Chandipura virus: চণ্ডীপুরা ভাইরাসের থাবায় গুজরাতে মৃত ২২ শিশু, বর্ষায় কীভাবে বাঁচাবেন খুদেদের?
বর্ষার শুরুতেই গুজরাতে থাবা বসিয়েছে মারণ চণ্ডীপুরা ভাইরাস। চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছে ২২ জন শিশু। কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ না থাকায় লক্ষণ চিনে সচেতন হওয়াই একমাত্র উপায়।
বর্ষা আসতেই গুজরাতে নতুন আতঙ্ক। নাম চণ্ডীপুরা ভাইরাস (Chandipura virus outbreak)। ইতিমধ্যেই এই মারণ ভাইরাসের বলি হয়েছে অন্তত ২২ জন শিশু। রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান রীতিমতো ভয় ধরানোর মতো। এখনও পর্যন্ত ১৮৪ জন সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৩৫ জনের শরীরে মিলেছে এই মারাত্মক সংক্রমণ। সবথেকে চিন্তার বিষয়, আক্রান্তদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বছরের নীচে।
মশাবাহিত এই রোগ বর্ষাকালে দ্বিগুণ আকার ধারণ করে। দেশে যেহেতু বর্ষা সক্রিয় এবং লাফিয়ে বাড়ছে এই সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা তাই চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তাঁদের একাংশ বলছেন, এই ভাইরাসের মোকাবিলায় কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনও আবিষ্কার হয়নি।
কোথা থেকে এল এই মারণ ভাইরাস?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-র রিপোর্ট বলছে, চণ্ডীপুরা মূলত 'র্যাবডোভিরিডি' পরিবারের সদস্য। এর প্রভাবে অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম (AES) বা সোজা কথায় মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহ বা ব্রেন ফিভার সৃষ্টি হয়। আজ থেকে বহু বছর আগে, প্রথমবার এই জীবাণুর খোঁজ মিলেছিল। ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুর জেলার চণ্ডীপুরা গ্রামে এর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সেই গ্রামের নাম অনুসারেই এমন নামকরণ করা হয়েছে। মূলত ভারতের পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে বর্ষার সময় এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটা বেড়ে যায়।
কীভাবে ছড়ায় সংক্রমণ?
সাধারণত মানুষের থেকে মানুষের শরীরে সরাসরি এই রোগ ছড়ায় না। মূলত স্যান্ডফ্লাই বা বেলেমাছি, মশা এবং এঁটেল পোকার কামড় থেকেই জীবাণু মানুষের রক্তে মেশে। গুজরাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে 'ফ্লেবোটোমাস পাপা তাসি' নামের এক বিশেষ প্রজাতির বেলেমাছিকে সংক্রমণের মূল চক্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (vector-borne disease)। অপরিষ্কার পরিবেশ, জমা জল এবং যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার কারণে এই ধরনের পোকামাকড় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। আর তার জেরেই হুহু করে বাড়ে বিপদের ঝুঁকি।
চণ্ডীপুরা ভাইরাসের মূল লক্ষণ কী কী?
এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গ অনেকটা সাধারণ ফ্লু-এর মতোই। প্রবল জ্বর, প্রচণ্ড মাথা যন্ত্রণা, চরম ক্লান্তি, গা হাত পা ব্যথা ও বমির মতো লক্ষণ দেখা যায়। তবে সময়মতো চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায় (Chandipura virus symptoms)। শুরু হয় একটানা কাশি, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট এবং খিঁচুনি। রোগী ধীরে ধীরে অচৈতন্য হয়ে কোমায় চলে যেতে পারে। সবথেকে ভয়ের ব্যাপার হল, বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তাদের ক্ষেত্রে রোগটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই জ্বর আর তার সঙ্গে মস্তিষ্কের কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়।
বাঁচার উপায় কী?
নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ বা টিকা না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করাটাই বাঁচার একমাত্র চাবিকাঠি। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট শুরু করলে তবেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিরোধই এই রোগের সেরা ওষুধ। বেলেমাছি বা মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ও মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
সন্ধের দিকে বাচ্চাদের ফুল হাতা জামাকাপড় পরানো উচিত, বলছেন চিকিৎসকরা। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি জমা জল সরিয়ে ফেলা এবং কীটনাশক স্প্রে করার ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সামান্য সচেতনতাই এই মারণ ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে আপনার সন্তানকে।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের খবর অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে গুজরাতে। ১৮৪ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ৩৫ জনের শরীরে খোঁজ মিলেছে এই ভাইরাসের। আর সবচেয়ে চিন্তার ব্যাপার হল, আক্রান্তরা সবাই ১৫ বছরের কম বয়সী। বর্ষাকালে এই রোগ ছড়ায় এমন পোকামাকড় বেশি অ্যাক্টিভ হয়ে যায়, তাই মূলত এই সময়েই রোগটির প্রকোপ বাড়ে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কোনওনির্দিষ্ট ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই, তাই প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে নেওয়া খুব দরকার।
কী কী লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন?
ম্যাক্স হেলথকেয়ারের মতে, প্রাথমিক অবস্থায় একেবারে সাধারণ ফ্লু-এর মতোই কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, তবে খুব দ্রুত রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
শুরুর দিকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- খুব বেশি জ্বর
- মারাত্মক মাথা ব্যথা
- চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- গা-হাত-পা ব্যথা
- বমি ভাব বা বমি হওয়া
- রোগ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেলে আরও কিছু মারাত্মক উপসর্গ দেখা যায়। তখন একটানা কাশি, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, ঘোরের মধ্যে থাকা বা জ্ঞান হারানো, এমনকি রোগী কোমায় পর্যন্ত চলে যেতে পারে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই রোগ ভীষণ দ্রুত ছড়ায়। WHO জানাচ্ছে, অনেক সময় লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু বা বড়সড় বিপদ ঘটে যেতে পারে।
চিকিৎসা ও বাঁচার উপায়
এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনওনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তাই চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করা এবং সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট শুরু করাটাই বাঁচার একমাত্র উপায়।
যেহেতু পোকার কামড় থেকে এই রোগ ছড়ায়, তাই মশা বা পোকার হাত থেকে নিজেকে দূরে রাখাই হল আসল কাজ। WHO-এর তরফ থেকে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে-
- বাড়ি আর চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
- আবর্জনা ঠিকমতো জায়গায় ফেলতে হবে যাতে মশা-মাছি ডিম পাড়তে না পারে।
- রাতে মশারি টাঙিয়ে শোওয়া এবং ইনসেক্ট রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করা মাস্ট।
- বিশেষ করে সন্ধ্যেবেলায় বাইরে বেরোলে ফুল হাতা জামাকাপড় পরা উচিত।
- এলাকায় মশা মারার স্প্রে বা ব্লিচিং ছড়ানো হলে তাতে সাহায্য করুন।
আপনার বাচ্চার যদি হঠাৎ করে খুব জ্বর আসে আর তার সঙ্গে বমি, খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখেন, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা ডাক্তারের কাছে যান। চণ্ডীপুরা ভাইরাসের সংক্রমণ খুব একটা দেখা না গেলেও, দেরি হলে তা বাচ্চাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই বর্ষার মরশুমে একটু বেশিই সাবধান থাকা প্রয়োজন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)