হেমার জন্মদিনে তাঁর জন্মস্থান আম্মানকুড়িকে ফিরে দেখা, এখানে দুর্গা পরমেশ্বরী অষ্টভূজা

বলিউডের ‘ড্রিম গার্ল’-এর জন্মপরিচয়ে রয়েছে আম্মানকুড়ির নাম। সেই সূত্রে ফিরে দেখা দক্ষিণ ভারতের মন্দির, নৃত্য ও লোককথার এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিসরকে।

Oct 16, 2026 - 15:04
হেমার জন্মদিনে তাঁর জন্মস্থান আম্মানকুড়িকে ফিরে দেখা, এখানে দুর্গা পরমেশ্বরী অষ্টভূজা

‘শোলে’-র বাসন্তী, ‘সীতা অউর গীতা’-র বিপরীত স্বভাবের দুই বোন কিংবা মঞ্চের শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী—হেমা মালিনীকে দর্শক মনে রেখেছেন নানা পরিচয়ে। শুক্রবার ৭৮ বছর পূর্ণ করলেন ড্রিম গার্ল। জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ফিরে দেখা যায় আরও একটি নামকে—আম্মানকুড়ি (Ammankudi Hema Malini Birth place)। তামিলনাড়ুর এই নামটি জড়িয়ে রয়েছে তাঁর জন্মবৃত্তান্তের সঙ্গে।

মুম্বইয়ের চলচ্চিত্রজগৎ থেকে অনেক দূরের এই নাম কৌতূহল জাগায়। কোথায় আম্মানকুড়ি? কী তার পরিচয়? শুধু এক তারকার জন্মসূত্রেই কি জায়গাটি উল্লেখযোগ্য, নাকি তার নিজস্ব ইতিহাসও রয়েছে? সেই খোঁজে সামনে আসে তাঞ্জাভুর জেলার আম্মানকুড়ির কৈলাসনাথ ও দুর্গা (Durga) উপাসনার ঐতিহ্য।

শহর নয়, প্রাচীন উপাসনার পরিচয়ে প্রসিদ্ধ গ্রাম

তাঞ্জাভুরের আম্মানকুড়িকে ‘মন্দির নগরী’ বলার চেয়ে মন্দিরগ্রাম বলাই যথাযথ। এখানকার পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে কৈলাসনাথ মন্দির। নামেই বোঝা যায়, শিব এখানে কৈলাসনাথর রূপে পূজিত। একই মন্দিরপরিসরে দুর্গার উপাসনাও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তামিল সংবাদমাধ্যম দিনামালারের মন্দিরতথ্যে আম্মানকুড়ির এই দেবস্থান ও তার তাঞ্জাভুর জেলার অবস্থান নথিভুক্ত রয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের বহু মন্দিরে প্রধান দেবতার পাশাপাশি দেবী ও অন্যান্য উপদেবতার উপাসনা গড়ে উঠেছে নিজস্ব রীতিতে। আম্মানকুড়িতেও শৈব ও শক্তি উপাসনার সেই সহাবস্থান চোখে পড়ে। কৈলাসনাথরের সঙ্গে দুর্গা পরমেশ্বরীর পরিচয়ই গ্রামটিকে আলাদা করে তুলে ধরে।

অষ্টভুজা দুর্গা কেন আকর্ষণের কেন্দ্র

আম্মানকুড়ির দেবী দুর্গার আটটি হাত। স্থানীয় মন্দিরবিবরণে তিনি দুর্গা পরমেশ্বরী বা অষ্টভুজা দুর্গা নামে পরিচিত। তাঁর পূর্বমুখী বিগ্রহ এবং শান্ত মুখাবয়বের কথা উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধজয়ী দেবীর শক্তির সঙ্গে প্রশান্তির এই যুগল উপস্থিতিই ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলায় দুর্গার পরিচিত দশভুজা রূপের সঙ্গে এই আট হাতের বিগ্রহের পার্থক্যও আগ্রহ তৈরি করতে পারে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই দেবীর রূপ, নাম ও উপাসনার রীতি কীভাবে বদলে যায়, আম্মানকুড়ি তার একটি উদাহরণ।

দেবীর ১২ বছরের তপস্যার কাহিনি

এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি স্থানীয় ধর্মকথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষাসুরকে বধ করার পরে দেবী এখানে এসে তপস্যায় বসেন। ১২ বছর তপস্যার শেষে শিব তাঁকে এই স্থানেই থেকে ভক্তদের রক্ষা করার নির্দেশ দেন।

এই কাহিনির সূত্রেই অঞ্চলটি ‘দেবী তপোবনম’ নামে পরিচিত ছিল বলে স্থানীয় বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ‘আম্মান’ অর্থে দেবী এবং ‘কুড়ি’ অর্থে বসতি বা আবাস—নামটির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা তাই দেবীর আবাস। এগুলি মন্দিরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও লোককথা; প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে সেগুলিকে এক করে দেখা উচিত নয়।

চোল ইতিহাসের যোগ কোথায়?

