্বাক দীপ্ত

কমিক্স মানেই কেবল সুপারম্যান বা টিনটিন নয়। বাংলার বুকেও, খানিক নীরবেই, তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের গ্রাফিক নভেল।

নিরালা কাজ আর আবডালে রইল না! অনলস পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এবার এল জোড়া আন্তর্জাতিক মনোনয়ন। খাস কলকাতার এক প্রকাশনা সংস্থা থেকে ছাপা বই। তাতেই বাজিমাত। কমিক্স দুনিয়ার ‘অস্কার’ বলে পরিচিত আইসনার অ্যাওয়ার্ডের (Will Eisner Comic Industry Awards) ডিজিটাল কমিক বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে ‘লুবলুর পৃথিবী’। স্রষ্টা চার্বাক দীপ্ত। শুধু তাই নয়, হার্ভে অ্যাওয়ার্ডের (Harvey Awards) ডিজিটাল বুক অফ দ্য ইয়ার ক্যাটেগরিতেও উজ্জ্বল চার্বাক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর হাত ধরে আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতের নাম আরও একবার সামনের সারিতে এল।

স্বীকৃতির নেপথ্যে

বিদেশের নামী প্রকাশনা সংস্থার বিশাল লেবেল নেই। নেই বিদেশি কানেকশন বা চেনাজানার নেপথ্য-প্রভাব। স্রেফ নিজের প্রতিভায় ভর করে এই অসাধ্যসাধন করেছেন বনগাঁর ছেলে চার্বাক। প্রচ্ছদ শিল্পী ও গবেষক পিনাকী দে-র কথায়, ‘চার্বাক যে প্রথম ভারতীয় হিসেবে মনোনয়ন পেলেন, এমন নয়। তবে তাঁর কাজটা পুরোটাই ভারতে বসে করা। আঞ্চলিক বাজারের জন্য বাংলায় প্রকাশিত। এটাই সবচেয়ে স্পেশাল। বিদেশি যোগাযোগ ছাড়া এ দেশ থেকেও যে কেউ আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছতে পারে, সেটা ভারতীয় কমিক্সের ভবিষ্যতের জন্য দারুণ খবর। তিনি এক অর্থে সত্যিই পথপ্রদর্শক।’

ক্যানভাসে দর্শনের রং

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা। বাবা প্রাচীন ভারতের চার্বাক দর্শনের প্রবল অনুরাগী। ছেলের নামও রেখেছেন সেই তাত্ত্বিক প্রস্থান মিলিয়ে।

চার্বাক দর্শন মতে, যা চোখে দেখা যায়, সেটাই একমাত্র সত্য। এই বস্তুবাদী চিন্তার প্রতিফলন শিল্পীর আঁকায় বারবার ফুটে উঠেছে। তাঁর হাতে গাঁথা ‘লুবলুর পৃথিবী’ (The World of Lublu) মূলত এক তরুণ ও তাঁর যুক্তিবাদী বন্ধু কিমের গল্প। পরাবাস্তব এক সফরে বেরিয়ে বাস্তব, বোধ ও দর্শনের নানা স্তর উন্মোচন করে তারা। লুবলু নামটা এসেছে রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’ ছবির বিখ্যাত রুশ শব্দ ‘ল্যুবল্যু’ (আমি ভালোবাসি) থেকে। গ্রাফিক নভেলটিতে ফরাসি কমিক্সের স্টাইলের পাশাপাশি মিশেছে হার্জের ‘ক্লিয়ার লাইন’ ড্রয়িংয়ের অদ্ভুত ছোঁয়া।

বাণিজ্যের ইঁদুরদৌড় ও শিকড়ের টান

শুরুটা হয়েছিল ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র কার্টুনিস্ট হিসেবে। এরপর 'স্কলাস্টিকে'র মতো নামী সংস্থায় ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজ করেছেন। যদিও প্রতিভার সলতে পেকেছে ইন্দ্রজাল কমিক্স, চাচা চৌধুরি দেখে... নারায়ণ দেবনাথ ও ময়ূখ চৌধুরির মতো দিকপালদের কাজ বুঝে! 

