কাজিরাঙায় বন্ধ শিকারিদের দাপট! এই ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এক দশকে 'জিরো রাইনো পোচিং'-এর নজির গড়ল অসম

একসময় যেখানে বছরে ২৭টি গন্ডার হারাত অসম, আজ সেখানে সফল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ! প্রযুক্তি, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয়দের যৌথ লড়াইয়ে কীভাবে কাজিরাঙা গড়ে তুলল নতুন রেকর্ড।

Aug 05, 2026 - 19:12
0 0
কাজিরাঙায় বন্ধ শিকারিদের দাপট! এই ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এক দশকে 'জিরো রাইনো পোচিং'-এর নজির গড়ল অসম

একটা সময় ছিল, যখন অসমে গন্ডার মারা যাওয়ার খবর রোজ শিরোনামে থাকত। বছরের শেষে হিসেব কষলে চোখ কপালে ওঠার মতো পরিসংখ্যান পাওয়া যেত। একের পর এক গন্ডার চোরাশিকারিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে বছরের পর বছর ধরে। ক্যামেরা লাগিয়েও গন্ডারের মৃত্যু আটকানো যায়নি কাজিরাঙায়। সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৩ এবং ২০১৪—টানা দু'বছর ২৭টি করে একশৃঙ্গ গন্ডার (Greater One-horned Rhinoceros) হারিয়েছে অসম। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান (Kaziranga National Park), যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি একশৃঙ্গ গন্ডারের বাস, তখন পরিণত হয়েছিল সংগঠিত শিকারচক্রের প্রধান নিশানায়।

বর্ষার বন্যা, দুর্গম জঙ্গল, আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শিকারিদের সামনে বনকর্মীরা যেন এক অসম লড়াই লড়ছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ছবিটা পুরো বদলে যায়।

২০২২ সালে অসম এমন এক নজির গড়ল, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। ১৯৭৭ সালের পর প্রথমবার গোটা বছরে একটি গন্ডারও শিকার হয়নি। অর্থাৎ, টানা ৪৫ বছর পরে প্রথমবার ‘জিরো রাইনো পোচিং’-এর সাক্ষী হয় আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালেও একই সাফল্য ধরে রাখে অসম।

এই পরিবর্তন কোনও এক দিনের সাফল্য নয়। এর পিছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্যের জাল, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

গোটা বিষয়টির নেপথ্যে ছিলেন একজন। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসের (IFS) ১৯৮৯ ব্যাচের আধিকারিক সন্দীপ কুমার। বর্তমানে তিনি অসমের প্রিন্সিপাল চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্টস (PCCF) এবং হেড অফ ফরেস্ট ফোর্স (HoFF)। এর আগে প্রধান বন্যপ্রাণ সংরক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বনদফতর শুধু শিকার হওয়ার পরে তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি, শিকারিরা যাতে জঙ্গল পর্যন্ত পৌঁছতেই না পারে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

২০২১ সালে গঠন করা হয় বিশেষ অ্যান্টি-পোচিং টাস্ক ফোর্স। বনদফতর, অসম পুলিশ এবং অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাকে একই ছাতার তলা এনে সংগঠিত অপরাধ হিসেবে গন্ডার পাচার মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সীমান্ত পেরিয়ে সক্রিয় থাকা চোরাকারবারি চক্রের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে তৈরি হয় পৃথক নেটওয়ার্ক।

এর পাশাপাশি বদলে যায় কাজিরাঙার পাহারার ধরনও। শুধু বনরক্ষীদের টহলের উপর নির্ভর না করে ব্যবহার শুরু হয় ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা, থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির। জঙ্গলের বিভিন্ন ক্যাম্পের মধ্যে ওয়্যারলেস যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা হয়। বনরক্ষীদের হাতে দেওয়া হয় উন্নত সরঞ্জাম ও বিশেষ প্রশিক্ষণ।

তবে প্রযুক্তিই সব নয়। এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠেন জঙ্গলের আশপাশে থাকা মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা, যুবক-যুবতী, এমনকি মহিলা বনরক্ষীদের বিশেষ দল ‘ভ্যান দুর্গা’ও নিয়মিত নজরদারিতে অংশ নেয়। সন্দেহজনক চলাচলের খবর দ্রুত পৌঁছে যাওয়া শুরু করে বনদফতরের কাছে। ফলে বহু ক্ষেত্রেই শিকারিরা জঙ্গলে ঢোকার আগেই ধরা পড়তে শুরু করে।

এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রভাব শিকারের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলে। ২০০৯ সালে কাজিরাঙায় যেখানে গন্ডারের সংখ্যা ছিল ২,০৪৮, ২০২২ সালের গণনায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৬১৩। অর্থাৎ সংরক্ষণ শুধু প্রাণ বাঁচায়নি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গন্ডারের সংখ্যা বাড়াতেও সাহায্য করেছে।

আইনের ফাঁক যেমন থাকে, এক্ষেত্রেও ফাঁক থেকে গেছে। তাই লড়াই শেষ হয়নি। ২০২৩ সালে একটি এবং ২০২৪ সালে দু'টি গন্ডার শিকার হয়। কিন্তু প্রশাসন দ্রুত 'অপারেশন ফ্যালকনে'র মতো অভিযানে নেমে পাচারচক্রের বিরুদ্ধে আরও কড়া ব্যবস্থা নেয়। সেই ধারাবাহিকতাতেই ২০২৫ সালে আবারও শূন্যে নেমে আসে গন্ডার শিকারের সংখ্যা।

এক সময় বছরে গুচ্ছ গন্ডার হারানো অসম আজ বিশ্বের সামনে অন্য এক গল্প তুলে ধরছে। এই গল্প শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানোর নয়; এটি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রশাসন, প্রযুক্তি, বনরক্ষী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে চাইলে সংরক্ষণের ইতিহাসও বদলে দেওয়া যায়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0

Comments (0)

User