আম্মানকুড়ির মন্দিরবিবরণে চোল যুগের যোগসূত্রের কথাও পাওয়া যায়। রাজারাজ চোলের সঙ্গে যুক্ত সেনানায়ক ও প্রশাসনিক ব্যক্তি কৃষ্ণন রামন ব্রহ্মরায়নের নাম উঠে আসে স্থানীয় ঐতিহ্যের আলোচনায়।

তবে এর ইতিহাস নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কোথাও ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে এবং একই সঙ্গে রাজারাজ চোলের সেনানায়কের উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুই দাবির কালানুক্রম মেলে না। ফলে নির্দিষ্ট শিলালিপির স্বীকৃত পাঠ বা প্রত্নতাত্ত্বিক নথি ছাড়া ওই সালকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

তবুও মন্দিরটির গুরুত্ব কেবল প্রতিষ্ঠাবর্ষে আটকে নেই। দীর্ঘদিনের উপাসনা, স্থানীয় স্মৃতি এবং পুরনো মন্দিরকে ঘিরে জনজীবনের ধারাবাহিকতাও তার ঐতিহ্যের অংশ।

দুর্গার পাশাপাশি আরও কী রয়েছে?

দিনামালারের মন্দিরচিত্র ও পরিচিতিতে কৈলাসনাথর এবং দুর্গা ছাড়াও পার্বতী, বল্লী ও দেবসেনা-সহ মুরুগন, গণেশ এবং যোগ সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে। রয়েছে ‘পাপ বিমোচন তীর্থম’ নামে পরিচিত জলাশয়ের কথাও।

ফলে এখানে যাওয়ার আকর্ষণ শুধু একটি বিগ্রহ দেখায় সীমাবদ্ধ নয়। একই পরিসরে একাধিক উপাসনার ধারা, দেবদেবীর ভিন্ন রূপ এবং মন্দিরকেন্দ্রিক স্থানীয় বিশ্বাসকে চেনার সুযোগ রয়েছে। ইতিহাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আগ্রহীদের কাছে এই ধরনের ছোট দেবস্থানের গুরুত্ব সেখানেই।

হেমার জীবনে দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির ছাপ 

হেমার তামিল পারিবারিক পটভূমি এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের শিক্ষার ছাপ তাঁর জীবন ধারায় রয়েছে। চলচ্চিত্রে প্রবেশের আগে থেকেই নাচের অনুশীলন তাঁর শিল্পীজীবনের ভিত তৈরি করেছিল।

তাঁর মা জয়া লক্ষ্মী মেয়ের শিল্পীজীবন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও নৃত্যকে ছাড়েননি হেমা। ১৯৬৮ সালে ‘সপনো কা সওদাগর’-এ হিন্দি ছবির নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরে একের পর এক জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু মঞ্চে ফিরে তাঁর পরিচয় থেকেছে নৃত্যশিল্পীরও।

জন্মদিনের কয়েক দিন আগেও সেই পরিচয় সামনে এসেছে। হায়দরাবাদে তাঁর ‘দুর্গা’ নৃত্যনাট্যে পরিবেশন করেছেন। পৌরাণিক চরিত্রকে নাচের ভাষায় তুলে ধরার প্রতি তাঁর আকর্ষণ এখনও অটুট।

এক জন জনপ্রিয় শিল্পীর জন্মস্থান খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় সামনে আসে দেশের কম আলোচিত ভূগোল। বড় শহরের বাইরে যে মন্দির, লোককথা ও শিল্পসংস্কৃতির দীর্ঘ জীবন রয়েছে, আম্মানকুড়ির আলোচনা সেই দিকেই নজর ফেরায়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Wow Wow 0
Sad Sad 0
Angry Angry 0