এমনিতে কমার্শিয়াল আর্টিস্টদের দুনিয়াটা খুব একটা মসৃণ নয়। লড়াইটা প্রতিদিনের। ‘ম্যাড বংস’ নামের এক শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন চার্বাক। সেখানে নিজেদের মতো করে ক্যালেন্ডার বা ছোট সংকলন বের করতেন। চার্বাক জানেন, এই বাজারে টিকে থাকতে গেলে নিজেকেই একসঙ্গে সব ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। আঁকা, রং করা, প্রচ্ছদ তৈরি—সব একহাতে সামলান তিনি।

প্রত্যাখ্যান থেকে জয়যাত্রা

শুরুতে ইংরেজিতেই লিখেছিলেন লুবলুর গল্প। কিন্তু বড় বড় প্রকাশকরা মুখ ফিরিয়ে নেন। এরপরই বাংলা সংস্করণের সাহসী সিদ্ধান্ত। ‘বুক ফার্ম’ প্রকাশনা সংস্থার হাত ধরে বাজারে আসে ‘লুবলুর পৃথিবী’। ফাটকাটা কাজে লেগে যায়। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় দারুণ সাড়া ফেলে এই বই। জিতে নেয় ‘নারায়ণ দেবনাথ পুরস্কার’। এখন সেই গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণ ছাপতে রীতিমতো লাইন দিচ্ছেন প্রকাশকরা। চার্বাকের কথায়, ‘সমসাময়িক বাংলা প্রকাশনা জগৎ পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়ে অনেক বেশি খোলামেলা। তবে অদ্ভুত লাগে, প্রকাশকরা নিজেদের সৃজনশীল বিচারের ওপর ভরসা রাখেন না। একটা বই ভাল কি না, তা বুঝতে তাঁরা আন্তর্জাতিক পুরস্কারের সিলমোহরের অপেক্ষায় থাকেন।’

দেশি আবহে ভিনদেশি ছোঁয়া

শুধু লুবলু নয়। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে সুকুমার রায়ের ‘হ-য-ব-র-ল’-র (HJBRL) অসামান্য গ্রাফিক রূপ। রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’ বা জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ নিয়েও কাজ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির বিখ্যাত সেই টাকার পাহাড়ের স্বপ্নের দৃশ্যকেও নিপুণভাবে কমিক্সে এনেছেন। সম্প্রতি উইল আইসনারের লেখা ‘আ কন্ট্রাক্ট উইথ গড’-এর (A Contract with God) বাংলা অনুবাদ করেছেন চার্বাক। এই কাজের বিষয়ে তাঁর মত, ‘আইসনারের কাজে থাকা ইহুদি অভিবাসীদের যন্ত্রণা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে আসা পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের অদ্ভুত মিল রয়েছে। ওই ড্রপসি অ্যাভিনিউয়ের সঙ্গে উত্তর কলকাতার সরু গলি, পুরনো বাড়ি আর ঘিঞ্জি পরিবেশের দারুণ সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছি।’

ভবিষ্যতের রূপরেখা

সেকেলে প্রথা ভেঙে সরাসরি ট্যাবলেটে ডিজিটাল কালিতে আঁকেন চার্বাক। এতে সময় বাঁচে অনেকটা। বর্তমানে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে রামায়ণের মোশন কমিক নিয়ে কাজ করছেন। প্রতি মাসে একটি করে পর্ব বিনামূল্যে দর্শকদের সামনে আনছেন তিনি। আগামী দু'বছরে এই বিশাল কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা। পাশাপাশি লুবলুর দ্বিতীয় পর্বের কাজও চলছে জোরকদমে। চার্বাকের কথায়, ‘তাড়াতাড়ি দুটো পয়সা কামানোর জন্য আমি তড়িঘড়ি কাজ শেষ করতে চাই না। সময় নিচ্ছি। যাতে একদম নতুন কিছু উপহার দেওয়া যায়।’

আঞ্চলিক বাজারে পা রেখে বিশ্বমঞ্চে ওড়ার যে স্বপ্ন চার্বাক দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের শিল্পীদের (Indian Comics) নতুন পথ দেখাবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User